মদ না খেয়েও মদ্যপের অনুভূতি আসলে এক ধরনের বিরল অসুখ। শিল্পী, সাহিত্যিক, অনুভবী বিজ্ঞানীরাও সৃজন-সুখে নেশাচ্ছন্ন হন মনে-মনে।
মদ না-খেয়েও মাতাল, পৃথিবীতে এমন মানুষের নথিভুক্ত সংখ্যা এই মুহূর্তে নাকি ১০০-র বেশি নয়। এদের ২২ জনকে নিয়ে পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার’ একটি গভীর তথ্যমূলক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। যে-গবেষণা অনেক নতুন তথ্য সামনে এনে প্রমাণ করল আরও নির্ভুল ও বিস্তৃতভাবে যে, মদ না-খেয়েও ‘মাতাল’ হয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলা, টলমল করে চলা, ঘুমে ঢলে পড়া– সবই আসলে বিরল অসুখ, যার নাম ‘অটো ব্রুয়ারি সিন্ড্রোম’, অর্থাৎ পেটের মধ্যে এই আজব অসুখ বানিয়ে নিয়েছে অটোম্যাটিক শুঁড়িখানা।
অনেকের মনে হতে পারে, কী ভাগ্যবান তারা, যাদের এই অসুখ হয়! বিনা খরচে মদের মৌজ! এর চেয়ে সুখের কী হতে পারে? কিন্তু কোনও অসুখ কি সুখের হতে পারে? এই বিরল অসুখের গতিপ্রকৃতি ও বিভ্রাট একটু তলিয়ে দেখা যাক। আমাদের প্রত্যেকের অন্ত্রের মধ্যে নানারকম ব্যাকটেরিয়া আছে। অটো ব্রুয়ারি সিন্ড্রোমে কেউ আক্রান্ত হলে, তার পেটের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া চিনি জাতীয় খাবার থেকে মদ তৈরি করে এতটা পরিমাণে যে, সে মাতাল হয়ে যায়। এবার ভেবে দেখুন, যে স্বামী মদ্যপ নয়, যে গৃহবধূ মদ স্পর্শ করে না, সে যদি হঠাৎ হঠাৎ মাতাল হয়ে যায়, দাম্পত্য সম্পর্ক কী বিপজ্জনক বাঁক নিয়ে পারে! তার চেয়েও বড় বিপদ, মাতাল ড্রাইভিংয়ের ফলে পুলিশের হাতে পড়লে! এই অসুখ কিন্তু রক্তে অ্যালকোহল এতটাই বাড়িয়ে দেয় যে, পুলিশের যন্ত্রে ফুঁ দেওয়া টেস্টে ল্যাজেগোবরে ফেল হতে হবেই! জিভে একফোঁটা কোহলসুখ নেই, অথচ রক্তে অ্যালকোহল। পুলিশকে বোঝাতে পারবেন, আপনি পেটের মধ্যে ক্যারি করছেন স্বয়ংক্রিয় শুঁড়িখানা? সুকুমার রায়ের হেড অফিসের বড়বাবুর ‘গোঁফ গিয়েছে চুরি’ বলে হঠাৎ খ্যাপামি হয়তো তার অটো ব্রুয়ারি সিন্ড্রোম!
জিভে একফোঁটা কোহলসুখ নেই, অথচ রক্তে অ্যালকোহল। পুলিশকে বোঝাতে পারবেন, আপনি পেটের মধ্যে ক্যারি করছেন স্বয়ংক্রিয় শুঁড়িখানা?
‘নেচার’ পত্রিকায় যে প্রসারিত গবেষণামূলক লেখা অটো ব্রুয়ারি সিন্ড্রোমের উপর নতুন আলো ফেলে আলোড়ন তুলেছে, তার মধ্যে এই অসুখের নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা আছে। চিকিৎসায় সহজে সারে। কলকাতার ডাক্তাররা কী বলছেন, তাও সংবাদপত্রে বেরিয়েছে। ‘ক্যালকাটা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন’-এর প্যাথলজি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান চিকিৎসক প্রণবকুমার ভট্টাচার্য বলেছেন, ৫০ বছরের ডাক্তারির জীবনে একটি মাত্র সম্ভাব্য ‘অটো ব্রুয়ারি সিন্ড্রোম’ আক্রান্ত রোগীর দেখা তিনি পেয়েছিলেন। এই রোগ এত বিরল হওয়ার কারণ, সাধারণ অবস্থায় মানুষের অন্ত্রে জীবাণুগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। একটি খুব জরুরি কথাও বলেছেন তিনি: মুঠো মুঠো অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। তাতে এই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। যদিও চটজলদি অসুখ সারাতে কি বাড়ছে না আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক নির্ভরতা ও প্রবণতা?
মদের নেশা শরীরকে অবশ করে, চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে, কিন্তু ভুললে চলবে না, তাবড়-তাবড় চিন্তক ও সৃজনশীল মানুষ মদ্যপান না করেও মনে-মনে জড়িয়ে পড়েন তুঙ্গ অবসেশনের সঙ্গে। যা আসলে তাদের সৃজনের অংশ।
