আপনার সন্তান কি দুধ খেতে একটু বেশি সময় নিচ্ছে? মাঝেমধ্যেই খাওয়া থামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে? হাঁপিয়ে পড়ছে? বা ওজন ঠিকমতো বাড়ছে না?— এমনটা দেখে অনেক মা-বাবাই ভাবেন, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই লক্ষণগুলির আড়ালেই কখনও কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে জন্মগত হৃদ্রোগ। তাই ছোট ছোট পরিবর্তনও অবহেলা করা উচিত নয়।
জন্মগত হৃদ্রোগ (কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ) (Congenital Heart Disease in Babies) হল এমন একটি অবস্থা, যেখানে গর্ভাবস্থায় শিশুর হৃদ্যন্ত্র বা তার প্রধান রক্তনালিগুলি স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে না। বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ জন্মগত ত্রুটিগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। কারও ক্ষেত্রে জন্মের পরই রোগ ধরা পড়ে, আবার অনেক শিশুর ক্ষেত্রে লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। তাই প্রাথমিক উপসর্গগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
চিকিৎসকদের কথায়, ভারতে শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট (ভিএসডি), যেখানে হৃদ্যন্ত্রের নিচের দুই প্রকোষ্ঠের মাঝের দেওয়ালে একটি ছিদ্র থাকে। এছাড়া টেট্রালজি অফ ফেলটের মতো জটিল জন্মগত হৃদ্রোগও কম নয়। অনেক সময় এই সমস্যাগুলির লক্ষণ এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে সহজেই অন্য সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে যায়।
খাওয়াতে কষ্ট? ছবি: সংগৃহীত
খাওয়াতে কষ্ট, ঘাম আর হাঁপিয়ে পড়া
জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলির একটি হল খাওয়াতে অসুবিধা। বুকের দুধ বা বোতলের দুধ খেতে খেতেই তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কয়েক মিনিট খাওয়ার পর থেমে যায়, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার খেতে শুরু করে। চিকিৎসকদের ভাষায় একে বলা হয় ‘সাক-রেস্ট-সাক’ চক্র।
খাওয়ানোর সময় অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়া এবং বারবার ক্লান্ত হয়ে পড়াও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, এই শিশুরা যতটা শক্তি খাবার থেকে পায়, তার চেয়েও বেশি শক্তি খরচ করে ফেলে।
ওজন বাড়ছে না?
নিয়মিত সঠিক পরিমাণে খাওয়ানো সত্ত্বেও যদি সন্তানের ওজন না বাড়ে, তা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কারণে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে বাধা তৈরি হয়। ফলে শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক গতিতে এগোয় না।
বিকাশেও পড়তে পারে প্রভাব
শিশুর হামাগুড়ি দেওয়া, বসা, দাঁড়ানো বা হাঁটার মতো স্বাভাবিক বিকাশের ধাপগুলি অনেক সময় দেরিতে আসে। শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে শারীরিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
দীর্ঘদিন একই সমস্যা অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
বারবার বুকে সংক্রমণ
যদি শিশুর ঘন ঘন নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস বা অন্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হয়, তার নেপথ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা। হৃদ্যন্ত্রের গঠনগত ত্রুটির কারণে ফুসফুসে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ঠোঁট নীলচে হয়ে গেলে সতর্ক হোন
ঠোঁট, জিভ, মাড়ি, নখ বা আঙুলের ডগা নীলচে বা বেগুনি রঙের দেখালে তা সায়ানোসিসের লক্ষণ হতে পারে। এর অর্থ, শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাচ্ছে না। গায়ের রং শ্যামলা হলে এই পরিবর্তন সহজে চোখে নাও পড়তে পারে। তাই সামান্য সন্দেহ হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
দ্রুত রোগ ধরা পড়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সব জন্মগত হৃদ্রোগ সমান গুরুতর নয়। কিছু ক্ষেত্রে শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট, আবার কিছু শিশুর ওষুধ, ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে শিশু হৃদ্রোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তাই সময়মতো রোগ নির্ণয় হলে অধিকাংশ শিশুই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকেরা শারীরিক পরীক্ষা, পালস অক্সিমেট্রি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, বুকের এক্স-রে এবং ইসিজির মতো পরীক্ষা করাতে বলেন।
প্রয়োজনে জরুরি চিকিৎসকের পরামর্শ। ছবি: সংগৃহীত
কোন লক্ষণ দেখলে দেরি করবেন না?
- দুধ খেতে কষ্ট হওয়া বা খেতে অনেক সময় লাগা
- খাওয়ানোর সময় অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- ওজন না বাড়া
- বয়স অনুযায়ী বিকাশে দেরি
- বারবার বুকের সংক্রমণ
- ঠোঁট, জিভ বা নখ নীলচে হয়ে যাওয়া
- দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি
এই লক্ষণগুলির অর্থ সবসময় যে জন্মগত হৃদ্রোগ, তা নয়। তবে এগুলিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে রোগ ধরা পড়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। আর তাতেই শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, স্বাভাবিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতের জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
