রসুলপুর নদীর এপাড়-ওপাড়ে তখন চাপা উত্তেজনা। জমি আন্দোলন নিয়ে তপ্ত আঁচে ফুটছে বাংলা। নন্দীগ্রাম ছাড়িয়ে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় গোটা পূর্ব মেদিনীপুরে। কোথাও প্রকট সেই প্রতিবাদ, কোথাও প্রচ্ছন্ন। আর তলে তলে পুলিশি 'সন্ত্রাস' রুখতে গোপন স্থানে অস্ত্র মজুত। এ জায়গার নাম কাঁথি উত্তর। শুনিয়া, কানাইদিঘি, ভাজাচাউলির মতো এলাকা তখন বোমা-বারুদের স্তূপের উপর। এলাকাবাসী ভীত, সন্ত্রস্ত্র। এর কয়েকবছর পরই অবশ্য রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক চিত্র। ৩৪ বছরের বাম আমলে অবসান ঘটে সরকারের ক্ষমতায় এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। কাঁথি উত্তরও সেই বদল প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু সত্যিই কি ভয়ের দিনগুলো পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পেরেছেন বাসিন্দারা? তৃণমূল সরকারের উন্নয়ন বনাম বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণের লড়াইয়ের ফায়দা তুলবে কোন দল? ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে আজকের হটস্পট পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র।
কাঁথি উত্তরের মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৬২ হাজার ৭৮৬ জন। পুরুষের অনুপাতে মহিলা ভোটার কম। মূলত হিন্দু অধ্যুষিত। ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় অবশ্য এই সংখ্যাটা কিছুটা অদলবদল হবে এসআইআরের কারণে। এই বিধানসভা কেন্দ্রের ৯৮ শতাংশ গ্রামীণ এলাকা। বাসিন্দাদের মূল সমস্যা অনেক কিছুই। তাঁদের অভিযোগ, বহু দাবি পূরণ হয়নি। সেই তালিকা দীর্ঘ - রসুলপুর ফেরিঘাট বেহাল, রসুলপুর-খেজুরির বোগা সেতু তৈরি না হওয়া, বাঁকিপুট সমুদ্র সৈকতের সংস্কারহীনতা, ঐতিহাসিক কপালকুণ্ডলা মন্দিরের সংস্কার না হওয়া।
কিন্তু এবারের লড়াই যে কঠিন, তা মানছেন বিদায়ী বিধায়ক নিজেই। সুমিতাদেবীর কথায়, ''জিতব তো বটেই, কিন্তু মার্জিন বাড়ানোটা বেশ কঠিন বলে বুঝতে পারছি।''
রসুলপুর নদীর একদিকে উত্তর কাঁথি বিধানসভার অন্তর্গত দেশপ্রাণ ব্লক আর অপরপাশে খেজুরির বোগা। দুই এলাকার মানুষের নদীপথে প্রতিনিয়ত যাতায়াত রয়েছে। দুই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, একটি সেতু তৈরির ভোট এলেই আশ্বাস জোটে। ভোট মিটলে সেতুর কথা সবাই ভুলে যায় বলে অভিযোগ। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকায়। এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসের 'কপালকুণ্ডলা' মন্দিরটি আজও ঝোপের আড়ালে। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তাকে 'হেরিটেজ' ঘোষণা করে সংস্কার করেছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আবার ঝোপের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে তা। ছাব্বিশের ভোটের পর নতুন সরকার কি এসব না পাওয়ার অবসান ঘটাবে? এই প্রশ্নের জবাব চেয়ে এবার ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন এখানকার বাসিন্দারা।
কাঁথি উত্তরের বিজেপি প্রার্থী সুমিতা সিনহা।
২০১১ সালে বাম জমানা পতনের সময় কাঁথি উত্তরেও হাওয়া বদল হয়। সিপিএমের হেভিওয়েট নেতা চক্রধর মেইকাপকে হারিয়ে বিধায়ক হন তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের নেত্রী বনশ্রী মাইতি। ২০১৬ সালেও তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। কিন্তু তা থমকে গেল ২০২১ সালে এসে। ঠিক তার আগের বছর শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে চলে যান বিজেপিতে। তাঁর সঙ্গে আরও অনেকেই দলবদল করেন। সেই তালিকায় ছিলেন সুমিতা সিনহা। ২০২১ সালে তাঁকে কাঁথি উত্তরের প্রার্থী করে পদ্মশিবির এবং প্রাক্তন সহকর্মী বনশ্রী মাইতির থেকে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি। ছাব্বিশেও পদ্মপ্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক সুমিতা সিনহা।
তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস ভুঁইঞা লড়াকু মানুষ। বাম আমলে কম অত্যাচার সহ্য করেননি। অভিযোগ, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে সিপিএম কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এখন অনেকটাই সুস্থ।
কিন্তু এবারের লড়াই যে কঠিন, তা মানছেন তিনি নিজেই। সুমিতাদেবীর কথায়, ''জিতব তো বটেই, কিন্তু মার্জিন বাড়ানোটা বেশ কঠিন বলে বুঝতে পারছি। প্রচারে অবশ্য ভালো সাড়া পাচ্ছি। কোথাও কোথাও গিয়ে দেখছি, একেবারে মেরুকরণ হয়ে গিয়েছে। 'মোদির গ্যারান্টি'র উপর ভরসা রেখে ভোট (West Bengal Assembly Election) দেবেন তাঁরা। শুনিয়া, ভাজাচাউলির মতো এলাকা, বাম আমলে রক্তাক্ত সন্ত্রাসে কাঁটা হয়ে থাকত। পরে তৃণমূল সরকার এলেও সেই সন্ত্রাসের পরিবেশ ঠিক হয়নি। এখন মানুষ আর এসব চায় না, তাঁরা শান্তি চায়। তার জন্যই সরকার বদল করে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনবে।'' কিন্তু বিজেপিই তো ৫ বছর এখানকার বিধায়ক ছিলেন? স্থানীয় ইস্যুগুলির সমাধান হয়নি তো! এর জবাবে সুমিতাদেবী বলছেন, ''আমিই গ্যারান্টি দিচ্ছি, আমি জিতে এসে রসুলপুর-খেজুরির বোগা সেতু তৈরিতে উদ্যোগ নেব। এটা তৈরি হয়ে গেলে কাঁথি উত্তর ও কাঁথি দক্ষিণের যোগাযোগ অতি সহজ হবে।''
কাঁথি উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস ভুঁইঞা।
কাঁথি উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের এবারের তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস ভুঁইঞা। তিনি লড়াকু মানুষ। বাম আমলে কম অত্যাচার সহ্য করেননি। অভিযোগ, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে সিপিএম কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এখন অনেকটাই সুস্থ। নতুন করে ফের সক্রিয় রাজনীতিতে নেমেছেন এবং কাঁথি উত্তরের গড় পুনরুদ্ধারে এহেন সংগ্রামী নেতাকে ভোট ময়দানে এগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। দেবাশিসবাবু প্রচারে বেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) উন্নয়নের কথা বলেই ভোট চাইছেন। তুলে ধরছেন বিজেপি জনপ্রতিনিধির ব্যর্থতার কথাও। আশ্বাস দিচ্ছেন, তৃণমূল জিতলে দ্রুত না হওয়া কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু কাঁটা একটাই। কাঁথি ৩ নং পঞ্চায়েত সমিতি সভাপতি বিকাশ বেজের ভাইরাল অডিও। তাতে পঞ্চায়েত সমিতির প্রধানের সঙ্গে অশালীন আচরণের অডিও ভাইরাল হওয়ায় মুখ পুড়েছে শাসক শিবিরের।
কাঁথি উত্তরের সিপিএম প্রার্থী সুতনু মাইতি।
এই কেন্দ্রে তৃণমূল-বিজেপি দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝে কিন্তু প্রচারে বেশ নজর কাড়ছেন সিপিএম প্রার্থী সুতনু মাইতি। তাঁর বক্তব্য, ''তৃণমূলের দুর্নীতি আর বিজেপির মন্দির-মসজিদের রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের বরাবরের লড়াই।'' বামেদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ওঠে, ভাজাচাউলিতে বাম আমলে এখানে তৃণমূলীদের গাছে বেঁধে প্রকাশ্যে খুন করা হত। এমনকী তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেসবের কী জবাব দেবেন? তাতে সিপিএম প্রার্থীর দাবি, বাম আমলে খুনোখুনি কিছু হয়নি। তৃণমূল আসার পর এখানে একজন আইসিডিএস কর্মী খুন হন। তৃণমূল আসার পরই এখানে সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়। সিপিএম আজও সেসবের বিরুদ্ধেই লড়াই করছে। এখন প্রশ্ন হল, বাজিমাত করবে কে? উন্নয়ন অস্ত্রে ভরসা রেখে তৃণমূলকে ফেরাবেন জনতা নাকি ধর্মীয় মেরুকরণের পালে হাওয়া দিয়ে আবারও বিজেপিই ফিরবে? উত্তর মিলবে ৪ মে।
