shono
Advertisement
SIR

নথির গোলকধাঁধায়! এসআইআর কি গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি?

সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যে-ছবি উঠে আসছে, তা এই সাংবিধানিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাতের শামিল।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:57 PM Apr 10, 2026Updated: 07:58 PM Apr 10, 2026

বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া কি সত্যিই স্বচ্ছতা আনার জন্য, না কি নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে দেশের বৈধ নাগরিকদেরই রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন করার এক সূক্ষ্ম জাল? লিখছেন জাহির আব্বাস

Advertisement

সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যে-ছবি উঠে আসছে, তা এই সাংবিধানিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাতের শামিল। ‘Special Interactive Revision’ (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার নামে যেভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ (বিচারাধীন) রাখা হয়েছে, তা আধুনিক ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগের ঘটনা।

প্রশ্ন উঠছে, এই প্রক্রিয়া কি সত্যিই স্বচ্ছতা আনার জন্য, না কি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে দেশের বৈধ নাগরিকদেরই রাষ্ট্রহীন বা অধিকারহীন করার এক সূক্ষ্ম জাল?
ভারতের সংবিধান প্রতিটি যোগ্য নাগরিককে ভোটাধিকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, ‘মিসম্যাচ’ বা তথ্যের অসংগতি এবং গণহারে নাম বাদ যাওয়ার যে-চিত্র সামনে আসছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের মৌখিক আশ্বাসের বন্যা, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ– দুয়ের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ এখন দিশাহারা। গণতন্ত্রের উৎসবে কি তবে পদ্ধতিগত জটিলতার নামে এক বিশাল সংখ্যক যোগ্য নাগরিককে পরিকল্পিতভাবে ব্রাত্য করে রাখা হচ্ছে?

উত্তরহীন কিছু প্রশ্ন
যেমন– বাবার নাম তালিকায় থাকা সত্ত্বেও সন্তানদের নাম কেন ডিলিট হবে? মা-বাবার নাম গৃহীত হলে সন্তানদের কেন ট্রাইব্যুনালে যেতে হবে? যাদের কাছে ২০০২ সালের আগের পাসপোর্ট বা মাধ্যমিক সার্টিফিকেট আছে, তাদের নাম কোন যুক্তিতে বাদ পড়ে? যাকে হেয়ারিংয়ে ডাকাই হল না, তার নাম ডিলিট হয় কী করে? একই পরিবারের ৬ ভাইবোনের মধ্যে ২ জনের নাম তালিকায় আর বাকিদের নাম ডিলিট– এটা কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়? বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনের কারণে ঢালাওভাবে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া এবং ৮০-৯০ বছরের বৃদ্ধ, যারা সারা জীবন ভোট দিয়েছে, তাদের সামান্য বানান ভুলের জন্য নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা কতটা মানবিক? ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষ কেন ট্রাইব্যুনালের খরচ বইবে? সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের গরিব মানুষ কেন কলকাতায় এসে দিনের পর দিন পড়ে থাকবে? এই যাতায়াত ও আইনি লড়াইয়ের খরচ কে দেবে? এই অধিকার হরণের জবাব কোন কমিশন বা আধিকারিক দেবেন? সাধারণ মানুষকে কেন প্রশাসনিক ভুলের মাশুল গুনতে হবে? এই হাজারো প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি।

আশ্বাসের আড়ালে হয়রানি
শুরু থেকেই কমিশন এবং সর্বোচ্চ আদালত বারবার আশ্বস্ত করেছিল যে, একজন যোগ্য ভারতীয় নাগরিকও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে না। কিন্তু বাস্তব অন‌্য কথা বলছে। প্রথম ধাপে নথিপত্র সংক্রান্ত জটিলতা, তারপর ‘ম্যাথ ভোটার’ বা তথ্যের অসংগতির দোহাই দিয়ে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সামান্য নামের বানান ভুল, বা পদবিগত পার্থক্যের মতো লঘু কারণেও অনেককে ‘অযোগ্য’ হিস‌াবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকী একই পরিবারের রক্তসম্পর্কিত লিংকেজ থাকা সত্ত্বেও যান্ত্রিক ও অযৌক্তিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে তালিকা বহির্ভূত করা হয়েছে। খসড়া তালিকার পর শুনানি হলেও, সেখানে সঠিক নথিপত্র পেশ করার পরেও কেন বহু মানুষের নাম ‘ডিলিট’ তালিকায় রয়ে গেল, তার কোনও সদুত্তর কমিশনের কাছে নেই।

‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষ কেন ট্রাইব্যুনালের খরচ বইবে? সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের গরিব মানুষ কেন কলকাতায় এসে দিনের পর দিন পড়ে থাকবে?

দ্রুত বিচার না অবিচার?
আদালত যেখানে বলেছিল এই বিচার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে মাত্র একমাসের ব্যবধানে তড়িঘড়ি করে যেভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শেষ করা হল, তা নিয়ে জনমনে তীব্র সন্দেহ দানা বেঁধেছে। প্রশ্ন উঠছে, এত অল্প সময়ে কি আদৌ প্রতিটি নথির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব ছিল? না কি ডিজিটাল ডেটাবেসের যান্ত্রিক ত্রুটির বলি হল রক্তমাংসের নাগরিকরা? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় তথ্য আপলোড না করেই বা আধিকারিকদের খামখেয়ালিপনায় যোগ্য নাগরিকদের নাম মুছে ফেলা হয়েছে।

নথির গোলকধাঁধাঁ
অভিযোগ, পর্যাপ্ত নথি, এমনকী পাসপোর্ট বা সরকারি ১৩টি পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নামের সামান্য বানান ভুল বা যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে হাজার হাজার মানুষের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল, বর্তমান ডিজিটাল তালিকায় তাদের তথ্য রহস্যজনকভাবে বদলে গিয়েছে অথবা ‘নো ম্যাপিং’ ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ‘ফর্ম ৮’-এর মাধ্যমে নাম সংশোধনের সুযোগ দেয়, অথচ সেই সংশোধিত তথ্য কেন কমিশনের ডেটাবেসে প্রতিফলিত হচ্ছে না, তার কোনও সদুত্তর নেই। এমনকী, কমিশন দাবি করছে যে, নথির অভাবেই নাম বাদ যাচ্ছে। কিন্তু আরটিআই বা ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কোনও হিয়ারিং নোটিস ছাড়াই নাম ডিলিট করা হয়েছে যা ন্যাচারাল জাস্টিস বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। কোনও ব্যক্তির নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে দায়বদ্ধতার চেয়ে ‘টার্গেট’ পূরণের তাগিদই বেশি স্পষ্ট।

কালক্ষেপণ
বর্তমানে প্রায় ৬২-৬৩ লক্ষ ভোটার ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ পর্যায়ে রয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের আইনি লড়াইয়ের জন্য ‘ট্রাইবুনাল কোর্ট’ গঠনের কথা বলা হলেও, তার কার্যপদ্ধতি ও সময়সীমা নিয়ে প্রবল ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিচারকরা খোদ নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু কমিশন নিরুত্তর। এক-একজন জুডিশিয়াল অফিসারের কাঁধে পাঁচ-ছ’শো কেস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ে প্রতিটি নথির সূক্ষ্ম বিচার করা কি আদৌ সম্ভব? ফলে তড়িঘড়ি করে নাম বাদ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক, নিরক্ষর ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তারা আইনি মারপ্যাঁচ বোঝে না, কিন্তু জানে তারা এই মাটির সন্তান।

সুপ্রিম পর্যবেক্ষণ
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক কিছু পর্যবেক্ষণ। যখন নাগরিকরা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে– ‘এবার ভোট দিতে না পারার অর্থ এই নয় যে, ভোটাধিকার চলে গেল’– যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। যেখানে আদালতের উচিত ছিল, কমিশনের উপর কঠোর নির্দেশ জারি করা যে, যতক্ষণ না প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে ততক্ষণ চূড়ান্ত তালিকা নয়, সেখানে আদালতের এই শিথিল মনোভাব অনেককেই হতাশ করেছে। গণতন্ত্রে ‘আগে ভোটার, পরে ভোট’– এই নীতিই ধ্রুবতারা হওয়া উচিত।

তবে, পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ সত্য ফুটে উঠছে। দেখা যাচ্ছে, একটি বিশেষ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট প্রান্তিক গোষ্ঠীকে এই ‘ডিলিট’ প্রক্রিয়ায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কেন একই নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও একজন পার পেয়ে যাচ্ছেন আর অন্যজন বাদের তালিকায়? এই দ্বিমুখী আচরণের জবাবদিহি কে করবে? কমিশনের এই ‘সিলেকটিভ’ বা বাছাই করা প্রক্রিয়া কি তবে কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক অভিসন্ধির অংশ? নাগরিকরা মনে করছেন, বিচারবিভাগ যেখানে রক্ষাকর্তা হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

অস্তিত্ব সংকট
ভোট দিতে না-পারার অর্থ ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব হারানো বা এনআরসি তালিকায় নাম না ওঠার প্রথম ধাপ হিসাবে দেখা দিচ্ছে। এই ভীতি থেকেই ডিটেনশন ক্যাম্প বা অধিকার হরণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। সিভিল সোসাইটি ও নেতৃত্বের নীরবতা :এই চরম অবিচারের বিরুদ্ধে দেশের সুশিক্ষিত সমাজ, আইনজীবী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে মাত্রায় সরব হওয়া উচিত ছিল, তা দেখা যাচ্ছে না। আন্দোলন বা প্রতিবাদকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে দমন করার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে প্রায় ৬২-৬৩ লক্ষ ভোটার ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ পর্যায়ে রয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা।

কমিশনের নিয়মেই বলা আছে, যদি তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া সঠিক সময়ে সম্পন্ন না হয়, তবে পূর্ববর্তী চূড়ান্ত তালিকার ভিত্তিতেই ভোট নেওয়া উচিত। ব্যক্তিগতভাবে লড়াই না করে সমষ্টিগতভাবে পুনরায় সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে আবেদন জানানো, যেখানে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হবে যে শুনানি প্রক্রিয়ায় কী ধরনের পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল।

তথ্যের অধিকার
কেন নাম ডিলিট হল, এবং কোন কর্মকর্তার অধীনে সেই বিচার হল, তা জানতে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দিয়ে আরটিআই করানো প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চগুলোতে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা যে, নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে কতজন নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংস্থা ও সংগঠনকেও সোচ্চার হওয়া উচিত। মানুষের ক্ষোভ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়– এটি একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকটের প্রতিফলন। সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন যদি ‘যোগ্য একজনও বাদ যাবে না’ এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য চরম পরাজয়।

পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটার তালিকা বিভ্রাট কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। বিহারের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি বাংলায় হতে দেওয়া যায় না। সময় এসেছে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। আমাদের দাবি পরিষ্কার, একজনও বৈধ ভারতীয় ভোটার যেন তার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। কারণ, গণতন্ত্র মানুষের জন্য, মানুষ গণতন্ত্রের জন্য নয়।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
sjabbas.10@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement