এ যেন আরেক অকালবোধন। মেয়ের পুজো শেষ হতেই শুরু মায়ের আরাধনা। শুক্রবার বসন্ত পঞ্চমীর পরদিন দুর্গাষষ্ঠী। রবিবার সপ্তমীর দিন কলাবউকে স্নান করিয়ে শুরু হয়ে গেল ৬ দিনের দুর্গাপুজো। একাদশীর পরদিন সন্ধ্যার আগেই মাতৃবিসর্জন। যেখানে মাকে ঘিরে চলবে উৎসব, সেই শ্মশানের সামনের অন্নপূর্ণার পুকুরেই হবে দেবীমূর্তির ভাসান। আর এই ক'দিন ১০ থেকে ১২টি গ্রামের বাসিন্দারা নতুন জামাকাপড় পরে মণ্ডপে গিয়ে দুর্গোৎসবে মাতবেন। প্রতি বছরের মতো এবছরও হাওড়ার আমতার পেঁড়োর খোসালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কুরিট গ্রামের মহাশ্মশানে দুর্গাপুজোর উৎসব ঘিরে জমজমাট মেলাও।
গ্রামের প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন তারাময়ী আশ্রমের উদ্যোগে ১৯৭৯ সাল থেকে হয়ে আসা পুজোর সমস্ত আয়োজন সারা। শুরু মহা উৎসব। রবিবার দুপুরে কুরিট গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, মহাশ্মশানের মাঠে প্যান্ডেল বেঁধে দেবীর আরাধনা হচ্ছে। এখানে দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধ করছেন না। দেবী দুর্গা সিংহের উপর বসে কাত্যায়নী রূপে পূজিতা হচ্ছেন। দেবী অষ্টাদশভুজা বা ১৮ হাতের। সঙ্গে সন্তানরা, কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেব গরহাজির। বরং সন্তানদের সঙ্গে রয়েছেন এই পুজো যাঁর হাত ধরে শুরু, সেই ঋষি কাত্যায়ন। এখানে দেবীর পুজো হয় তন্ত্রমতে।
আমতার কুরিট গ্রামে দেবী দুর্গার অকালবোধন। চলছে ৬ দিনের পুজো। নিজস্ব ছবি
কিন্তু হঠাৎ কেন অসময়ে মায়ের এই উপাসনা। এই পুজোর উদ্যোক্তা তথা তারাময়ী আশ্রমের সম্পাদক উত্তমকুমার কোলে জানালেন, ১৯৭৯ সালের আগে থেকে কুরিট গ্রামের বাসিন্দারা প্রবল অর্থকষ্টের মধ্যে ভুগছিলেন। কৃষিনির্ভর এই গ্রামে অনাবৃষ্টির জন্য ফসল হচ্ছিল না। ফসল না হওয়ায় কৃষকরা কার্যত আর্থিক কষ্টে মারা যাচ্ছিলেন। কীভাবে কুরিট ও আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা এই সমস্যা থেকে বাঁচবেন বা বেরবেন, তার বিধান দিয়েছিলেন বিশ্বনাথ চক্রবর্তী নামে গ্রামে আসা এক তান্ত্রিক। ওই তান্ত্রিক গ্রামে মাঝে মাঝেই আসতেন। তান্ত্রিক বিশ্বনাথ গ্রামবাসীদের জানিয়েছিলেন, আদিকালের ঋষি কাত্যায়ন তন্ত্রমতে দেবী কাত্যায়নীর পুজো করেছিলেন। দেবী কাত্যায়নী মহালক্ষ্মী রূপে পূজিত হন। তাঁর পুজোর ফলে ধরাধাম শস্য-শ্যামলায় ভরে ওঠে। তান্ত্রিক বিশ্বনাথের কথা শুনেই কুরিট গ্রামে ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হয়ে কাত্যায়নী রূপী দেবী দুর্গার পুজো।
বসন্ত পঞ্চমীর পরেরদিন থেকেই শুরু হয় পুজো। সেই রীতি আজও চলে আসছে। দুর্গারূপী কাত্যায়নীর পুজো কুরিট গ্রামে শুরু হওয়ার পর থেকেই আশপাশের ২০ থেকে ২৫টি গ্রাম ফসলে ভরে ওঠে। প্রায় এক হাজার থেকে ২ হাজার বিঘা জমিতে হয় ধান, আলু, কপি, বেগুনের মতো ফসল। কথিত আছে, এখন গ্রামগুলির কৃষকদের আর কোনও অভাব-অনটন নেই। তাঁরা ফসল ফলিয়ে আর্থিকভাবে এখন সবল। দেবী দুর্গার মণ্ডপের কাছে বটগাছের নিচে তন্ত্রমতে পঞ্চমুন্ডীর পুজো হয়। কথিত আছে, ওই পঞ্চমুন্ডীর মধ্যেই রয়েছে দেবত্বের যাবতীয় চালিকা শক্তি। এই দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর দিন হয় দুর্গাপুজোর মতোই পুষ্পাঞ্জলি। নবমীর দিন দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত হয় যজ্ঞ। এমনকী ওইদিন কলা বলি দেওয়া হয়।
পুজোর কয়েকদিন মূলত বেলফুল ও পাতায় হয় পুজো। সরস্বতী পুজো বা বসন্ত পঞ্চমীর পরেরদিন ষষ্ঠীতে দেবীকে শ্মশানের তৈরি করা পুজোমণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। পরেরদিন অর্থাৎ সপ্তমীর দিন থেকে শুরু হয় পুজো। প্রতিদিনই রাত ৮টার পর দেবীর সন্ধ্যারতি হয়। পুজোর ৬ দিন আমতার কুরিট গ্রামে বসে মেলা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ দুর্গাপুজোর মতোই নতুন জামাকাপড় পরে এসে মণ্ডপে দেবীর মূর্তি দর্শন করেন, মেলায় ঘোরেন। আশ্রমের সম্পাদক উত্তমকুমার কোলে বললেন, এখানে দেবী দুর্গার অকালবোধন করে গ্রামের মানুষ উপকৃত। তাঁরা আজ আর্থিকভাবে সচ্ছল। গ্রামে ৯৮ শতাংশ লোকের বাড়িই এখন পাকা। তাঁর কথায়, এই পুজো আমতা ছাড়াও আরও দুটি জায়গায় হয় - দার্জিলিং ও বাংলাদেশে। এ রাজ্যে শুধু দার্জিলিংয়েই এই অকালবোধন হয়। অকালে গ্রামের এই দুর্গাপুজোয় আড়ম্বর নেই কিন্তু আছে দেবীকে পুজো করার আন্তরিকতা।
