টাকার ভূমিকা জীবনের যে কোনও পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার প্রকৃতির ফারাক হয় বয়সভেদে। অবসরজীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন যাঁরা, কিংবা যাঁরা ইতিমধ্যেই প্রবেশ করেছেন এই সোনালী সময়ে, তাঁরা কী করে সদ্ব্যবহার করবেন অর্থের। তাঁদের জন্য নিজের উদাহরণ তুলে ধরলেন স্বাগতা ঘোষ
চিরকালই জেনেছি, টাকাপয়সা নিয়ে খুব সাবধান থাকতে হয়। হঠাৎ কারণ-ছাড়া বিপুল খরচ অথবা অযথা কৃপণতা, দুই-ই এড়িয়ে চলতে হয়। নিজের ও পরিবারের জন্য যেটুকু না করলে নয়, তা করেও যদি সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করি, তাতে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তার দামই আলাদা। আমার টাকা জমানো আর খরচ করার বাইনারি এভাবেই তৈরি। নিজের প্রফেশনের বাইরে একটা জগত আছে, রিটায়ারমেন্টের পর তা আমার চোখে যে ভাবে ধরা পড়ছে সেখানও একই লজিক খাটবে। তবে রিটায়ার করে ‘লাইফ-স্টেজ’ যে বদলে যায়, অন্য ধরনের ডাইনামিক যে কাজ করতে শুরু করে, তা আমার অ্যাডভাইসর পরিস্কার ভাবে বুঝিয়ে বলেছেন। সিস্টেম্যাটিক উইথড্রয়াল প্ল্যান বা এসডব্লিউপি এখন আমার হাতে থাকা প্রধান অস্ত্রগুলোর একটা।
অবসর নিয়েছেন কি নেননি, রিটায়ারমেন্ট সংক্রান্ত মিথ ভাঙার যে সময় এসেছে তা স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই। দুটো মিথের কথা জানাই। এক, সক্রিয় ভাবে আর অফিস-কাছারি অ্যাটেন্ড না করলেও (তারপর জীবনটা ধীর গতিতে চলবেই, এমন ভাবার কারণ নেই) টাকাপয়সার ভাবনা পুরোদস্তুর টিকে থাকতে পারে। বরং অবসরের পরে আরও সচেতন হয়েছেন মানুষ, এমনও দেখছি। দুই, এতদিন ধরে যা গড়ে তোলা হয়েছে, সেই সঞ্চয় এখন থেকে বাকি জীবনের পুরোটায় নিয়মিত আয় দেবেই, তেমন গ্যারান্টি নেই।
এই যে দ্বিতীয় বিষয়টা নিয়ে বললাম, তা আর একবার পড়ুন। কড়া বাস্তব, তাই না? এটাই অনেক অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পরিকল্পনার কেন্দ্রে, বুঝতে পারি। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কত হারে আমি SWP মারফৎ টাকা তুলব, অর্থাৎ আমার উইথড্রয়াল রেট কত হওয়া উচিত?
আমার রিয়েলিটি চেক-
চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি আজকের পৃথিবীতে নানা চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এমন সময় চলছে যখন ইক্যুইটির বাজারের উপর যথেষ্ট চাপ, নতুন ইনভেস্টমেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানুষ দু'বার ভাবছেন। গত তিন-চার কোয়ার্টারে আমি আমার বিনিয়োগের ধরনে কিছু বদল এনেছি। আমার ভাবনাগুলো সংক্ষেপে লিখছি।
- আগে ইক্যুইটির দিকে আমার ঝোঁকটা কিছু বেশি ছিল, তাতে সুবিধা পেয়েছি।
- কিন্তু ইদানিং আমি একটু ভারসাম্য বা ব্যালেন্স আনার চেষ্টা করেছি। আমার পোর্টফোলিওর একটা মোটা অংশ এখন বন্ড ফান্ডে রাখা।
- গ্রোথ কম আসবে বন্ডে, এ কথাটা বেশ বুঝি। অন্তত লং টার্মে ইক্যুইটির তুলনায়। তবে এর সঙ্গে যে ডেট মার্কেট আমাকে নিয়মিত ইনকাম দিতে পারে, তা অজানা নয়।
তার মানে– - ঋণপত্র বা ডেট সিকিউরিটিজ ধারাবাহিক উপার্জনের রাস্তা খুলতে পারে।
- এখানে নির্ভরযোগ্যতা এক বড় মাপকাঠি। ক্যাপিটাল মার্কেট যখন দুলছে, তখন এই বিনিয়োগ একটা বিশেষ স্থিরতা আনতে পারে। হ্যাঁ, তাতে আমার মানসিক স্বস্তি।
- ইক্যুইটি খুব ইতিবাচক একটা অ্যাসেট ক্লাস, সেখান থেকে আমি পুরোপুরি সরে আসিনি। বরং বাজার যখন যুদ্ধের কারণে পড়েছে, তখন আমি জেনেশুনে শর্ট টার্ম ডেট থেকে আংশিক ভাবে ইক্যুইটিতে সরে গেছি।
- বাজার উঠবে-নামবে, সেটাই স্বাভাবিক। অবসর নেওয়ার পরেও আমি ঝুঁকিকে একেবারে বাদ দিতে চাই না। একশো ভাগ ডেট আমার জন্য নয়। তাতে ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে যাবে।
- আর একটা কথা, এটাও না বললে নয়। সম্প্রতি আমি আমার পোর্টফোলিওতে সোনা যোগ করেছি। এটা মূলত করেছি ডাইভারসিফাই করার জন্য। সম্পদ গঠন সহজ নয়। সমস্ত কিছু একদিকে না রেখে টাকাপয়সা একটু ছড়িয়ে রাখা ভাল। এই ভাবনাটা থেকেই যাচ্ছে।
- তবে এখন আমার কৌশলটা সরল হয়ে যাবে। নিয়মিত একটা হারে কিছুটা টাকা তুলব, তাতে সাধারণ খরচ মেটানো যাবে। প্রতি মাসে বা কোয়ার্টারে একবার। কিন্তু বাজারের অবস্থার দিকে নজর রাখা ছাড়বো না। প্রয়োজনে স্ট্র্যাটেজিতে সামান্য পরিবর্তন করতে যদি হয়, করব।
- স্টক মার্কেট যদি নিচে থাকে, তখন চেষ্টা করব ইক্যুইটি থেকে কম তোলার। তখন ডেটের অংশ থেকে বেশি নেব। সব মিলিয়ে বলতে পারি যে অবসর জীবনে আমার ফিনান্সিয়াল অবজেকটিভ একটাই–টাকাপয়সার দিক থেকে স্বস্তিতে থাকা। কিন্তু একই সঙ্গে আমার সঞ্চয় যেন দীর্ঘদিন টিকে থাকে, এমনও হতে হবে। তাই একটু হিসেব কষা, একটু ধৈর্য ধরা, আর সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন–এই তিনটেকেই আমি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
(লেখিকা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা)
