হার্নিয়া হলে অপারেশন নাকি ওষুধ, কী করবেন? বেশিদিন ফেলে রাখলে কেন ঝুঁকি বেশি? বর্তমানে হার্নিয়া নিয়ে ভয় নেই, শুধু দরকার সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিস্তারিত জানালেন পিয়ারলেস হাসপাতালের সিনিয়র জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. অভিষেক গুহঠাকুরতা।
কথায় কথায় শোনা যার হার্নিয়ার (Hernia) কথা আমজনতার খুব চেনা অসুখ। কিন্তু তাতে কী, যার হয় দেখা যায় সচেতনতার অভাবে অসুখ নিয়েই রোগী দীঘদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাতে সমস্যা বাড়ছে। গ্রোইন বা কুঁচকিতে হার্নিয়া মানেই তা অপারেশন। তবে এইটুকু জেনে বসে থাকলেই হবে না। জানা দরকার বর্তমানে কী উন্নত চিকিৎসা রয়েছে।
ঠিক কী হয়?
গ্রোইন হার্নিয়া হয় কুঁচকি অঞ্চলে, যেখানে পেটের ভেতরের কোনও অশে (যেমন অম্ল বা চর্বি) পেটের পেশির দুর্বল স্থান দিয়ে বেরিয়ে এলে ত্বকের নিচে ফোলা বা পিন্ডের মতো তৈরি করে, যা সাধারণত পেট ও উরুরা সংযোগস্থলে দেখা যায়। এটি পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং কাশি, ভারী জিনিস তোলা বা ঝুঁকে পড়লে ব্যথা হতে পারে।
হার্নিয়া বলতে শরীরের কোনও অঙ্গ বা তার অংশ যে গহ্বরে থাকার কথা, সেখানকার দেয়াল ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসাকে বোঝায়। মানবদেহে হার্নিয়ার ১৯ শতাংশেরও বেশি দেখা যায় পেটের সামনের দেয়ালে। এর মধ্যে গ্রোইন হার্নিয়া অর্থাৎ কুঁচকির হার্নিয়া সব চেয়ে বেশি দেখা যায়। গ্রোইন হার্নিয়ার মধ্যেও ইনগুইনাল হার্নিয়া সবচেয়ে সাধারণ, তার পরেই রয়েছে ফিমোরাল হার্নিয়া।
হার্নিয়া চিনে নেওয়া খুবই জরুরি, কারণ যে কোনও সময় এটি প্রাণঘাতী অস্ত্রোপচারজনিত জরুরি অবস্থায় পরিণত হতে পারে।
কীভাবে চিনবেন গ্রোইন হার্নিয়া?
গ্রোইন হার্নিয়ার প্রধান লক্ষণ হল কুঁচকির এক পাশে বা দুপাশে একটি স্থায়ী ফোলা ভাব। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এটি অনেক বেশি দেখা যায়।
১) এই ফোলা অংশটি-দাঁড়ালে, হাঁটলে, কাশলে বা জোর দিলে আকারে বড় হয়।
২) শুয়ে পড়লে ছোট হয়ে যায় বা অনেক সময় মিলিয়েও যায়।
৩) শুরুতে ব্যথা নাও থাকতে পারে। কখনও শুধু হালকা টান ধরার মতো অস্বস্তি অনুভূত হয়।
কখন বিপদের আশঙ্কা?
শুয়ে পড়ার পরও যদি ফোলা না কমে, তা হলে সেটিকে অরিডিউসিবল হার্নিয়া বলা হয়। আর যদি এর সঙ্গে-পেটের তীব্র মোচড়ানো ব্যথা, পেট ফাঁপা, বমি বা বমি বমি ভাব, পায়খানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপসর্গ থাকে তবে সাবধান। এই উপসর্গগুলি দেখা যায়, তা হলে বুঝতে হবে অন্ত্র আটকে গেছে। এটি একটি জরুরি অস্ত্রোপচারের অবস্থা। সময়মতো চিকিৎসা না হলে অন্ত্রে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে সেই আশ পচে যাওয়ার (স্ট্র্যাংগুলেশন) আশঙ্কা থাকে। তাই কুঁচকিতে এ ধরনের ফোলা চোখে পড়লেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে উন্নত ল্যাপারোস্কপি সার্জারি ও ওপেন সার্জারি অনেক নিরাপদ, তুলনামূলকভাবে সহজ, ব্যথা ও রক্তক্ষরণ কম, স্যধারণত ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যেই বড়ি ফেরা যায়, দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব। তাই ফেলে না রেখে অনারেশনের প্রয়োজন হলে করিয়ে নিন।
সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, ঠিকমতো অপারেশন হলে হার্নিয়া আবার হওয়ার সম্ভাবনা ১ শতাংশেরও কম। গ্রোইন হার্নিয়াকে অবহেলা করবেন না। সময় থাকতে অস্ত্রোপচার করালে বড় বিপদ এড়ানো যায়। একটু সচেতনতা আর সময়মতো চিকিৎসাই পারে প্রাণঘাতী জটিলতা থেকে রক্ষা করতে।
চিকিৎসা কী?
গ্রোইন হার্নিয়ার একমাত্র চিকিৎসা হল অস্ত্রোপচার। এই অস্ত্রোপচারে প্রথমে হার্নিয়ার ভিতরের অঙ্গগুলোকে আবার পেটের ভেতরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর যেখানে ফাঁক তৈরি হয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ জাল (মেশ) বসিয়ে দেওয়া হয়। দেখতে অনেকটা মশারির মতো। এই মেশ পেটের দেয়ালকে শক্ত করে দেয়, যাতে ভবিষ্যতে আবার হার্নিয়া না হয়। আগে এই অপারেশন শুধুমাত্র খোলা পদ্ধতিতে (৫৬ সেন্টিমিটার কাটা দিয়ে) করা হয়। এখন আধুনিক চিকিৎসয় এটি ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতেও করা হচ্ছে। খোলা না ল্যাপারোস্কোপিক-কোনটা ভালো? দুটো পদ্ধতিরই আলাদা আলাদা সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনও একটি পদ্ধতিকে অন্যটির থেকে খারাপ বলা যায় না। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, হার্নিয়ার ধরন- সব কিছু বিচার করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করেই উপযুক্ত পদ্ধতি ঠিক করা উচিত।
