সম্প্রতি একটি ছবি বিক্রি হল ১৬৭ কোটি টাকায়! যা ভেঙে দিয়েছে এমএফ হুসেনের রেকর্ডও। আচমকাই তাই জনমানসে নতুন করে উঠে এসেছে ওই ছবির শিল্পী রাজা রবি বর্মার নাম। বয়সের হিসেবে যিনি প্রায় দুই শতক ছুঁতে চলেছেন। কিন্তু আজও তাঁর ছবি এদেশের জনতার ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছে। কিন্তু খ্যাতির সমান্তরালে রয়ে গিয়েছে বিতর্কের ঢেউও। কিংবদন্তি বহু শিল্পীকেই বিতর্ককে সঙ্গী করে এগতে হয়েছে। সেকথায় যাওয়ার আগে একবার রাজা রবি বর্মার জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া দরকার।
১৮৪৮ সালে ত্রিবাঙ্কুরের এক শিল্পপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম পথপ্রদর্শক রবি বর্মা। অল্প বয়স থেকেই তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। দ্রুতই তিনি আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার এক অন্যতম পথিকৃত হয়ে ওঠেন। ইউরোপীয় ঘরানার রিয়েলিজমের সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের চরিত্রগুলিকে মিলিয়ে দিয়ে তিনি এক নতুন ঘরানা তৈরি করেন। তৈলচিত্র এদেশে তিনিই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ১৮৯৪ থেকে তিনি লিথোগ্রাফিক প্রেস বসিয়ে ছবি ছেপে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে অচিরেই অসামান্য সব ছবি সাধারণের নাগালের মধ্যে পৌঁছে যায়। আসলে ধর্মবিশ্বাস ও স্বদেশিয়ানাকে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন রাজা রবি বর্মা। আর সেটাই ছিল 'মাস্টারস্ট্রোক'।
আজও তাঁর ছবি এদেশের জনতার ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছে। কিন্তু খ্যাতির সমান্তরালে রয়ে গিয়েছে বিতর্কের ঢেউও। কিংবদন্তি বহু শিল্পীকেই বিতর্ককে সঙ্গী করে এগতে হয়েছে।
রাজা রবি বর্মা
কিন্তু বিতর্কও আগাগোড়া তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছে। আসলে রবি বর্মার ছবিতে দেবতাও ঘরের মানুষ! মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের 'দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই প্রিয়জনে — প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই, তাই দিই দেবতারে'! তাঁর তুলিতে শকুন্তলা, দময়ন্তী কিংবা লক্ষ্মীর রূপ এত বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ার নেপথ্যে এটাই কারণ। দেবদেবী ও পুরাণের চরিত্রকে মানুষের মতো করে এর আগে কেউ আঁকেননি। আর এতেই তৈরি হল বিতর্ক! অনেকে দাবি করেন, এতে দেবত্বের মহিমা কমে যায়। ছবিগুলিতে নাকি দৈবী মহিমা নেই। অনেকে রুশ শিল্পী ভ্লাদিমির ট্রেটচিকফের কথা বলেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকালে দেখা পশুপাখি ও মানুষকে নিজের মতো করে আঁকতেন। সেই শৈলিই যেন রবি বর্মার ছবিতেও এসেছে। যাকে বলা হয় 'সিম্বলিক রিয়েলিজম'।
ইউরোপীয় ঘরানার রিয়েলিজমের সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের চরিত্রগুলিকে মিলিয়ে দিয়ে তিনি এক নতুন ঘরানা তৈরি করেন। তৈলচিত্র এদেশে তিনিই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ১৮৯৪ থেকে তিনি লিথোগ্রাফিক প্রেস বসিয়ে ছবি ছেপে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আরেকটা বিতর্ক হল, রবি বর্মার ছবিতে প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের মিলন। অনেকে বলে বসলেন, ভারতীয় শিল্পকে নিজের ঐতিহ্যের ভিতরেই বিকশিত হতে হবে। আমরা কেন পাশ্চাত্যের আদর্শকে আমাদের শিল্পের সঙ্গে মেশাতে যাব! আর এর সঙ্গেই এসে পড়ে অন্য বিষয়টিও। ওলিওগ্রাফ প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের আঁকা ছবিকে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন রবি বর্মা। শিল্প জনতার হাতের মুঠোয় আসা, সেযুগে উন্নাসিক শিল্পরসিকদের নাপসন্দ ছিল! তাঁদের দাবি ছিল, শিল্পরসের যাঁরা যথার্থ রসিক নন, তাঁরা রবি বর্মার ছবি কিনতে পারে। অর্থ ও শিল্পের সমঝদার হওয়াকে তাঁরা সমান্তরালে বসিয়ে দেন! বলাই বাহুল্য, এসব ধোপে টেকেনি। শতক পেরিয়েও রাজা রবি বর্মার ছবি একই রকম আলোচিত।
ছবিটি উনবিংশ শতকের শেষ দশকে আঁকা এই ছবিটিই বিক্রি হয়েছিল ১৬৭ কোটি টাকায়।
কিন্তু এর সঙ্গে রয়েছে একদম অন্য একটা বিতর্ক। সম্ভবত সবচেয়ে জোরালো বিতর্ক এটাই। ১৯০৬ সালে ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে সারা জীবনে দু'হাজারের বেশি ছবি এঁকেছিলেন রবি বর্মা। পৌরাণিক ছবি আঁকতে বসে তিনি কোনও রূপকের আড়াল নেননি। পুরাণে লিখিত বর্ণনাকে নিজের মতো করে গ্রহণ করে ছবি এঁকেছেন। তাতে তিলোত্তমার ছবি আঁকার সময় তার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত স্তনযুগল আঁকতে দ্বিধা করেননি। আবার 'শান্তনু ও মৎস্যগন্ধা' ছবিতেও মৎস্যগন্ধার হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে চাওয়া স্তন ও স্তনবৃন্তের কিয়দংশ যেভাবে দৃশ্যমান হয় তা নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। রাজা রবি বর্মা তথাকথিত রক্ষণশীলতার ধার ধারতে রাজি ছিলেন না।
'শান্তনু ও মৎস্যগন্ধা'
আসলে রাজা রবি বর্মা ছিলেন একজন মুক্তমনা প্রগতিশীল মানুষ। ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারতেন। পাশাপাশি সংস্কৃতেও ছিলেন তুখোড়। মালায়লম ভাষায় লিখতেন কবিতা। ঘুরে বেড়াতেন দেশময়। এমন মানুষকে কোনও ধরনের সংকীর্ণতাই স্পর্শ করত না। জমিজমা, সম্পদ ছিল প্রচুর। কিন্তু ওসবে মন ছিল না তাঁর। উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষটি চিরকালই চেয়েছেন জীবনের নতুন নতুন পর্ব রচনা করতে। এমন মানুষকে বিতর্ককে পাত্তা দেবেন না সেটাই স্বাভাবিক। অথচ পড়তে হয়েছি নানা বিড়ম্বনায়। এমনও জানা যায়, হিন্দু মৌলবাদীরা রাজা রবি বর্মার ছবি ছাপার পর সংবাদপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিল।
তিলোত্তমার ছবি আঁকার সময় তার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত স্তনযুগল আঁকতে দ্বিধা করেননি। আবার 'শান্তনু ও মৎস্যগন্ধা' ছবিতেও মৎস্যগন্ধার হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে চাওয়া স্তন ও স্তনবৃন্তের কিয়দংশ যেভাবে দৃশ্যমান হয় তা নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। রাজা রবি বর্মা তথাকথিত রক্ষণশীলতার ধার ধারতে রাজি ছিলেন না।
পুরাণকে তিনি জীবন্ত করে তুলতেন তুলির ছোঁয়ায়।
বিতর্ক আরও আছে। রাজা রবি বর্মার প্রেমিকা ও তাঁর বহু ছবির মডেল সুগন্ধা। সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং দময়ন্তীর মতো ছবিতে নাকি এই সুগন্ধাকেই আমরা দেখতে পাই। অনেকেই 'রংরসিয়া' ছবিটি দেখেছিলেন। এই সুগন্ধা আত্মহত্যা করেছিলেন। আসলে সরস্বতীর নগ্ন বা স্বল্পবসনা ছবির মডেল হওয়ায় বিতর্ক ঘনায় সুগন্ধাকে ঘিরে। সেই সময় রবি বর্মাকে প্রবল সামাজিক ও আইনি বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু সুগন্ধা বলে কি সত্যিই কেউ ছিল? এই নিয়ে বিতর্কও কম নেই। অনেকেরই মতে এই নামে রক্তমাংসের কেউ ছিল না। তবে সুগন্ধা কাল্পনিক হলেও ছবিগুলি আঁকায় রাজা রবি বর্মাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিতর্ক মিথ্যে নয়। তবে সব বিতর্কের সমান্তরালে রয়ে গিয়েছে রবি বর্মার শিল্পীখ্যাতি। তিনি থেকে গিয়েছেন ভারতীয় শিল্পকলার আধুনিক যুগের এক কিংবদন্তি প্রতিনিধি হিসেবে।
