স্বাস্থ্য সচেতনার দৌড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে খাবারের সেই আনন্দটা। একসময় খাবার মানেই ছিল মায়ের হাতের তৈরি ভাত-ডাল, তরকারি, মাছ, মাংসের সুস্বাদু পদ, সন্ধ্যেতে মুড়ি-চানাচুর, আর ছুটির দিনে পাঠার মাংসের মতো সবচেয়ে প্রিয় কোনও পদ, মিষ্টি। যেখানে থাকত না প্রোটিন, ক্যালরি বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের হিসেব।
সময় বদলেছে। এখন যেন প্রতিটি খাবারের আগে প্রশ্ন একটাই, 'এতে কত গ্রাম প্রোটিন আছে?' এই বদলে যাওয়া সময়ের মাঝেই বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাট হঠাৎ যেন অনেকের মনের কথাই বললেন। সম্প্রতি তিনি তাঁর বোন শাহিন ভাটের একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরি শেয়ার করেন। সেখানে লেখা, 'আমার সবচেয়ে প্রিয় শৈশবের স্মৃতি হল, তখন কখনও প্রোটিন নিয়ে ভাবতে হতো না।'
আলিয়া ভাট। ছবি: সংগৃহীত
ছোট্ট একটি বাক্য। অথচ তাতেই যেন ধরা পড়ল বর্তমান প্রজন্মের খাদ্যসংস্কৃতির এক গভীর ক্লান্তির ছবি। আজ বাজারে ঢুকলেই চারদিকে 'হাই-প্রোটিন' শব্দের ছড়াছড়ি। দুধ থেকে বিস্কুট, পাউরুটি থেকে আইসড কফি, সবকিছুর গায়ে এখন বাড়তি প্রোটিনের তকমা।
কী খাচ্ছি তার চেয়ে কত গ্রাম প্রোটিন পাচ্ছি, সেটাই যেন বড় হয়ে উঠেছে! স্বাস্থ্য সচেতনতার নামে এই নতুন বাজার তৈরি করেছে এক অদ্ভুত চাপ, যেন সুস্থ থাকতে হলে প্রতিটি খাবারের মধ্যেই আলাদা করে প্রোটিন খুঁজে নিতেই হবে!
আলিয়ার কথায়, ছোটবেলায় আলাদা করে প্রোটিন নিয়ে এত ভাবতে হয়নি। বাড়ির সাধারণ খাবার খেয়েই সুস্থ থাকতাম। ছোটবেলার মতো এখনও ঘরোয়া খাবারেই ভরসা রাখেন তিনি। সকালে ওটস, পোহা, অঙ্কুরিত ছোলা ও বাদাম। দুপুরে ডাল-ভাত, সবজি, দইয়ের রায়তা সঙ্গে মাছ বা চিকেন থাকে পাতে। বিকেলে ফল ও বাদাম, আর রাতে খিচুড়ি, স্যুপ বা গ্রিলড চিকেনই পছন্দ অভিনেত্রীর। বাজারি প্রোটিন শেক নয়, ঘরের খাবার থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি মেলে বলেই বিশ্বাস আলিয়ার। এই ডায়েটেই কি লুকিয়ে তাঁর গ্ল্যামার রহস্য?
ভরসা সাবেকি খাবারেই। ছবি: সংগৃহীত
প্রোটিনের গুরুত্ব নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শরীরের পেশি গঠন, ক্ষয় মেরামত, শক্তি ধরে রাখা, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকা, সব ক্ষেত্রেই এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে পেশির ক্ষয় রোধ করতেও প্রোটিন প্রয়োজন। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন বা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। তাই চিকিৎসকরা বরাবরই সুষম প্রোটিন গ্রহণের পরামর্শ দেন।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। প্রয়োজন আর ট্রেন্ড, এই দুয়ের সীমারেখা এখন অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁরা নিয়মিত সুষম খাবার খান, তাঁদের জন্য আলাদা করে অতিরিক্ত প্রোটিনযুক্ত খাবার সবসময় জরুরি নয়।
পুষ্টিবিদদের মতে, সাধারণ খাদ্যাভ্যাস থেকেই একজন মানুষ পর্যাপ্ত প্রোটিন পেতে পারেন। ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ বা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ খাবার, সব মিলিয়েই শরীরের প্রয়োজন মেটে। ফলে অনেক সময় ‘হাই-প্রোটিন’ পণ্যগুলো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিপণনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
পুষ্টিবিদদের কথায়, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন যাঁরা, বিশেষ করে স্ট্রেন্থ ট্রেনিং বা পেশি বাড়াতে চান, তাঁদের জন্য বাড়তি প্রোটিন উপকারী হতে পারে। কিন্তু সবাইকে একই খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ শরীরের চাহিদা যেমন আলাদা, তেমনই জীবনযাপনও আলাদা।
ভাত, ডাল, মাছেই মেলে পুষ্টি? ছবি: সংগৃহীত
বর্তমানে সোশাল মিডিয়ার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে 'ফিটনেস কালচার'। সেখানে খাবারের আনন্দের চেয়ে শরীরের গঠন বা নির্দিষ্ট ডায়েট প্ল্যানই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে অনেকেই না বুঝেই এক ধরনের মানসিক চাপে ভুগছেন। কী খাচ্ছেন তার চেয়ে কতটা প্রোটিন খাচ্ছেন, সেটাই যেন হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই কারণেই আলিয়া ভাটের পোস্ট বহু মানুষের মনে দাগ কেটেছে। কারণ সেটি শুধুই প্রোটিন নিয়ে মন্তব্য নয়, বরং খাবারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার এক নিঃশব্দ আক্ষেপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনে প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। তবে শরীরচর্চা, বয়স ও জীবনযাপনের উপর নির্ভর করে এই পরিমাণ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রোটিন খেলেই হবে না, নিয়মিত ব্যায়াম ও সক্রিয় জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ থাকা মানে শুধু খাবারের পুষ্টিগুণ গোনা নয়। মানসিক স্বস্তি, খাবারের আনন্দ এবং নিজের শরীরের প্রয়োজন বোঝাটাও সমান জরুরি। কারণ খাবার যদি শুধুই সংখ্যার খেলায় আটকে যায়, তাহলে হয়তো একদিন সত্যিই আমরা ভুলে যাব, একসময় খাবার মানেই ছিল নিখাদ আনন্দ।
