অনার কিলিং, বর্ণবিদ্বেষ, জাত-পাতের কালো অধ্যায় পেরিয়ে অবশেষে নিজেকে জাতপাতমুক্ত গ্রাম হিসাবে ঘোষণা করল মহারাষ্ট্রের সৌন্দলা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এই ঘোষণা করা হয়। মনে করা হচ্ছে দেশের মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম জাত-পাত মুক্ত গ্রাম অহিল্যনগর জেলার সৌন্দলা। অথচ আজ থেকে ১২ বছর আগে এই জেলারই খড়দা গ্রামে জাত-জাতের জেরে সম্মানরক্ষায় ভয়ংকর খুনের ঘটনা।
৫ ফেব্রুয়ারি সৌন্দলা গ্রামে আয়োজিত হয় একটি বিশেষ গ্রামসভা। কিন্তু সভার কার্যক্রম শুরুর আগেই সরপঞ্চ শরদরাও আরগাদে জানান, প্রথমে রক্তদান শিবির হবে। তাতে দুশোরও বেশি গ্রামবাসী অংশগ্রহণ করেন। শিবির শেষে যখন সভার কাজ শুরু হবে, ঠিক তখনই আরগাদে একটি মোক্ষম ঘোষণা করেন। বলেন, ‘‘গ্রামবাসী, আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, আমাদের রক্তের রং সবুজ বা নীল নয়। লাল। সকলেরই তাই। যতই ভিন্ন ভিন্ন আমরা হই না কেন, মিশে গেলে একই রং হয়ে যায়। কোনও রং আর আলাদা করা যায় না।’’ আরগাদের সেই বক্তব্যই সেদিন মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল নতুন এক শুভ সূচনার। জাতপাতমুক্ত, বর্ণবৈষম্যমুক্ত গ্রাম হিসাবে সৌন্দলাকে ঘোষণার মাহেন্দ্রক্ষণের। তাই ঠিক তার পরে যখন আরগাদে সেই ঘোষণাই করলেন, গ্রামের কোনও মানুষ অবাক হননি। সেদিন এই প্রেক্ষিতে মারাঠি ভাষায় একটি বিশেষ খসড়া প্রস্তাবও পাস হয়েছিল। আর সর্বসম্মতিক্রমে তা মেনেও নিয়েছিলেন সমস্ত গ্রামবাসী। সেই সব গ্রামবাসী, যাঁদের মধ্যে কেউ সবর্ণ জাতির, কেউ বহুজন। আবার কেউ মুসলিম।
২০১৩ সালে সোনাই ‘ট্রিপল মার্ডার’, ২০১৪ সালের খারদা সম্মানরক্ষায় খুন ইত্যাদি। সেই সমস্ত রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে বর্তমানে এই গ্রাম নিজেকে জাতপাতমুক্ত হিসাবে দাবি করেছে।
দেশের সংবিধান এবং প্রস্তাবনার উল্লেখ করে সেদিন মারাঠি ভাষায় আরগাদে সৌন্দলা গ্রামের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘‘এখন থেকে গ্রামে কেউ কোনও ধরনের জাতপাত মানবেন না। এই ধরনের কোনও বৈষম্যে কেউ বিশ্বাস করবেন না। মনে রাখবেন, মানুষ হিসাবে যে পরিচয়, সেটাই একমাত্র পরিচয়। সেটাই সকলের ধর্ম। আপনারা এটাই মানবেন।’’
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, পশ্চিম মহারাষ্ট্রের অহিল্যনগর জেলাটির আগে নাম ছিল আহমেদনগর। এখানে জাত-পাতের বৈষম্য সংক্রান্ত অপরাধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। এই সংক্রান্ত বহু ঘটনা আগে এখানে হয়েছে। যেমন ২০১৩ সালে সোনাই ‘ট্রিপল মার্ডার’, ২০১৪ সালের খারদা সম্মানরক্ষায় খুন ইত্যাদি। সেই সমস্ত রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে বর্তমানে এই গ্রাম নিজেকে জাতপাতমুক্ত হিসাবে দাবি করেছে। তবে এর আগেও এই গ্রাম নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজকর্ম করেছে। যেমন বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে, বিধবা-বিবাহ বৈধ করা হয়েছে, গার্হস্থ্য হিংসায় পদক্ষেপ করার নিয়ম চালু হয়েছে। সেই মুকুটেই জুড়ল নতুন পালক। এবার জাতপাতমুক্ত হিসাবে দেশে পরিচিত হল মহারাষ্ট্রের এই গ্রাম।
