চন্দননগরের রথীনবাবু। মাঝেমধ্যেই পেটের ব্যথায় ভুগতেন। ব্যথাটা পেটের মাঝ বরাবর দেখা দিত। এমনকী ডান কাঁধেও ছড়িয়ে পড়ত কখনও-সখনও। গ্যাসের ব্যথা মনে করে রথীনবাবু বছর খানেক এড়িয়ে গেলেন। অ্যান্টাসিড খেয়ে সাময়িক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করতেন। আর ঠিক এভাবেই নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুলটা বসালেন। ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পারলেন, পিত্তথলিতে পাথর জমেছে। অস্ত্রোপচার ছাড়া এখন আর কোনও উপায় নেই।
ফাইল ছবি
সাধারণ মানুষের ধারণা, অতিরিক্ত তেল-ঝাল-মশলা বা চর্বিযুক্ত খাবারই বোধহয় পিত্তথলির একমাত্র শত্রু। কিন্তু আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে। ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’ এবং ‘ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল’-এর একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, পিত্তথলির প্রায় ৮০ শতাংশ পাথরই আসলে কোলেস্টেরল স্টোন। যখন যকৃৎ বা লিভার থেকে পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল নিঃসৃত হয় এবং তা ঠিকমতো দ্রবীভূত হতে পারে না, তখনই তা ধীরে ধীরে স্ফটিকের আকার নিতে শুরু করে। ‘আমেরিকান জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’-র একটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যারা অতিরিক্ত চিনি এবং পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ ময়দা জাতীয় খাবার বেশি খান, তাদের পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি।
ফাইল ছবি
মেডিকেল সায়েন্স বলছে, চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা একধাক্কায় বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি ইনসুলিন লিভারকে আরও বেশি কোলেস্টেরল তৈরি করতে প্ররোচিত করে। ফলে পিত্তরসের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দ্রুত পাথর জমতে শুরু করে। এর সঙ্গে যদি রোজকার ডায়েটে পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (যেমন শাকসবজি বা গোটা দানা শস্য) না থাকে, তবে পিত্তথলি অলস হয়ে পড়ে। ফলে পিত্তরস পিত্তথলিতেই জমতে শুরু করে।
এখানেই শেষ নয়। বিস্কুট, প্যাটিস বা হোয়াইট ব্রেডে থাকা ট্রান্স ফ্যাট পিত্তরসের রাসায়নিক গঠন পুরোপুরি বদলে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে পিত্তথলিকে একটি ‘পাথরের খনি’তে পরিণত করে। অন্যদিকে রেড মিট বা লাল মাংসে থাকা অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম ও ফ্যাট পিত্তরসে থাকা লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে শক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে মাছ বা মুরগির তুলনায় যারা খাসি বা গরুর মাংস বেশি খান, তাদের ক্ষেত্রে পিত্তথলিতে ‘ইনফ্লামেশন’ বা তীব্র প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি সোডাযুক্ত পানীয় বা সফ্ট ড্রিংকসে থাকা ফসফরিক অ্যাসিড এই পাথরের আয়তন বাড়াতে অনুঘটকের কাজ করে।
ফাইল ছবি
এই রোগ থেকে বাঁচার উপায় কী? চিকিৎসকদের পরামর্শ, পিত্তথলিকে সুস্থ রাখতে প্লেট থেকে আজই চিনি ও ময়দাকে বিদায় জানান। বদলে ডায়েটে রাখুন ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল, বাদাম এবং অলিভ অয়েলের মতো ‘গুড ফ্যাট’। মনে রাখবেন, গলব্লাডারের পাথর শুধু শারীরিক যন্ত্রণা বাড়ায় না, সামগ্রিক হজম প্রক্রিয়ার ভিত দুর্বল করে তোলে। তাই সুস্থ থাকতে জিভের স্বাদে রাশ টানা অত্যন্ত জরুরি।
রথীনবাবু একসময় কবজি ডুবিয়ে খেতেন। তা সে খাসির ঝোল হোক, বা শেষপাতে রসগোল্লা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুট, আর বাইরে বেরোলেই কোল্ড ড্রিংকস। তাঁর নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপন শেষপর্যন্ত পিত্তথলিতে পাথরের কারণ হয়ে উঠল। আগে থেকে সাবধান হলে হয়তো আজ এই সমস্যায় পড়ত হত না তাঁকে। এ গল্প আমাদের ক্ষেত্রেও সত্যি। আগে থেকে সচেতন থাকলে কোনও বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
