ওরাল কেয়ার (Oral Care) বা মুখগহ্বরের যত্ন মানেই শুধু দাঁতের যত্ন বা উজ্জ্বল হাসি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সামগ্রিক সুস্থতা। মুখগহ্বরের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে, তার প্রভাব পড়তে পারে শরীরের বিভিন্ন অংশে। এই কারণেই প্রতি বছর ২০ মার্চ পালিত হয় ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে (World Oral Health Day) বা মুখগহ্বরের স্বাস্থ্যরক্ষা দিবস। দিনটি পালনের উদ্দেশ্য় মানুষকে মুখগহ্বরের যত্ন সম্পর্কে সচেতন করা যায়।
এ বছর ওয়ার্ল্ড ওরাল হেলথ ডে-র থিম 'অ্য়া হ্যাপি মাউথ ইস অ্য়া হ্যাপি লাইফ', অর্থাৎ, সুস্থ মুখগহ্বর মানেই সুস্থ জীবন। মুখগহ্বরের যত্ন মানে শুধুমাত্র রোজ দাঁত মাজা নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। মুখগহ্বরের সুস্থতা আনে আত্মবিশ্বাস, স্বাচ্ছন্দ্য আর সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য়কর দিনযাপন।
মুখের যত্ন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকেই মনে করেন দাঁত ব্রাশ করলেই সব ঠিক আছে। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। আমাদের মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, তা মাড়ির সমস্যা, দাঁতের ক্ষয়, এমনকী শরীরে অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাড়ির অসুখের সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্কও থাকতে পারে। বিশেষ করে রাতে ঘুমের সময় মুখে লালা কম উৎপন্ন হয়। ফলে মুখের ভেতর স্বাভাবিক পরিষ্কার প্রক্রিয়া ধীর হয় এবং ব্যাকটেরিয়া সহজেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই রাতে মুখগহ্বরের যত্নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
মুখগহ্বরের কোনও সমস্যাকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
সকাল ও রাতের যত্ন: কীভাবে করবেন?
সকালের যত্ন মূলত মুখগহ্বরকে দিনের জন্য প্রস্তুত করে। ঘুমের সময় জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সকালে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে অন্তত দু-মিনিট ব্রাশ করা জরুরি। পাশাপাশি জিভ পরিষ্কার করলে মুখের দুর্গন্ধও দূর হয়। প্রয়োজনে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, রাতের যত্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের আগে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবার বের করতে ফ্লস বা ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত। এরপর ভালোভাবে ব্রাশ করে নিন। খুব বেশি কুলকুচি না করাই ভালো। এতে টুথপেস্টের ফ্লোরাইড দাঁতের ওপর বেশি সময় কাজ করতে পারে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মেডিকেটেড মাউথওয়াশও ব্যবহার করা যেতে পারেন।
কতবার নয়, কীভাবে ব্রাশ করছেন সেটাই আসল
অনেকেই ভাবেন দিনে বারবার ব্রাশ করলেই দাঁত ভালো থাকবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পদ্ধতিতে দিনে দু'বার ব্রাশ করাই যথেষ্ট। নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন। ব্রাশটি ৪৫ ডিগ্রি কোণে ধরে মাড়ির অংশ পরিষ্কার করুন। আস্তে আস্তে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্রাশ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খুব জোরে ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে এবং মাড়িতেও আঘাত লাগতে পারে।
কতবার ব্রাশ করছেন, তার চেয়েও জরুরি কীভাবে ব্রাশ করছেন। ছবি: সংগৃহীত
ফ্লস ও মাউথওয়াশ: কতটা দরকার
শুধু ব্রাশে দাঁতের সব অংশ পরিষ্কার হয় না। দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা প্লাক ও খাবারের কণা থেকেই ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগের সূত্রপাত হয়। তাই ফ্লস করা অত্যন্ত জরুরি। যাদের ফ্লস ব্যবহারে অসুবিধা রয়েছে, তারা ইন্টারডেন্টাল ব্রাশও ব্যবহার করতে পারেন। এটি অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি কার্যকর।
চাইলে মাউথওয়াশও ব্যবহার করতে পারেন, তবে এটি কখনওই ব্রাশ বা ফ্লসের বিকল্প নয়। নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য বিশেষ ধরনের মাউথওয়াশ ব্যবহার করা হয়, যেমন মাড়ির সমস্যায় বা ক্যাভিটির ঝুঁকি বেশি থাকলে।
ফ্লস কী?
ডেন্টাল ফ্লস হল নাইলন বা প্লাস্টিকের তৈরি এক ধরনের পাতলা সুতা, যা ব্রাশের পৌঁছতে না পারা দাঁতের ফাঁক থেকে খাবার, প্লাক এবং ময়লা পরিষ্কার করতে ব্যবহৃত হয়। এটি নিয়মিত ব্যবহারে মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ সম্ভব হয়। ওরাল হাইজিন বজায় রাখার জন্য় ফ্লস অপরিহার্য।
মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য়রক্ষায় জরুরি ফ্লস। ছবি: সংগৃহীত
যেগুলো এড়ানো জরুরি
মুখগহ্বরের যত্নে কিছু সাধারণ ভুল অনেক বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সেগুলোকে এড়িয়ে কী কী মেনে চলবেন-
- খুব জোরে ব্রাশ করবেন না
- মাড়ির অংশকে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন
- ফ্লস করুন
- অ্যাসিডিক খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করবেন না। টক বা অম্লীয় খাবার দাঁতের এনামেলকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে, তাই তৎক্ষণাদ ব্রাশ করলে এনামেল ক্ষয় হয়ে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে
- দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার করবেন না
- মিষ্টিজাতীয় কিছু খেলে, ভালো করে কুলকুচি করুন
- ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য় সেবন থেকে দূরে থাকুন
এ ছাড়া অনেকেই ব্রাশ করার পর বারবার কুলকুচি করেন, এতে টুথপেস্টের উপকারী উপাদান আর মুখে থাকে না। আবার মাড়ি থেকে রক্ত পড়লেও অনেকে গুরুত্ব দেন না, যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। মুখের অভ্য়ন্তরের কোনও সমস্যাকে অবহেলা করবেন না। দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মনে রাখুন, মুখগহ্বরের যত্ন নেওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। প্রতিদিনের কিছু সঠিক অভ্যেসই আপনার দাঁত-সহ সামগ্রিক মুখগহ্বরকে সুস্থ রাখবে, হাসিকে করবে উজ্জ্বল এবং শরীরকেও রাখবে ভালো।
