বিজেপিতে এখন নবীন উচ্ছ্বাস। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে দলের সর্বভারতীয় সভাপতির আসনে বসে গিয়েছেন নীতীন নবীন। বিজেপি বলছে, দলের যে কোনও সাধারণ কর্মকর্তাও যে একেবারে শীর্ষপদে বসতে পারে, এটা তারই উদাহরণ। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, "নীতীন নবীন সংগঠনের হৃদস্পন্দন জানেন। আগামী ১০ বছর দলের যে শৃঙ্খলার প্রয়োজন, সেটা ওঁর নেতৃত্বেই সুনিশ্চিত করবে দল।" অর্থাৎ এক-দু'বছর নয়, নীতীন নবীন যে আগামী এক দশক বিজেপির 'বস' হয়ে থাকতে চলেছেন, সেটাও একপ্রকার নিশ্চিত করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এমনিতে বিজেপি সভাপতিদের মেয়াদ হয় ৩ বছর। পরপর দু'বারের বেশি কাউকে সভাপতি করার দস্তুরও নেই। তাহলে এই নবীন নেতাকে কেন ১০ বছর সময় দিতে চাইছেন মোদি? আসলে এর নেপথ্যে বিরাট কৌশল কাজ করছে গেরুয়া শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের খোলনলচে বদলে দিতে চায় গেরুয়া শিবির। কারণ মোদি-শাহরা মনে করছেন, এখন যারা সরকার ও সংগঠনের শীর্ষপদে রয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগই বয়স্ক, যাঁদের কর্মক্ষমতা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু। এঁদের পরিবর্তে তারুণ্য তুলে আনতে না পারলে দল আগামী দিনে সমস্যায় পড়বে। শোনা যাচ্ছে, বিজেপি ঠিক করে নিয়েছে দলের অন্দরে একটা ঝাঁকুনি দরকার। সরকার ও সংগঠনে 'ট্রানজিশন' দরকার, সেটা করতে না পারলে কংগ্রেসের মতো নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে যেতে হবে। আগামী এক দশকে এই 'ট্রানজিশন' পর্ব সারবে বিজেপি। সেটারই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন নবীন।
বিজেপি ঠিক করে নিয়েছে দলের অন্দরে একটা ঝাঁকুনি দরকার। সরকার ও সংগঠনে 'ট্রানজিশন' দরকার, সেটা করতে না পারলে কংগ্রেসের মতো নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে যেতে হবে।
চমকপ্রদভাবে নবীনই বিজেপির প্রথম সভাপতি যার সঙ্গে সরাসরি আরএসএসের যোগ নেই। তাঁর বাবা বিজেপির বিধায়ক ছিলেন। তিনি নিজেও বিধায়ক ছিলেন। কিন্তু সরাসরি শাখায় গিয়ে আরএসএস তিনি কোনওকালে করেননি। আরও চমকপ্রদ হল নীতীন নবীন যে সভাপতি হতে পারেন, সেটা তাঁর নাম ঘোষণার আগে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের একটা বড় অংশও জানতেন না। বিশেষ করে প্রবীণ প্রজন্ম। বিজেপির অন্দরেই একটা অংশ মনে করছে, এই প্রথম কোনও বিজেপি সভাপতি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে 'রিপোর্ট' করবেন। সেটা অবশ্যই বেসরকারিভাবে। সহজ বাংলায় বলতে গেলে মোদি-শাহদের ইশারাতেই কাজ করবেন নবীন। সংগঠনে যে ট্রানজিশন বা ঝাঁকুনির কথা বলা হচ্ছে, সেটাও ওই শীর্ষ দুই নেতার ইশারাতেই হবে।
বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্ক। ফাইল ছবি।
প্রশ্ন হল কীসের ভিত্তিতে এই 'ট্রানজিশন'? এমনিতে বিজেপির অন্দরে অঘোষিতভাবে ৭৫ বছর বয়সকে 'অবসরে'র বা মার্গদর্শক মণ্ডলীতে যাওয়ার বয়স হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু নবীনের আমলে সেটা নাকি আরও কমানো হচ্ছে। কমবেশি ৬০ হলেই ধীরে ধীরে সিনিয়র নেতাদের মার্গদর্শকমণ্ডলীর টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হবে। অবশ্য এই বয়সটাই মূল শর্ত নয়। সেটা একটা মাপকাঠি মাত্র। আসল শর্ত হচ্ছে কর্মক্ষমতা। গেরুয়া শিবির ঠিক করে নিয়েছে কর্মক্ষমতাই মূল শর্ত। আরও একটা শর্ত অবশ্য আছে। সেটা হল মোদি-শাহদের প্রতি আনুগত্য। বিজেপি যে ৬০ বছরের মাপকাঠি ঠিক করেছে, তাতে বাদ পড়ে যেতে পারে বহু শীর্ষ নেতার নামই। রাজনাথ সিং, নির্মলা সীতারমণ, জেপি নাড্ডা, শিবরাজ সিং চৌহান, ধর্মেন্দ্র প্রধান, হরদীপ সিং পুরী, গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, অশ্বিনী বৈষ্ণব, অর্জুন রাম মেঘওয়াল সকলেরই বয়স ষাটের উপর। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যেও অনেকের বয়স ষাটের বেশি। তালিকায় ভুপেন্দ্র প্যাটেল, মোহন যাদব, বিষ্ণু দেব সাই, মানিক সরকাররা রয়েছেন।
তবে ষাট বয়স হলেই যে বাদের খাতায় চলে যেতে হবে, তেমন নয়। এক্ষেত্রে বিচার্য দুটি বিষয়। এক, কর্মক্ষমতা। কেন্দ্রীয় নেতারা আগামী ২০২৯ নির্বাচনে দলের কতটা কাজে লাগবেন। বা ২৯-এর পর নতুন মন্ত্রিসভায় আদৌ তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন কিনা। রাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা হবে, এই মুখ্যমন্ত্রীরা আগামী নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জায়গায় থাকবেন কিনা। সেগুলি বিচার করে দেখা হবে। বিজেপির নয়া নীতি হচ্ছে, বহু বছর ধরে কেউ দলের সেবা করেছেন মানেই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিতে হবে, তেমন কোনও অর্থ নেই। বরং যারা আগামী দিনে দলের জন্য পরিশ্রম করতে পারবেন তাঁদের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে বহু পুরনো নেতাই বাদ পড়তে পারেন। অবশ্য, নেতাদের এই ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেটা হল আনুগত্য। সেই আনুগত্যের অঙ্কে পাশ করে গেলে কর্মক্ষমতা গৌণও হয়ে যেতে পারে।
বিজেপি যে ৬০ বছরের মাপকাঠি ঠিক করেছে, তাতে বাদ পড়ে যেতে পারে বহু শীর্ষ নেতার নামই। রাজনাথ সিং, নির্মলা সীতারমণ, জেপি নাড্ডা, শিবরাজ সিং চৌহান, ধর্মেন্দ্র প্রধান, হরদীপ সিং পুরী, গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, অশ্বিনী বৈষ্ণব, অর্জুন রাম মেঘওয়াল সকলেরই বয়স ষাটের উপর।
এখন প্রশ্ন হল, ষাটই যদি ছাঁটাইয়ের মাপকাঠি হয়, তাহলে তো তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নামও থাকা উচিত। কিন্তু বিজেপি সূত্র বলছে, মোদি কোনওভাবেই এই তালিকায় পড়েন না। কারণ তাঁর মতো কর্মক্ষম নেতা বিজেপিতে আর নেই। তাঁর নেতৃত্বেই আজ দেশের সর্ববৃহৎ দল বিজেপি। তাঁর মুখকে সামনে সামনে রেখেই এত সাফল্য। ফলে তাঁকে ছাঁটাই করার প্রশ্নই নেই।
