বিয়েবাড়িতে গেলে কী কী রাখেন সঙ্গে? টাকাপয়সা, জরুরি টুকিটাকি, বর্ষাকালে ছাতাও থাকে হয়তো। কিন্তু খাবার সঙ্গে নিয়ে অতিথিরা বিয়েবাড়ি চলেছেন, এমন ঘটনা শুনেছেন কখনও? গল্প নয়, ভারতের এক বিশেষ গ্রামের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এ নেহাতই বাস্তব। কিন্তু কেন? কী কারণে জন্ম এমন আজব নিয়মের?
বিহারের (Bihar) ছিলিম গ্রাম, মতান্তরে চিলম (chilam bihar)। যুগের পর যুগ ধরে সেখানকার মানুষ শুদ্ধ শাকাহারি। অর্থাৎ, কোনও রকম আমিষ খাবার গ্রহণ করেন না তারা। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে অ্যালকোহলেও। রোজের খাবারের মধ্যে প্রাধান্য পায় রুটি, ছাতু, শাকসবজি। এমনকী, বাঙালিদের মতোই, পিঁয়াজ-রসুনকেও আমিষের তালিকাতেই ধরেন তাঁরা। মাছ-মাংস যে কেবল খাওয়া যাবে না তা-ই নয়, সামান্য এক মুরগির পালকের ছোঁয়া লাগলেও স্নান সেরে, দেবতাদের উদ্দেশে ক্ষমা চেয়ে শুদ্ধ হতে হবে— মনে করেন চিলমবাসী।
গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, সাবধানের মার নেই! তাই বিয়েবাড়ি যাওয়ার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যান ছাতু আর জল! তা যদি একান্ত সম্ভব না হয়, তবে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে খালি পেটেই ফিরতি পথ ধরেন তাঁরা!
স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, গ্রামটির বয়স আনুমানিক ৫০০ বছর। বহুকাল আগে নাকি কোনও কোল-ভীল শাসকের কেল্লা ছিল সেখানে। বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় কেল্লার ধ্বংসাবশেষ। ধর্মগুরু মা গায়ত্রী ও জয় গুরুদেবের দীক্ষায় দিক্ষিত বেশিরভাগ গ্রামবাসী। চোদ্দটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের বাস এই গ্রামে, কিন্তু নিরামিষ ভোজনের ক্ষেত্রে সকলেই একমত। কোনও পরিবার যদি গোপনে আমিষ রান্না করে, তবে তা জানাজানি হলে গ্রামবাসীদের কাছে ‘একঘরে’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিপদে আপদেও কোনও গ্রামবাসী আর এসে দাঁড়াবে না সেই পরিবারের পাশে।
মনে করা হয়, দেশের সবথেকে বড় নিরামিষভোজী অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম চিলম। গ্রামের কোনও বাড়ির ছেলে অথবা মেয়ের বিবাহ যদি স্থির হয় অন্য কোনও গ্রামের বাসিন্দার সঙ্গে, তবে চিন্তায় পড়েন চিলমবাসী। যাওয়ার আগেই অনুষ্ঠানবাড়িতে পইপই করে জানানো হয়, অতিথিদের যে খাবার দেওয়া হবে, তাতে কোনও আমিষের ছোঁয়াটুকুও না থাকে! কিন্তু যে বাসনে খাবার পরিবেশন করা হবে, তাতে যে আগে কখনওই মাছ-মাংস-ডিম রাখা হয়নি, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে কী করে?
গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, সাবধানের মার নেই! তাই বিয়েবাড়ি যাওয়ার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যান ছাতু আর জল! তা যদি একান্ত সম্ভব না হয়, তবে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে খালি পেটেই ফিরতি পথ ধরেন তাঁরা!
তবে বিশ্বায়নের অনুপ্রবেশ আটকাতে পারেনি চিলম। ইদানীংকালে পরম্পরা ভেঙে, গ্রামের যুবাদের একাংশ পিঁয়াজ-রসুন ব্যবহার করছে রান্নায়। গ্রামের প্রবীণরা ভরসা রেখেছেন, পিঁয়াজ-রসুন ছুঁলেও মাংস অথবা মদের থেকে দূরত্বেই রয়েছে তারা। তবে আগামীদিনের বিশ্বায়ন যে সে বিশ্বাস ভাঙবে না, জোর দিয়ে তা বলা চলে কি?
