ভ্যালেন্টাইনস ডে'র মুখে মুক্তি পেয়েছে রাহুল মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মন মানে না’। ট্রেলার দেখেই বুঝেছিলাম, এক্কেবারে নতুন প্রজন্মের প্রেমের ভাষা সিনেমার পর্দায়। তাদের আবেগ, প্রেম-অপ্রেম, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ভালোবাসা, সিচুয়েশনশিপ– এই সবকিছু নিয়েই চিত্রনাট্য (অরিত্র সেনগুপ্ত)। গল্প লিখেছেন পরিচালক রাহুল আর অরিত্র যৌথভাবে। পুরো ছবিটায় একটা ফিলগুড ফ্যাক্টর কাজ করে। হইহই করা ছবি, কিছু ত্রুটি থাকলেও মূল চালিকাশক্তি ভালোবাসা।
‘মন মানে না’ জুটি হিয়া-ঋত্বিক
প্রথমার্ধে ঘটনার ঘনঘটা এবং দ্রুতি আকর্ষণীয়। দ্বিতীয়ার্ধ একটু ধীর এবং রিপিটেটিভ। তবু আগ্রহ থাকবে, কারণ বাংলা ছবিতে ডেবিউ করলেন শাশ্বত ও মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা হিয়া চট্টোপাধ্যায়। আর বলিউডে কাজ করে আসা ঋত্বিক ভৌমিকেরও প্রথম বাংলা ছবি এটা। তৃতীয় কারণ, সৌম্য মুখোপাধ্যায়ের মতো ভার্সেটাইল এবং শক্তিশালী অভিনেতার উপস্থিতি। যদিও তাঁকে আরও ব্যবহার করলে ভালো হত। গল্পটা কেমন? রাহুল (ঋত্বিক ভৌমিক) আর বিদিশা (হিয়া) কলেজের প্রিয় বন্ধু। রাহুল মিলেনিয়াল, বিদিশা জেন জি। তাদের বন্ডিংয়ে এই তফাত বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। রাহুলের সমস্ত বিফল রোমান্সে সান্ত্বনার কাঁধ দেয় বিদিশা। অথচ ছেলেটা বুঝতেই পারে না, এই মেয়েটার মনের গভীরে তার জন্য ঠিক কী রাখা আছে। সময় গড়ালে কলেজ শেষে তাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন পরে বিদিশার জীবনের এক অনিবার্য বাঁকে ফের দেখা হয় তাঁদের। এই পুনর্মিলন সামনে নিয়ে আসে ছেলেমেয়ে দুটোর অনেক না-বলা কথা। যা তাদের পরস্পরকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। মনে পড়ে রাহুলেরই সংলাপ, একটা মানুষের সঙ্গে তিনবার দেখা হয়। আলাপ হওয়ার সময়। তারপর খারাপ সময় এবং ঠিক সময়। ছবি দেখতে দেখতে দর্শক ভাববেন, ‘আমাদের গেছে যে দিন/একেবারেই কি গেছে?/কিছুই কি নেই বাকি?’ (‘হঠাৎ দেখা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। ক্রমে বিদিশার জিজ্ঞাসা, মানুষ একলা থাকতে ভয় পায় বলে ভুল মানুষের সঙ্গে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে? তাহলে রণজয় (সৌম্য মুখোপাধ্যায়), যে নতুন মানুষটা এসেছে বিদিশার জীবনে, সে কী করবে? জায়গা ছেড়ে দেবে কে? মেয়েটা কি নিশ্চিত নিজের সিদ্ধান্তে? এমন টানাপোড়েনের কাহিনি নিয়েই ছবি এগোয় ক্লাইম্যাক্সের দিকে। হিন্দিতে এমন অজস্র ছবি আমরা দেখেছি, বাংলা-তেও। অনেক ছবির ফ্লেভার মিশে থাকলেও, ‘মন মানে না’ আদ্যন্ত বাঙালি প্রেমের ছবি।
হিয়া প্রথম সিনেমায় যথাসাধ্য করেছেন। আড়ষ্টতা একেবারে নেই। হাসি-কান্নার প্রত্যেকটা বাঁকে তিনি সাবলীল। নাচেও পারদর্শী। একটু গাইডেন্স পেলেই তিনি ঠিক পথে যাবেন। বৃষ্টির মধ্যে তাঁর আর ঋত্বিকের একটা সিকোয়েন্স মনে রাখার মতো।
‘মন মানে না’ ছবিতে সৌম্য মুখোপাধ্যায়।
দ্বিতীয়ার্ধ পুরোটাই পাহাড়ে। মধুরা পালিতের সিনেমাটোগ্রাফি ছবির মেজাজ ফুটিয়ে তুলেছে। সব ফ্রেমই বেশ কালারফুল, সেটা বোধহয় জেন-জির কথা মাথায় রেখেই করা। নীলায়নের মিউজিক প্রাণবন্ত। ছবির ত্রিভুজ হিয়া, ঋত্বিক, সৌম্য হলেও, ‘মেঘলা’র চরিত্রে শ্বেতা মিশ্রর ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋত্বিকের বাংলা উচ্চারণ এবং হেয়ারস্টাইল নিয়ে পরিচালকের আরও সচেতনতা প্রয়োজন ছিল। আবেগ-নির্ভর অভিনয় ঋত্বিক ভালো পারেন তবু এই ছবিতে আরও প্রত্যাশা ছিল। হিয়া প্রথম সিনেমায় যথাসাধ্য করেছেন। আড়ষ্টতা একেবারে নেই। হাসি-কান্নার প্রত্যেকটা বাঁকে তিনি সাবলীল। নাচেও পারদর্শী। একটু গাইডেন্স পেলেই তিনি ঠিক পথে যাবেন। বৃষ্টির মধ্যে তাঁর আর ঋত্বিকের একটা সিকোয়েন্স মনে রাখার মতো। নজরকাড়া অভিনয় সৌম্য মুখোপাধ্যায়ের। তিনি কিন্তু লম্বা রেসের ঘোড়া। রাহুলের মায়ের চরিত্রে সুদীপা বসু একদম বিশ্বাসযোগ্য। ক্যামিও চরিত্রে রুক্মিণী মৈত্র দারুণ, সুস্মিতা সেনের কথা মনে করাবেন। কেন? সেটা নাহয় ছবিতে দেখুন। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর ঋতাভরী চক্রবর্তীর চমকটাও বেশ মজার। মনে থাকে রণজয়ের একটা সংলাপ– 'কারও জীবনে সেকেন্ড অপশন হব না বেঁচে থাকতে।' এটাই ছবি শেষ হওয়ার পরেও মনে ধাক্কা দেয়। তবে চিত্রনাট্যের ফাঁকফোকরগুলো ভরাটে আরও যত্ন নিলে ষোলো কলা পূর্ণ হত।
