shono
Advertisement
Home Loan

প্রথমবার হোম লোন নিচ্ছেন? জেনে নিন খুঁটিনাটি

গত দশ বছরে চিত্রটা একদম পাল্টে গিয়েছে। এখন বাড়ি কেনা আর বিলাসিতা না,অত্যাবশ্যকীয়। এমনকি যাঁদের ট্রান্সফারেবল চাকরি, তাঁরাও যেখানে থাকছেন, সেখানে বাড়ি ভাড়া নেন না কিনেই নেন।
Published By: Subhodeep MullickPosted: 01:23 PM May 04, 2026Updated: 01:23 PM May 04, 2026

গৃহ ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে অনেকেরই। অথচ ঠিক কীভাবে, কোন পথে এগোলে কাজটা সঠিক হবে আর অবাঞ্ছিত সমস্যাতেও পড়তে হবে না-সেই হদিশ জানা নেই সকলের। তাহলে উপায়? বিস্তারিত জানালেন সুমন্ত চক্রবর্তী

Advertisement

'অবসর নেওয়ার পর কোথায় থিতু হব!' আজ থেকে বছর কুড়ি আগেও, আমাদের বাবা কাকাদের এটাই ছিল চিন্তা। দু-তিন বছর আগে থেকেই সকাল-সন্ধ্যে জাবদা খাতা নিয়ে বসতেন হিসেব করতে যে, পাওনা গন্ডাটা কত হবে অবসরের পরে। আর ঠিক কতটা খরচ করা যাবে নিজের বাড়ি কেনার জনা। লোন না নিতে হলেই ভাল, লোন এমনিতে পাওয়াও যাবে না এই বয়সে এসে বা পেলেও নেওয়ার ঝোঁক খুবই কম!

গত দশ বছরে চিত্রটা একদম পাল্টে গিয়েছে। এখন বাড়ি কেনা আর বিলাসিতা না,অত্যাবশ্যকীয়। এমনকি যাঁদের ট্রান্সফারেবল চাকরি, তাঁরাও যেখানে থাকছেন, সেখানে বাড়ি ভাড়া নেন না কিনেই নেন। মুক্ত অর্থনীতি, ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি, জয়েন্ট ফ্যামিলি ভেঙে গিয়ে ফ্ল্যাট কালচারের (এমনকি টিয়ার-২, টিয়ার-৩ শহরেও) জন্ম হওয়া, লোনের সহজলভ্যতা, আরও অনেক কারণ আছে এই বিপ্লবের পেছনে।

এই জেনারেশন ভেবেছে খুব সহজ ভাবে চাকরির শুরুতেই যদি হোম লোন নিয়ে একটা নিজের বাড়ি কিনে নেওয়া যায়, সুবিধা অনেক। পুরো চাকরি-জীবন পড়ে আছে অন্বা অল্প করে লোন শোধ করে দেওয়ার জন্য। ভাড়া বাড়িতে থাকতে হচ্ছে না, এমনিতেই তো ভাড়ার টাকা লাগত, তার থেকে আর কিছু না হয় বেশি লাগল। নিজের বাড়ি তো হয়ে গেল, মানে assel cmation হল, যে অ্যাসেটের apprecia fion হয়, মানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাম বাড়তে। থাকে বিটায়ারমেন্টের সময় এসে দেখা যাবে বাড়ির আর কোনও লোন নেই, গচ্ছিত টাকার পুরোটাই অবসরকালীন জীবনযাপনের জন্য।

এই অব্দি কোনও অসুবিধা নেই একদম সঠিক ভাবনা। অসুবিধাটা তৈরি হয় অন্য জায়গায়, যেমন আপনার চাকরি-জীবনের শুরুর দিকের ক্রয়ক্ষমতা আর পরের দিকের ক্রয়ক্ষমতা এক না। পরের দিকে এসে মনে হয়, আরেকটু বড় বাড়ি কেনাই যায়। এই ভাবনা যাতে ভবিষ্যতে না হয়, তাই অনেকেই যেন-তেন-প্রকারেণ বর্তমান ক্ষমতার বাইরে গিয়ে, বেশি দামের বাড়ি কিনে ফেলেন নিয়ে প্রতি মাসের ইএমআইয়ের বোঝায় হাঁসফাস করতে থাকেন

আজ এক শ্রেণীর মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন বেড়েছে, আয় যেমন বেড়েছে, তার সাথে সাথে বেড়েছে কর্মক্ষেত্রের চাপ একটা সময়ের পরে অনেকেই সেই চাপ নিতে পারছেন না-থাকে বলে burnout, তাই হচ্ছে। কিন্তু ২৫ বছরের হোম লোন নেওয়া আছে, করার তো কিছু নেই। কখনও যদি চাকরি চলে যায়। এই আতঙ্কে ভুগছেন অনেকে, কম বয়সে তৈরী হচ্ছে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপের মত অসুখ।

আর একটা ব্যাপার হল ফ্ল্যাটের দাম যদি ঠিকঠাক না বাড়ে। ২০ বছর পরে ঐ পুরোনো বাড়ীতে আপনার হয়তো আর ভাল লাগছে না. কিন্তু এই বাড়ি বিক্রি করলে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে হয়তো নতুন বাড়ি হচ্ছেই না, inflation এতটা বেশি হয়ে গেছে। তখন আপনি যে সারাজীবন ধরে কষ্ট করে ইএমআই গুনলেন, পুরোটাই মনে হয় জলে গেল।

তাহলে উপায়? বাড়ি কিনব না? নিশ্চয়ই কিনবেন। ভাড়া বাড়িতে থেকে, প্রতি ১১ মাস ছাড়া লটবহর ঘাড়ে নিয়ে যাযাবরের মত। দৌড়নোটা খুবই কষ্টকর অভিজ্ঞতা। সাথে বাড়িওয়ালার সাথে খিটমিটের সম্ভবনার কথা তো বাদই দিলাম। শুধু প্রথম হোম লোনটা নেওয়ার সময় কিছু জিনিস মাথায় রাখবেন।

প্রথমত, চাকরি পেয়ে একটু আগে কিছুদিন থিতু হন। যতই লোন নিন, margin money আপনাকেই দিতে হবে। সেটার জন্য আরেকটা লোন যেন নিতে না হয়। আর বেশ কয়েকবছর চাকরি করার পরে স্যালারিটাও বাড়ে, তাই ভবিষ্যতে আপনার চাহিদা পূরণ হবে এ রকম একটা ঠিকঠাক বাড়ি কিনতে পারবেন

দ্বিতীয়ত, বাড়ি কেনার সময় একটু ভাল করে বাছবিচার করুন কোন জায়গায় কিনছেন, সেখানে সময়ের সাথে সাথে বাড়ির দাম বাড়ার সম্ভাবনা কতটা। মানে, নিশ্চিত হওয়া যে টাকাটা appreciating asset বুঝেই লগ্নি করছেন। হিসেব করে দেখে নিন, যে ইএমআই আপনি দেবেন বলে তৈরি হচ্ছেন, তার অর্ধেক টাকা (বাকি অর্ধেক রেন্ট লাগবে ধরে নিয়ে) যদি অত বছরের জন্য (হোম লোনের টেনর যত বছর) SIP করেন বা HD (রেকারিং ডিপোজিট) করেন, মেয়াদ শেষে কত টাকা পাচ্ছেন বনাম যে বাড়ি আপনি কিনতে যাচ্ছেন, তার তখন expected value কত হচ্ছে। এই expected value যেন বেশি হয় অনেকটাই। এটা বের করার একটা সহজ ফরমূলা রয়েছে।

এখনকার ভ্যালু x (1+r)xn.. যেখানে n হচ্ছে কত বছর আর হল Assumed Annual Growth Rate এবার বলবেন এই রেট কোথায় পাব? ঠিক, এটা একটু সমস্যার, কারণ ন্যাশনাল হাউসিং ব্যাঙ্ক রেসিডেক্স বা আরবিআইয়ের হাউসিং প্রাইস ইনডেক্স থেকে দেশের উল্লেখযোগ্য শহরের পুরনো ডেটা আপনি পাবেন। কিন্তু একই শহরের মধ্যেও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রেট হতে পারে-ওটা আপনাকে একটু 'লোকালি' খোঁজখবর নিতে হবে বা ওই শহরের রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞ রিসার্চ কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হবে। অথবা গুগল তো হাতেই আছে, বা আজকের এআই অ্যাপ। একটু সময় দিয়ে না হয় দেখলেন।

তৃতীয়ত, হোম লোনের টেনর যতটা সম্ভব কম রাখুন কম ইএমআই এর লোভে লোনের মেয়াদ বাড়াবেন না। যত বেশী দিনের মেয়াদ, তত বেশী সুদ আপনি গুনছেন এটা মাথায় রাখবেন। আর নিতান্তই যদি মেয়াদ কমানো সম্ভব না হয়, এককালীন টাকা হাতে এলে (যেমন, বোনাস পেলেন) তার একটা অংশ কিছুটা এককালীন হিসেবে লোন অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিন। জানবেন, হোম লোনের কোনও prepayment charge লাগে না।

চতুর্থত, ব্যাঙ্ক আপনাকে আপনার মাসিক নেট আয়ের প্রায় ৫০% পর্যন্ত ইএমআই আপনি বহন করতে পারবেন ধরে নিয়ে লোন দেবে। কেউ কেউ একটু বেশিও দেয়, কারণ আপনার মাসিক বেতন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকবে, ইএমআই একই থাকবে। অনেকেই এই কারনে বর্তমান সাধ্যের একটু বেশি বাইরে গিয়েই লোন নেন। কারন পরে আর এটা বোঝা মনে হবে না, এই ভেবে। কিন্তু সেটা কতদিন বোঝা থাকবে, সেই হিসেবটা ভাল করে করুন। ৪৫-৪৬ বছর বয়সে আপনার আনুমানিক মাসিক স্যালারির ৩০% বা তার মধ্যে যদি আপনার ইএমআই বেঁধে রাখতে পারেন, এর থেকে বেশি মানসিক শান্তি আর কিছুতে হয় না। নিজেকে কিছুটা ফাঁকা রাখুন যাতে একটা উইকএন্ড ট্রিপ করতে গেলেও ভাবতে না হয় যে লোন আছে, থাক যাব না

আর একটা প্রসঙ্গ। যদি এমন বাড়ি কেনেন যেটা তৈরি হচ্ছে মানে 'আন্ডার-কনস্ট্রাকশন', হোম লোন থেকে কর ছাড় নিতে চান পুরোনো ট্যাক্স রেজিমে, একটা কথা মাথায় রাখবেন ছাড় আপনি পাবেন ফ্ল্যাটটা পুরোপুরি তৈরি হয়ে হস্তান্তর হওয়ার পরেই আগের সময়ে নেওয়া সুদে কিন্তু বাড়ি তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে করছাড় নেওয়া যায়। তাই যথাযথ হিসেব রাখবেন কত টাকা ওই সময়ে সুদ গুনছেন।

আর সর্বশেষে বলি, এই কাজটা সবার আগে করবেন। লোন নেওয়ার আগে একটু মার্কেট সার্ভে করুন এখন অনেক ভাল ওয়েবসাইট আছে রিসার্চ করার জন্য কী দেখবেন? কার কত সুদের হার, সেটা ফিক্সড না ফ্লোটিং, ফ্লোটিং হলে কোন বেঞ্চমার্কের সাথে লিংক করা, কোনও রিসেট অপশন (মানে সুদের হার পাল্টানোর সুযোগ) আছে কি না, ইত্যাদি। সব দিক দেখে লোন নিন। প্রায় সারা জীবনের জন্য একটা গুরুদায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, একটু দেখে তো খেলতে হবে না কি?

                                    লেখক প্রাক্তন সিনিয়ার ব্যাঙ্কার, বর্তমানে ব্যাঙ্কিং প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement