আমাদের দেশে লিভার বা যকৃতের অসুখ এখন আর শুধু প্রবীণদের সমস্যা নয়। বিশ্ব লিভার দিবস ২০২৬-এ উঠে আসা তথ্য বলছে, তরুণ প্রজন্ম এবং ছোট শহরগুলিতে দ্রুত বাড়ছে লিভারের রোগ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসার খরচও। ফলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক চাপও বাড়ছে পরিবারের উপর।
রোগ ও খরচ দুই ঊর্ধ্বমুখী
সাম্প্রতিক একাধিক সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, গত তিন বছরে লিভারের রোগের চিকিৎসার খরচ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ! শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়েনি, রোগের জটিলতাও বেড়েছে। চিকিৎসার খরচ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায়, লিভারের অসুখ এখন সবচেয়ে ব্যয়বহুল রোগগুলির মধ্যে একটি।
লিভারের অসুখের সবচেয়ে বড় কারণ। ছবি: সংগৃহীত
তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ঝুঁকি
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, কম বয়সিদের মধ্যে লিভারের রোগের প্রবণতা বাড়ছে। প্রতি বছর প্রায় ৫-১০% হারে এই সংখ্যা বাড়ছে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, শরীরচর্চার অভাব, অতিরিক্ত মদ্যপান- সব মিলিয়ে জীবনযাপনে পরিবর্তনই এর মূল কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেটাবলিক সমস্যা, যা লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ ফেলছে।
ছোট শহরে বাড়ছে প্রকোপ
আগে এই রোগ বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু এখন ছোট ছোট শহরেও দ্রুত বাড়ছে লিভারের অসুখ। সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসার সীমিত সুযোগের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ছে দেরিতে। ফলে রোগ জটিল হয়ে উঠছে এবং চিকিৎসার খরচও বাড়ছে।
লিভারকে সুস্থ রাখতে ডায়েটের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ছবি: সংগৃহীত
নারী-পুরুষের ব্যবধান কমছে
একসময় লিভারের রোগকে পুরুষদের সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই চিত্রও বদলাচ্ছে। মহিলাদের মধ্যেও এই রোগ দ্রুত বাড়ছে, প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে। এর পেছনে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, হরমোনাল ফ্যাক্টর এবং বাড়তে থাকা মেটাবলিক ঝুঁকি- সবকিছুই ভূমিকা রাখছে। ফলে লিভারের রোগ এখন আর কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
নীরব মহামারি
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এখন দেশে এক ধরনের 'নীরব মহামারি' হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রতি তিন জনে একজন কোনও না কোনওভাবে এই সমস্যায় আক্রান্ত। সবচেয়ে বড় বিপদ হল, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের প্রায় কোনও লক্ষণই থাকে না। শরীরের ভেতরে ক্ষতি চলতে থাকে, আর রোগ ধরা পড়ে তখনই, যখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠে।
শিশুদের মধ্যেও বাড়ছে রোগের ঝুঁকি
চিন্তার বিষয় এখানেই থেমে নেই। শিশুদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের প্রবণতা বাড়ছে, বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি বা মেটাবলিক সমস্যা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমনটা চলতে থাকলে আগামী দু-দশকে বিপুল সংখ্যক শিশু দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যাও ঝুঁকির মুখে।
সুস্থ লিভারের জন্য মাস্ট শরীরচর্চা। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসা যত দেরি, খরচ তত বেশি
লিভারের রোগের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। প্রথম দিকে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কিন্তু দেরি হলে চিকিৎসা হয়ে ওঠে জটিল। হাসপাতালে ভর্তি, দীর্ঘদিন ওষুধ, এমনকী লিভার প্রতিস্থাপন পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। এই জটিলতাই চিকিৎসার খরচকে আকাশছোঁয়া করে তুলছে।
এখনই সতর্ক হওয়ার সময়
বিশেষজ্ঞরা একটাই কথা বলছেন, প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ এবং ওজন ঠিক রাখা, এই কয়েকটি সহজ অভ্যেসই লিভারকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে পারে।
বিশ্ব লিভার দিবস ২০২৬ শুধু একটি দিন নয়, একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নীরব বিপদ। সময় থাকতে সচেতন হলে এই বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব, না হলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিতে পারে।
