যে নবাব পরিবারের হাত ধরে ৩০০ বছর আগে বাংলা-বিহার-ওড়িশা সমৃদ্ধ হয়েছিল—আজ সেই মীরজাফরের বংশধররাই নিজেদের ‘ভারতের নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে লড়াই করছেন। বিধানসভা ভোটের মুখে মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের প্রায় শতাধিক সদস্যের নাম এসআইআর (SIR in West Bengal) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ‘মুছে’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা আদৌ আসন্ন নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) ভোট দিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে এখন সন্ধিহান নবাব পরিবারের সদস্যদের। এসআইআরের ‘শুনানি’র নোটিস পেয়ে নবাব বংশের সদস্যরা সব নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু শুনানির পরেও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম স্থায়ীভাবে তালিকা থেকে ‘বাতিল’ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশের সহায়তায় মসনদে বসেন মীরজাফর। তাঁর ১৫-তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা। যিনি মুর্শিদাবাদে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত। এখনও ‘কিল্লা নিজামত’ এলাকার ঘণ্টা ঘরের কাছে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ১৬-তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জাও বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন। ‘কিল্লা নিজামত’ চত্বরে নবাব পরিবারের বহু সদস্যর বাস। তাঁদের অনেকের নামও ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে ‘মুছে’ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশের সহায়তায় মসনদে বসেন মীরজাফর। তাঁর ১৫-তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা। যিনি মুর্শিদাবাদে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত। এখনও ‘কিল্লা নিজামত’ এলাকার ঘণ্টা ঘরের কাছে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি।
মীরজাফরের ১৬তম বংশধর মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম আলি মির্জা জানান, “আমার বাবা একসময় রাজ্য সরকারের অধীনে নবাবী এস্টেটে চাকরি করতেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা ও আমার নাম ছিল। ভোটও দিয়েছিলাম। এবার এসআইআর প্রক্রিয়ায় লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ নম্বর বুথে যেখানে নবাবী পরিবারের সদস্যরা ভোট দেন। সেখানে প্রায় ৮৫০ জনের মধ্যে ২৮৬ জনের নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের বেশিরভাগই নবাব পরিবারের।” বাদ পড়া ভোটারদেরদের মধ্যে ফাহিম, তাঁর বাবা, স্ত্রী, জ্যাঠা মহম্মদ আব্বাস আলী মির্জার দুই মেয়ে ও বড় ছেলে রয়েছেন।
দুশ্চিন্তায় পরিবারের সদস্যরা। নিজস্ব চিত্র
ফাহিম বলেন, “মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্যান্য নবাবী স্থাপত্য সব আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হল। আমরা নবাব মীরজাফরের বংশধর। সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতীয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ তিনদিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেষে আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপে খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। জ্যাঠা আব্বাস আলী মির্জা নবাবী অধিকার ফিরে পেতে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে নবাবের বংশধর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মামলা চালানোর অধিকারও দিয়েছিল।
ফাহিম প্রশ্ন তোলেন, “এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে যে আমরা ভারতের নাগরিক?” ফাহিম আরও বলেন, “২০০২-এর তালিকায় বাবার নাম ছিল ‘মহম্মদ রেজা আলী মির্জা’ (সৈয়দ ছিল না), আমার নাম ছিল ‘সৈয়দ ফাহিম মির্জা’ (মহম্মদ ছিল না)। কমিশনের নিয়ম মেনে পরে দু’জনই নাম সংশোধন করি। যদিও এবার এসআইআরে আমাদের নাম প্রথমে ‘বিবেচনাধীন’ ছিল। শুনানির নোটিস পেয়ে নির্বাচন কমিশনকে সম্মান জানিয়ে অসুস্থ শরীরে আমার ৮২ বছর বয়সী বাবা নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে সব নথি জমা দেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হল না। একনসময় নবাবি দরবারে আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রজাদের বিচার করতেন। কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশন আমাদের পরিবারের ‘বিচার’ করে স্থায়ীভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দিল।” তার প্রশ্ন, “মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের সদস্যরা কি এখন আর ভারতের নাগরিক? এর জবাব দিক জাতীয় নির্বাচন কমিশন।”
ছোটে নবাবের মহল। নিজস্ব চিত্র
তিনি জানান, “নাম বাদ গেলে ট্রাইবুনালে আবেদনের পথ আছে, আমরা সেখানে আবেদন করব। কিন্তু শুনানি হতে এত সময় লাগবে যে ততদিনে বিধানসভা ভোট পেরিয়ে যাবে—পরিবারের কেউই এবছর ভোট দিতে পারবেন না।” এপ্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক প্রার্থী গৌরিশঙ্কর ঘোষ বলেন, “আমাদের দল বা নির্বাচন কমিশন কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিতে বলেনি। যদি কারও নাম কোনও কারণে বাদ গিয়ে থাকে তাঁরা ‘ফর্ম ৬’ পূরণ করে নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে পারবেন।” যদিও নবাব মীরজাফরের বংশধরেদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে মুর্শিদাবাদে।
