হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি দেব আনন্দ ও কল্পনা কার্তিকের একমাত্র ছেলে, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সুনীল আনন্দ আর নেই। ৭০ বছর বয়সে ব্রিটেনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, আমেরিকা থেকে ভারতে ফেরার পথে লন্ডনে আচমকাই হৃদরোগে আক্রান্ত হন সুনীল আনন্দ।
দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকেরা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের আগেই ফের হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। দীর্ঘ চেষ্টার পরও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনাই নতুন করে সামনে আনল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথম হার্ট অ্যাটাক থেকে বেঁচে গেলেই কি বিপদ কেটে যায়? নাকি দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক আরও ভয়ংকর হতে পারে?
সুনীল আনন্দ। ছবি: সংগৃহীত
কেন দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক বেশি মারাত্মক?
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম হার্ট অ্যাটাকেই হৃদপেশির একটি অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দ্বিতীয়বার রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হলে হৃদযন্ত্রের লড়াইয়ের শক্তি অনেকটাই কমে যায়। যে অংশ এখনও সুস্থ রয়েছে, তার উপরই অতিরিক্ত চাপ এসে পড়ে। তাই দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক অনেক সময় প্রথমটির তুলনায় অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
এছাড়া, প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এরপর আবার কোনও ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট ফেলিওর, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, কার্ডিওজেনিক শক, এমনকী আকস্মিক মৃত্যুর আশঙ্কাও অনেকটাই বেড়ে যায়।
স্টেন্ট বসালেই কি নিশ্চিন্ত?
এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। অনেকেই ভাবেন, একবার স্টেন্ট বসে গেলেই আর হার্ট অ্যাটাকের ভয় নেই। বাস্তব কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন।
স্টেন্ট একটি বন্ধ ধমনিকে খুলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। কিন্তু যে রোগের কারণে ধমনিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হয়েছিল, সেই করোনারি আর্টারি ডিজিজ থেকে যায়। তাই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন বা নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপন যদি একইভাবে চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে অন্য ধমনিতেও ব্লক তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, স্টেন্ট চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কিন্তু সেটি কখনওই রোগের স্থায়ী সমাধান নয়।
বাবা দেব আনন্দের সঙ্গে। ছবি: সংগৃহীত
কেন থেকেই যায় দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা?
হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ ধমনিতে জমে থাকা চর্বির স্তর ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধা। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি সেই মুহূর্তের সমস্যা দূর করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে নতুন করে চর্বি জমা আটকাতে পারে না।
অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, স্থূলতা, শরীরচর্চার অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই লক্ষণগুলি কখনও অবহেলা করবেন না
যাঁদের আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিচের উপসর্গগুলির কোনও একটি দেখা দিলেও দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত-
- বুকে চাপ, ব্যথা বা ভারী লাগা
- ব্যথা চোয়াল, ঘাড়, কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়া
- হঠাৎ শ্বাসকষ্ট
- প্রচণ্ড ঘাম
- মাথা ঘোরা
- বমি বমি ভাব
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই সামান্য সন্দেহ হলেও দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সময় নষ্ট মানেই বাড়তে পারে ক্ষতি
হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট অমূল্য। যত বেশি সময় রক্ত চলাচল বন্ধ থাকবে, তত বেশি হৃদপেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতি হবে। তাই বুকে ব্যথা বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে বা অপেক্ষা করে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনোই সবচেয়ে জরুরি।
বুকে ব্যথাকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
ওষুধ বন্ধ করার ভুল করবেন না
হার্ট অ্যাটাকের পর অনেকেই সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। চিকিৎসকদের মতে, এটাই সবচেয়ে বড় ভুলগুলির একটি। হার্টের ওষুধ শুধু বর্তমান সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে না, ভবিষ্যতের হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
কীভাবে কমাবেন দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি?
দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় সচেতনতা। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান, মদ্যপান থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো।
প্রথম হার্ট অ্যাটাক আসলে শেষ নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিলে এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলে দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
