তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশের বড় অংশ। ঘরের ভেতরেও যেন আগুনের ছোঁয়া, বাইরে বেরলেই মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, ঘাম আর অস্বস্তি। এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মধ্যে শরীর দ্রুত ঠান্ডা রাখার সহজ উপায় খুঁজছেন অনেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে একেবারে সাধারণ একটি অভ্যাসে— ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে রাখা।
শুনতে অবাক লাগলেও, চিকিৎসকদের মতে এই পদ্ধতি শরীরের তাপ দ্রুত কমাতে সাহায্য করতে পারে। কমতে পারে অতিরিক্ত গরমে হওয়া ক্লান্তি, ডিহাইড্রেশন, অস্বস্তি, এমনকী হিট এগ্জশনের ঝুঁকিও।
বাড়ছে তাপপ্রবাহের দাপট। ছবি: সংগৃহীত
কেন পা ঠান্ডা রাখলে শরীরও ঠান্ডা হয়?
আমাদের পায়ের ত্বকের খুব কাছেই রয়েছে অসংখ্য রক্তনালী। যখন ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে রাখা হয়, তখন সেই রক্তনালীর মাধ্যমে প্রবাহিত রক্তও ঠান্ডা হতে শুরু করে। সেই ঠান্ডা রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
চিকিৎসকদের কথায়, অতিরিক্ত গরমে শরীর নিজে থেকেই ঘাম ঝরিয়ে ও রক্তনালী প্রসারিত করে তাপ বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে শরীরের এই স্বাভাবিক কুলিং সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তখনই দেখা দেয় মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমিভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা হিটস্ট্রোকের মতো বিপজ্জনক সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে রাখা শরীরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
কী বলছে গবেষণা?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গোড়ালির উপর পর্যন্ত ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে রাখলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমায় সাহায্য মেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার জল সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
তবে বরফ-ঠান্ডা জল ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন চিকিৎসকরা। কারণ অতিরিক্ত ঠান্ডা জল হঠাৎ রক্তনালী সঙ্কুচিত করে শরীরে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
মিলবে স্বস্তি? ছবি: সংগৃহীত
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন?
- রোদে ঘুরে কাজ করা মানুষজন
- খেলোয়াড় ও অ্যাথলিট
- প্রবীণ মানুষ
- যাঁদের বাড়িতে এসি নেই
- দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকার পর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে
কীভাবে মিলবে আরাম?
- বরফ নয়, ব্যবহার করুন ঠান্ডা জল। জল যেন আরামদায়ক ঠান্ডা হয়, অতিরিক্ত কনকনে নয়।
- গোড়ালির উপর পর্যন্ত পা ডুবিয়ে রাখুন। এতে বেশি রক্তনালী ঠান্ডা হয়।
- ১০ থেকে ২০ মিনিট যথেষ্ট। অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
- পরিমিত জল পান করুন। পা ঠান্ডা করলেই হবে না, শরীরকে হাইড্রেটেড রাখাও জরুরি।
- সঙ্গে অন্য কুলিং পদ্ধতিও ব্যবহার করুন। ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন, ফ্যান বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলুন।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হিটওয়েভ দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যেমন—
- প্রবীণ ব্যক্তি
- শিশু
- গর্ভবতী মহিলা
- হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা
- বাইরে কাজ করা মানুষ
- ডিহাইড্রেশন বা অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি
বরফ-ঠান্ডা জল নয়। ছবি: সংগৃহীত
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখলে সতর্ক হোন
নিচের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন—
- বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন কথা
- দ্রুত হৃদস্পন্দন
- অতিরিক্ত ঘাম বা হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া
- বমি বা বমিভাব
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- তীব্র দুর্বলতা
- শ্বাসকষ্ট
চিকিৎসকদের মতে, হিটস্ট্রোক কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই গরমকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
শুধু ঠান্ডা নয়, দরকার সচেতনতাও
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছরই তাপপ্রবাহ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীর ঠান্ডা রাখার ছোট ছোট অভ্যাসও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মনে রাখতে হবে, ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে রাখা কোনও ম্যাজিক সমাধান নয়। সবচেয়ে জরুরি হল— পরিমিত জল পান, দীর্ঘক্ষণ রোদ এড়ানো, শরীরের সতর্ক সংকেত বুঝতে শেখা এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
