দিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ আর অগণিত চিন্তার ভিড়ে রাতের ঘুমই হয়ে ওঠে শরীরের নীরব চিকিৎসক। চোখ বন্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শরীরে শুরু করে নিজেকে মেরামত করতে, মস্তিষ্ক গুছিয়ে নেয় দিনের স্মৃতি, আর মন ফিরে পায় নতুন সকালের শক্তি।
আজ বিশ্ব ঘুম দিবস। ঘুমের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাই দিনটির মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততাতা, দেরি করে ঘুমানো, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম- এসব কারণে ধীরে ধীরে কমছে ঘুমের সময় ও মান। অথচ ভালো ঘুম শুধু আরাম নয়, সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করে এবং হার্টের জন্যও উপকারী।
ছবি: সংগৃহীত
আর এদিকে বিশ্ব ঘুম দিবসে ওঠে এল ঘুমহীন ভারতের ছবি। প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে 'ঘুমের তীব্র সংকট'। দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কই অনিদ্রা বা নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ কর্মজীবী মানুষদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি।
আজকের দিনে অনেকেই রাত জেগে কাজ বা মোবাইল ব্যবহারকে অভ্যেসে পরিণত করেছেন। কিন্তু শরীরের নিজস্ব একটি ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ঘুম ও ঘুম ভাঙার সময় নির্ধারিত হয়। যখন আমরা সেই ছন্দ ভেঙে ফেলি, তখনই ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।
বিশ্ব ঘুম দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক সহজ সত্য- স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য ঘুমকে অবহেলা করা যাবে না। সময়মতো শুতে যাওয়া, পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো এবং ঘুমের পরিবেশকে শান্ত রাখা, এই ছোট ছোট অভ্যেসই এনে দিতে পারে বড় পরিবর্তন।
ঘুম নেই। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব পড়ে শরীর ও মনের উপর। বাড়তে পারে—
- উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা
- উচ্চ রক্তচাপ
- মেটাবলিক সমস্যা
- হৃদরোগের ঝুঁকি
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের অনিদ্রা মস্তিষ্কের ক্ষয় দ্রুত করতে পারে, এমনকি ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। কারণ গভীর ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক নিজেকে 'ক্লিন' করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করে।
ঘুমের ঘাটতির প্রভাব শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়, অর্থনীতিতেও পড়ে তার প্রভাব। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ৬৮০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ।
নিয়মিত শরীরচর্চা সাহায্য় করে ভালো ঘুমে। ছবি: সংগৃহীত
খুব সাধারণ কিছু অভ্যেসই চোখে আসবে ঘুম-
- রাতে হালকা খাবার খাওয়া
- নিয়মিত শরীরচর্চা
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমতে যাওয়া ও ওঠা
- চাইলে ঘুমের আগে স্লিপ মিউজিক শুনতে পারেন
- সকালে রোদে কিছুটা সময় কাটান
- যতটা সম্ভব প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলা
- সন্ধের পর চা বা কফি থেকে দূরে থাকুন
এই সামান্য় কটা অভ্য়েসই পারে স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দকে ফিরিয়ে আনতে।
রাতের নীরবতায় যদি ঘুম হারিয়ে যায়, তবে শরীর-মন দুই-ই তার মূল্য চোকায়। তাই বিশেষজ্ঞদের কথায়, ঘুমকে অবহেলা নয়। ভালো ঘুম মানেই সুস্থ জীবন।
