মদের গ্লাসে ঠোঁট না ছুঁয়েও লিভারে জমছে চর্বি! সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই এক উদ্বেগজনক ছবি। কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ভুগছেন নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারে (Fatty Liver)। অর্থাৎ অ্যালকোহল নয়, জীবনযাপনই হয়ে উঠছে লিভারের অসুখের বড় কারণ।
২৭টি শহরের ৭ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, মোট অংশগ্রহণকারীদের ৩৮.৯ শতাংশের লিভারে জমেছে ফ্যাট। পুরুষদের মধ্যে হার প্রায় ৪৬ শতাংশ, মহিলাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ। আরও চিন্তার বিষয়, যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে, তাঁদের ৬.৩ শতাংশের লিভারে ইতিমধ্যেই ফাইব্রোসিসের লক্ষণ মিলেছে। গোটা নমুনায় ফাইব্রোসিসের হার ১.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ফ্যাটি লিভার থাকলে জটিলতার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়ে।
ফাইব্রোসিস কেন ভয়ংকর?
দীর্ঘদিন লিভারে প্রদাহ বা ক্ষতি চলতে থাকলে সেখানে টিস্যু শক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থাই ফাইব্রোসিস। শুরুতে তেমন উপসর্গ থাকে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা সিরোসিস, লিভার ফেলিওর বা লিভার ক্য়ানসারের দিকে গড়াতে পারে। সমস্যা হল, অনেকেই বুঝতেই পারেন না ভেতরে ভেতরে ক্ষতি কতটা এগিয়েছে।
যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে, তাঁদের ৬.৩ শতাংশের লিভারে ইতিমধ্যেই ফাইব্রোসিসের লক্ষণ মিলেছে। গোটা নমুনায় ফাইব্রোসিসের হার ১.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ফ্যাটি লিভার থাকলে জটিলতার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়ে।
ডায়াবেটিস, স্থূলতা আর লিভারের যোগসূত্র
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে তাঁদের গড় HbA1c ৬.২, আর যাঁদের নেই তাঁদের ৫.৭। অর্থাৎ, রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে ঝুঁকিও বেশি। অন্য়দিকে, প্রায় ৯৩.৭ শতাংশ ফ্যাটি লিভার রোগী ওভারওয়েট বা স্থূলকায়। পেটের মেদ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, শারীরিক পরিশ্রমে অনীহা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য মিলেই তৈরি করছে ঝুঁকি। ফাইব্রোসিসের ক্ষেত্রেও একই ছবি। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ফাইব্রোসিসের হার ৯.১ শতাংশ, আর স্থূলকায়দের মধ্যে ৮.১ শতাংশ।
কোন শহরে কত?
ফ্যাটি লিভারের হার সবচেয়ে বেশি ভোপাল ও রুরকিতে, প্রায় ৫০ শতাংশ। তিরুবনন্তপুরমে তুলনামূলক কম, ২৭ শতাংশ। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, পুনে, হায়দরাবাদ, চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলিতে হার ৩৭ থেকে ৪২ শতাংশের মধ্যে। ফাইব্রোসিসের হার সবচেয়ে বেশি জোরহাটে, ৮.৩ শতাংশ। দিল্লি ও জম্মুতেও তুলনামূলক বেশি। খাদ্যাভ্যাস, জিনগত প্রবণতা এবং পরিবেশগত কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মদের গ্লাসে চমুক না দিয়েও কেন লিভারের বারোটা?
এই সমীক্ষায় যাঁরা অংশ নিয়েছেন তাঁরা কেউই মদ্য়পান করেন না। ফলে স্পষ্ট, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ, কম নড়াচড়া, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস এবং বাড়তি ওজনই ফ্য়াটি লিভারের প্রধান চালিকা শক্তি। শহুরে জীবনযাপন যত অনিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, লিভারের অসুখের ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
তাহলে কী করণীয়?
সবার পক্ষে নিয়মিত ফাইব্রোস্ক্যান করানো সম্ভব নয়। তবে কিছু সহজ পদক্ষেপে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব—
- শরীরের ওজন কমাতে হবে ৭ থেকে ১০ শতাংশ
- সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট হাঁটা ও শরীরচর্চা
- চিনি, সফট ড্রিঙ্কস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা
- ডায়েটে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন ও ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবারদাবার
- জরুরি নিয়মিত সুগার ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার বেশিরভাগ সময়ই নীরবে বাড়তে থাকে। পেটে কোনও অস্বস্তি বা ব্যথা নেই মানেই আপনি নিরাপদ, তা নয়। সময়মতো সচেতন হলে এবং জীবনযাত্রা বদলালে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখনই নজর দিন লিভারের স্বাস্থ্য়ের দিকে।
