shono
Advertisement
Football and War

খেলার মাঠেই যুদ্ধ শুরু, খেলার মাঠেই শান্তি! লড়াই থামিয়ে 'জীবনের পাঠ' ফুটবলের

ফুটবল-ক্রিকেট বা যে কোনও খেলা হয়তো সব যুদ্ধ থামাতে পারাবে না। কিন্তু একদিন ঝড় থামবে। সেদিন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত দুনিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে যাওয়ার 'স্পিরিট' শেখাবে খেলার মাঠ।
Published By: Arpan DasPosted: 07:56 PM Mar 01, 2026Updated: 08:30 PM Mar 01, 2026

ইরানের উপর আক্রমণ চালিয়েছে আমেরিকা ও ইজরায়েল। পালটা লড়াই করছে তেহরান। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধের আগুন। মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন বন্ধ, চোখে-মুখে আতঙ্ক। রাস্তায় বারুদের গন্ধ। এই পরিস্থিতিতে কি আর খেলাধুলো চলতে পারে? বিভিন্ন দেশে আটকে পড়েছেন ক্রীড়াবিদরা। বন্ধ হয়ে গিয়েছে একাধিক ফুটবল লিগ। যুদ্ধ যেমন খেলাধুলোর দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, তেমনই যুদ্ধ থেমেছে খেলার জন্য। ইতিহাস জুড়ে দুরকম ঘটনারই উদাহরণ আছে। চলুন ফিরে দেখা যাক, এরকমই দু'টো ঘটনা।

Advertisement

প্রথম ঘটনাটা ১৯৬৯ সালের। পরের বছর মেক্সিকোয় ফুটবল বিশ্বকাপ। তার যোগ্যতা নির্ধারণের ম্যাচ চলছে হন্ডুরাস ও এল সালভাদোরের মধ্যে। সেই ম্যাচ ৩-২ গোলে জেতে এল সালভাদোর। কে জানত এই ম্যাচের ১৪ দিনের মাথায় এল সালভাদোর আর হন্ডুরাসের মধ্যে শুরু হবে এক ভয়ানক যুদ্ধ! কে জানত, হাজার হাজার ম্যাচের তলায় হারিয়ে যাওয়ার মতো একটা ম্যাচ ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে 'ফুটবল যুদ্ধ'-এর অনুঘটক হিসেবে।

যুদ্ধের উৎস সন্ধানে ফিরে যেতে হবে আরও দু'বছর আগে। ১৯৬৭ সালে হন্ডুরাস সরকারের নতুন ভূমিরাজস্ব নীতি নিয়ে টানাপোড়েন বাড়ে দুই দেশের মধ্যে। আসলে হন্ডুরাস দেশটি এল সালভাদোরের থেকে প্রায় পাঁচগুণ বড়ো। কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে এল সালভাদোরের লক্ষ-লক্ষ মানুষ হন্ডুরাসে গিয়ে চাষবাস করত, জমিবাড়ি কিনত, এমনকি বিয়ে-থা করে সংসার করাও শুরু করত। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ওসওয়াল্ডো লোপেজ হন্ডুরাসের সামন্তপ্রভুদের স্বার্থরক্ষার জন্য এল সালভাদোরের অধিবাসীদের অধিকৃত জমি কেড়ে নেন। দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয় সালভাদোরবাসীদের। উদ্বাস্তুদের উপর শুরু হয় ধর্ষণ, বোমাবর্ষণ এবং গণহত্যা!

এল সালভাদোর দল। ফাইল ছবি

এই পরিস্থিতিতেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জনের ম্যাচ। ‘কনকাকাফ’ থেকে তখন বিশ্বকাপে খেলার মাত্র একটাই জায়গা পড়ে আছে। হন্ডুরাসের মাটিতে প্রথম পর্বের ম্যাচে তারাই জেতে। তবে আসল গন্ডগোল শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে। ১৯৬৯ সালের ১৫ জুন দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে এল সালভাদোরের সমর্থকরা হন্ডুরাসের ফুটবলারদের প্রবল উত্যক্ত করে। ম্যাচ চলাকালীন হন্ডুরাসের জাতীয় পতাকা আর জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে চলে অকথ্য নোংরামি। ম্যাচের পরের দাঙ্গায় মারা যায় তিন সালভাদোরবাসী। এরপর ২৭ জুন মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্লে-অফের ম্যাচে ফের মুখোমুখি দুটি দেশ। ওইদিন সকালেই এল সালভাদোরের সরকার হন্ডুরাসের সঙ্গে সমস্ত রাজনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা করে। সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের ১১ মিনিটে গোলে সালভাদোর ম্যাচটি ৩-২ গোলে জিতে যায়।

এল সালভাদোর ও হন্ডুরাস ম্যাচের একটি মুহূর্ত। ফাইল ছবি

এর ঠিক ১৬ দিনের মাথায় ১৪ জুলাই এল সালভাদোর আচমকাই আক্রমণ করে হন্ডুরাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়। পালটা জবাব দেয় হন্ডুরাস। আশেপাশের দেশগুলিও জড়িয়ে পড়ে এই যুদ্ধে। যুদ্ধের আগেই প্রায় তিন লাখ সালভাদোরবাসী উদ্বাস্তু হয়েছিল। যুদ্ধকালে মারা যান সালভাদোরের প্রায় ৯০০ সাধারণ মানুষ, হন্ডুরাসের ২৫০ প্রশিক্ষিত সৈন্য ও ২০০০ সাধারণ মানুষ। হন্ডুরাসের বেশ কিছু জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়। ১০০ ঘণ্টা যুদ্ধের পর শেষমেশ যুদ্ধবিরতি হয়। যুদ্ধ শেষ হল ঠিকই, কিন্তু বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ রইল প্রায় আটের দশক পর্যন্ত। হন্ডুরাস তার অধিকাংশ জমিই ফেরত পায়। ফনসেকা অঞ্চলটি আজও দু’দেশের মৈত্রীস্থাপনের চিহ্ন হিসেবেই বিবেচিত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দুটো দল এরপর বিশ্বকাপে একাধিকবার যোগ্যতা অর্জন করেছে ঠিকই, তবে কোনও দল বিশ্বকাপে কোনও ম্যাচ আজ পর্যন্ত জিততে পারেনি।

এল সালভাদোর ও হন্ডুরাস ম্যাচের একটি মুহূর্ত। ফাইল ছবি

এ তো গেল যুদ্ধশুরুর গল্প। এবার বলা যাক যুদ্ধশেষের কথা। তার জন্য যেতে হবে ২০০৫ সালের আইভরি কোস্টে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পায়। আর ২০০২ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে শুরু হয় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। দেশটা স্পষ্টত দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। দেশের উত্তরভাগের মালিকানা বিদ্রোহী গুইলিয়ামো সোরোর হাতে। দক্ষিণভাগে রাজধানী আবিদজান ও তার পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চলে কোণঠাসা হয়ে টিকে আছে প্রেসিডেন্ট লরেন্ট বাগবোর বাহিনী। জাতিসংঘের উপস্থিতি, ফ্রান্সের মধ্যস্থতা কোনও কিছুই দেশের হৃদয়কে জুড়তে পারছে না। রাজপথে টহলরত সেনা, প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি-বিনিময়, ট্যাঙ্কের সতর্ক পাহারা ও ভবিতব্যের মতো মৃত্যুদূতের অপেক্ষার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে আইভরি কোস্ট-বাসী। উভয়পক্ষের প্রায় ৬০০ সৈন্য ও প্রায় ১৫০০ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর চিহ্ন নিয়ে তারা তখন এক ‘মসিহা’র আগমনের প্রতীক্ষারত।

সেই 'মসিহা' এলেন কমলা জার্সি পরে। তাঁর জার্সি নম্বর ১১, বুকে হাতি-সম্বলিত লোগো, পায়ে ফুটবল। তিনি দিদিয়ের দ্রোগবা। শুধু দ্রোগবা নয়, কোলো তোরে, ইমানুয়েল ইবৌ, দিদিয়ের জোকোরার মতো ‘সোনালি প্রজন্ম’-এর প্লেয়াররা সেই সময়ে ইউরোপের মাটিতে দাপিয়ে ফুটবল খেলে বেড়াচ্ছেন। ২০০৬-এর বিশ্বকাপের যোগ্যতা নির্ণায়ক ম্যাচে সুদানের মুখোমুখি তাঁরা। এদিকে সুদানের সঙ্গে ড্র, অন্য ম্যাচে মিশরের বিরুদ্ধে ক্যামেরুনের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি মিসে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার দরজা খুলে গেল তাঁদের সামনে।

দিদিয়ের দ্রোগবা। ফাইল ছবি

ম্যাচের পর দ্রোগবার নেতৃত্বে ফুটবলাররা ক্যামেরার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে যুদ্ধবন্ধের আহ্বান জানান। তাঁর সেই আহ্বান পৌঁছে ছিল দুই বিবাদমান নেতার কাছে। যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল, নির্বাচন হয়েছিল, শান্তি ফিরেছিল। দু’বছর পর যখন ফের গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস দেখা দেয়, তখন দ্রোগবা আফ্রিকান কাপের ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানান বিদ্রোহীদের ঘাঁটি বউয়াকাতে। সেই ম্যাচে প্রায় ২৫০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের নেতা একসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত উচ্চারণ করেন। পাঁচ গোলে জেতা ম্যাচটিতে দ্রোগবার শেষ গোলটির সঙ্গে সমগ্র স্টেডিয়াম গর্জন করে ওঠে।

দিদিয়ের দ্রোগবা। ফাইল ছবি

সেদিন দ্রোগবার গোলে জিতেছিল আত্মঘাতী গোলে হারতে বসা একটা গোটা দেশের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আইভরি কোস্টের আড়াই কোটি মানুষের মুক্তিকামনা একসঙ্গে গোল করেছিল। জিতেছিল বিশ্বের সমস্ত প্রান্তে বৈষম্য ও যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা কোটি কোটি মানুষের চেতনা। একটা যুদ্ধের নেপথ্যে বহু রাজনৈতিক অঙ্ক থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত রাস্তাজুড়ে দাপিয়ে বেড়ায় মৃত্যুদূতই। গোলা-বারুদে স্তব্ধ হয়ে যায় জীবন। ফুটবল-ক্রিকেট বা যে কোনও খেলা হয়তো সব যুদ্ধ থামাতে পারাবে না। কিন্তু একদিন ঝড় থামবে। সেদিন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত দুনিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে যাওয়ার 'স্পিরিট' শেখাবে খেলার মাঠ।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement