প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি অতিরিক্ত চিনি খাওয়া নিয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, সেটি নিছক সচেতনতা নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনযাত্রায় লুকিয়ে থাকা 'অ্যাডেড সুগার' এখন নিঃশব্দে শরীরের নানা সমস্যার মূল কারণ হয়ে উঠছে। চিকিৎসকদের কথায়, অতিরিক্ত চিনি শরীরের জন্য় মারাত্মক ক্ষতিকর।
প্রথমত, লিভারের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়ে। অতিরিক্ত চিনি, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ, লিভারে জমে ফ্যাট তৈরি করে। এর ফলে দেখা দিতে পারে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, যা ধীরে ধীরে লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে গুরুতর জটিলতা ডেকে আনতে পারে।
লিভার থেকে হার্ট অতিরিক্ত চিনিতে সবেরই দফারফা। ছবি: সংগৃহীত
ওজন বৃদ্ধি এবং স্থূলতা এখন প্রায় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে অতিরিক্ত চিনির। চিনি শরীরে ক্যালরি যোগ করলেও পেট ভরায় না, ফলে আমরা অজান্তেই বেশি খেয়ে ফেলি। এর ফলে ওবেসিটির ঝুঁকি বাড়ে, যা আবার অনেক রোগের সূত্রপাত করে।
চিনির আরেকটি বড় বিপদ হল ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করা। দীর্ঘদিন বেশি চিনি খেলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি সাড়া কমিয়ে দেয়, যার ফলস্বরূপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়। একবার এই রোগ ধরলে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সারাজীবনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
হৃদ্যন্ত্রও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। অতিরিক্ত চিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ায়, ভালো কোলেস্টেরল কমায় এবং প্রদাহ বাড়ায়- যা হার্টের অসুখের ঝুঁকিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাকে বাড়ায় কয়েকগুণ। ছবি: সংগৃহীত
অনেকেই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেন, কিন্তু দাঁতের ক্ষয়ও একটি বড় সমস্যা। মুখের ব্যাকটেরিয়া চিনি ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে, যা এনামেলের ক্ষতি করে এবং এতে দাঁতে ক্ষয়ের সূত্রপাত হয়।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিকেও প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত চিনি খেলে মুড সুইং, অস্থিরতা, মনোযোগ কমে যাওয়া- এসব সমস্যাও দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অ্যালজাইমার্সের ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্ত্রের স্বাস্থ্যের কথাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি গাট ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে, যার ফলে হজমের সমস্যা, পেট ফাঁপা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকদের পরামর্শ, চিনি সম্পূর্ণ বাদ দিতে পারলে তো ভালোই, তবে সেটা সম্ভব না হলে, চিনি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্যাকেটজাত খাবার, ঠান্ডা পানীয়, মিষ্টি জাতীয় খাবার কমিয়ে প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ঝোঁক বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা বা যোগব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
অভ্যেস ছোট থেকে শুরু হয়। আজই যদি চায়ের চিনি একটু কমানো যায়, সেটাই ভবিষ্যতের বড় রোগ এড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
