বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা বা চলাফেরায় অস্বস্তি অনেকের কাছেই পরিচিত সমস্যা। আর তখনই শোনা যায় দুটি নাম- অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থারাইটিস। নাম শুনতে কাছাকাছি হলেও চিকিৎসকদের মতে, এই দুই রোগ একেবারেই আলাদা। একটিতে দুর্বল হয় হাড়, অন্যটিতে ক্ষয়ে যায় জয়েন্ট বা সন্ধিস্থলের সুরক্ষাকারী কার্টিলেজ।
সমস্যা হল, অনেকেই এই পার্থক্য বোঝেন না। ফলে সময়মতো পরীক্ষা বা চিকিৎসা শুরু হয় না। অথচ দ্রুত সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা ভবিষ্যতের বড় জটিলতা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
অস্টিওপোরোসিস: নিঃশব্দে দুর্বল করে হাড়কে
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমতে থাকে। বাইরে থেকে তেমন কোনও লক্ষণ না থাকায় একে অনেক সময় 'সাইলেন্ট ডিজিজ' বলা হয়। অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেন হঠাৎ হাড় ভেঙে যাওয়া বা ফ্র্যাকচারের পর। এই রোগে হাড় এতটাই ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে যে সামান্য পড়ে যাওয়া, হোঁচট খাওয়া বা হালকা ধাক্কাতেও ফ্র্যাকচার হতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
- বারবার হাড় ভাঙা
- উচ্চতা কমে যাওয়া
- পিঠে বা মেরুদণ্ডে ব্যথা
- শরীর ঝুঁকে যাওয়া
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- মেনোপজের পর নারীরা
- প্রবীণ মানুষ
- ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-র ঘাটতি
- ধূমপান বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল
- দীর্ঘদিন শরীরচর্চার অভাব
ছবি: সংগৃহীত
অস্টিওআর্থারাইটিস: ক্ষয়ে যায় জয়েন্টের সুরক্ষা
অস্টিওআর্থারাইটিস মূলত জয়েন্টের অসুখ। আমাদের হাঁটু, কোমর বা হাতের জয়েন্টে থাকা কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। ফলে হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ বাড়ে এবং শুরু হয় ব্যথা, ফোলা ও শক্তভাব। এই সমস্যা সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়ে এবং সময়ের সঙ্গে চলাফেরা কঠিন করে তোলে।
সাধারণ লক্ষণ
- হাঁটু বা কোমরে ব্যথা
- সকালে জয়েন্টে শক্ত ভাব বা স্টিফনেস
- হাঁটাচলায় অস্বস্তি
- জয়েন্ট ফুলে যাওয়া
- নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
যেসব কারণে ঝুঁকি বাড়ে
- বয়স বৃদ্ধি
- অতিরিক্ত ওজন
- পুরনো জয়েন্ট ইনজুরি
- পারিবারিক ইতিহাস
একসঙ্গে দুই রোগও হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক বয়স্ক মানুষের শরীরে একই সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থারাইটিস দেখা যায়। যেমন, আর্থারাইটিসের ব্যথার কারণে কেউ কম হাঁটাচলা করলে হাড় আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই দুই সমস্যা একসঙ্গে থাকলে ভারসাম্য হারানো, পড়ে যাওয়া, হাড় ভাঙা ও স্বাভাবিক চলাফেরায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।
কীভাবে ধরা পড়ে এই রোগ?
অস্টিওপোরোসিস
বোন ডেনসিটি বা ডেক্সা স্ক্যানের মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব মাপা হয়।
অস্টিওআর্থারাইটিস
- শারীরিক পরীক্ষা
- এক্স-রে
- প্রয়োজন হলে এমআরআই
- জয়েন্টের নড়াচড়া ও ব্যথার মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
জীবনযাত্রার ছোট বদলই বড় সুরক্ষা
চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এই দুই রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। যা মেনে চলা জরুরি-
- নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম
- স্ট্রেন্থ ট্রেনিং
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
- পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলা
- ব্যায়াম হাড়কে শক্ত রাখার পাশাপাশি জয়েন্টের নমনীয়তা ও পেশির কার্যক্ষমতাও বাড়ায়।
কেন এই পার্থক্য জানা এত গুরুত্বপূর্ণ?
অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থারাইটিস- দুটোই বয়সের সঙ্গে বাড়লেও এদের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা এক নয়। তাই শুধু হাড়ের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেলে বিপদ বাড়তে পারে। সময়মতো পরীক্ষা, সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই ভবিষ্যতে ফ্র্যাকচার, চলাফেরার সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে বড় উপায়।
