Advertisement
ইথিওপিয়ায় আমের ব্যবসা থেকে সৌরভকে 'অপহরণ', বর্ণময় জীবনের গল্পে কিংবদন্তি টুটু বোস
কীভাবে অমিতাভ বচ্চনকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন টুটু বোস?
এক বটবৃক্ষের ছায়া হারাল ময়দান। প্রয়াত মোহনবাগানের প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন বোস। যিনি টুটু বোস নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। বস্তুত মোহনবাগান ও টুটু বোস ছিলেন সমার্থক। অবশ্য তাঁর অনেক পরিচয়। ব্যবসায়ী, সাংসদ, ক্রীড়া প্রশাসক। ফিরে দেখা যাক টুটু বোসের জীবনের কিছু গল্প।
তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল, স্বপ্ন সার্থক করে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা। বিশ্বাস করতেন, বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। নিজেও সেভাবে রাজার মতো বেঁচেছেন। আত্মজীবনীর এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘মোহনবাগান ক্লাবের জন্য যা করার স-অ-ব করব’। তিনদশকের ইতিবৃত্ত পার করে প্রমাণিত যে টুটুবাবু সব করেছেন, স-অ-ব।
মোহনবাগানের সূত্রে বড় বিপদ থেকেও বেঁচেছেন টুটুবাবু। কীরকম? বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গিয়ে পাসপোর্ট-সহ জরুরি কাগজপত্র চুরি যায়। এবার তাহলে দেশে ফিরবেন কীভাবে? বহু সুলুক-সন্ধানের পর বাঙালি রাষ্ট্রদূত অর্জুন সেনগুপ্ত জানান, দ্রুত পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেবেন। তবে একটাই শর্ত। 'কাঠবাঙাল' অর্জুনবাবুকে আজীবন মোহনবাগান মেম্বার করে দিতে হবে। আর মোহনবাগান সচিব হিসেবে সেই কাজ করার শর্তেই সব ভালোয়-ভালোয় মেটে।
এবার প্রশ্ন হল, ব্রাসেলসে তিনি কী করছিলেন? উত্তর হল- মাছের ব্যবসা করতে। এছাড়া ইথিওপিয়ায় গিয়ে ৭০০ একর জমিতে আলফান্সো আমের ব্যবসা করেছেন। আবার মোজাম্বিকে গিয়ে মাইনস থেকে রেলওয়ে লাইন মারফর টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু 'স্লিপ অ্যাপনিয়া' রোগের জন্য মিটিংয়ের মাঝপথেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
দুবাইয়ে ব্যবসা করে প্রমাণ করেছেন বাঙালি ব্যবসাটা খুবই ভালো বোঝে। তাই দুবাইয়ে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তখন দুবাই ছিল শুধুই বালি। কিন্তু বুঝেছিলেন, সেখানে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা লাভজনক হবেই। জাহাজ ব্যবসার সুবাদে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট জগতে চেনাশোনা ছিল। এটাও বুঝিয়েছিলেন, ভৌগোলিকভাবে দুবাই হল আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার ঠিক মাঝে। তাই ব্যবসাও সফল হয়।
'ভবিষ্যতে তোর সব ব্যবসার অ্যাকাউন্টস আমিই দেখব তো। তুই বরং ল পড়।' টুটু বোসকে এই কথা বলেছিলেন বন্ধু অঞ্জন মিত্র। ক্লাস সিক্স থেকে দু'জনের আলাপ। তারপর আজীবনের বন্ধুত্ব। অঞ্জন মিত্র পড়েছিলেন চাটার্ড অ্যাকাউটেন্সি। টুটু বোসেরও তাই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বন্ধুই বলল আইন পড়তে। টুটুবাবুও তাই করলেন।
ব্যবসা যেমন চুটিয়ে করেছেন, তেমনই সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ছিলেন। একবার জানতে পারেন, ডোভার লেনের সঙ্গীত সম্মেলন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়াকে দিয়ে অনুষ্ঠান করানোর টাকা জোগাড় করতে পারছেন না সংগঠকরা। তাদের অনুরোধে স্পনসর জোগাড় করে দেন। পরে ওই সংস্থার সভাপতিও হন।
দারুণ সুসম্পর্ক ছিল অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। ১৯৯২ সালে 'সংবাদ প্রতিদিন' প্রতিষ্ঠার পর তাঁর সার্কুলেশন বাড়াতে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিলেন। পুরনো বিক্রেতাদের বললেন, সার্কুলেশন বাড়াতে পারলে বিশেষ ফাংশন করবেন। কাকে চাই? সবাই একস্বরে বলল, 'লম্বু' অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চন। সল্টলেক স্টেডিয়ামে দেড় লক্ষ লোক বিগ বি'কে দেখতে এসেছিলেন।
নিয়ে এসেছিলেন ক্যামেরুনের তারকা ফুটবলার রজার মিল্লাকেও। মোহনবাগানের শতবর্ষে এসেছিলেন তিনি। যে রজার মিল্লাকে টাকার জন্য ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলিতেও নামানো যায়নি, তাঁকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন টুটু বোস। আবার ইস্টবেঙ্গলের পাশাপাশি বিজয় মালিয়ার ম্যাকডাওয়েলের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সোজা মালিয়ার প্রাইভেট জেটের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
সেই সূত্রে মনে পড়তে পারে ইস্টবেঙ্গল থেকে বিকাশ পাঁজি ও কৃশানু দে'কে মোহনবাগানে সই করানোর কথা। দু'জনকে রাজি করিয়ে সোজা নিজের বাড়িতে চলে আসেন। সেদিন রাতে 'কিডন্যাপিং'-এর অভিযোগে কৃশানুর স্ত্রী ইস্টবেঙ্গল কর্তা দেবব্রত সরকার এসে হাজির। সেবার সই করাতে পারেননি। কিন্তু পরের বছর পারাদ্বীপে অফিসে তাঁদের নিয়ে গিয়েছিলেন। সেবার আর ব্যর্থ হননি।
Published By: Arpan DasPosted: 06:17 PM May 13, 2026Updated: 06:17 PM May 13, 2026
Sangbad Pratidin News App
খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
