সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে দক্ষিণের কেরল রাজ্যে। তবে দুঃখের বিষয় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে অপারগ সেখানকার চিকিৎসকরা। এর মূল কারণ বেশ কিছু বিষধর সাপের অ্যান্টিভেনাম বা প্রতিষেধক নেই স্বাস্থ্যবিভাগের কাছে। চিকিৎসকরা বাধ্য হচ্ছেন শুধুমাত্র উপসর্গের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করার। জানা যাচ্ছে, ভয়ংকর কিং কোবরা বা শঙ্খচূড় সাপের পাশাপাশি এই তালিকায় রয়েছে ভাইপার বা বোড়া প্রজাতির মোট ৮টি সাপ।
ব্যাম্বো পিট ভাইপার।
স্বাস্থ্যবিভাগের দাবি অনুযায়ী, এই সমস্যার মূলে রয়েছে পিট ভাইপার। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছুঁচালো নাকবিশিষ্ট 'হাম্প নোজ পিট ভাইপার'। যা মূলত রবার বাগান, জঙ্গল ও চাষের জমিতে পাওয়া যায়। কেরলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ২৫ শতাংশ মৃত্যুর কারণ এই সাপ। এই সাপের নির্দিষ্ট প্রতিষেধক তৈরির জন্য স্বাস্থ্য ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে বারবার সুপারিশ করা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার এখনও কোনও পদক্ষেপ করেনি। যার জেরে এই ধরনের রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ডায়ালাইসিস এবং প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে করা হয়। তাতে বিশেষ ফল হয় না।
ছুঁচালো নাকবিশিষ্ট 'হাম্প নোজ পিট ভাইপার'।
এর পাশাপাশি এই তালিকায় রয়েছে, মালাবার প্রজাতির ৩ ধরনের পিট ভাইপার, ২ ধরনের হর্সশু প্রজাতির পিট ভাইপার, ব্যাম্বো পিট ভাইপার ও লার্জ স্কেলড পিট ভাইপার। এর মধ্যে মালাবার পিট ভাইপার তিরুবনন্তপুরম থেকে কাসারগড় পর্যন্ত অঞ্চলে সচরাচর দেখা যায়। এটি হাম্প-নোজড ভাইপারের চেয়ে কম বিষধর বলে মনে করা হলেও এর কামড় প্রাণঘাতী।
মালাবার প্রজাতির পিট ভাইপার।
পিট ভাইপারের পাশাপাশি বিপদের অন্যতম বড় কারণ কিং কোবরা বা শঙ্খচূড়। এর কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম হলেও এর কোনও দেশিয় প্রতিষেধক নেই। চাহিদা না থাকায় অসমে এর একটিমাত্র অ্যান্টিভেনাম উৎপাদন কেন্দ্রও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সাপের কামড়ে মোট ৩টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। পশ্চিমঘাটের ঘন জঙ্গলে পাওয়া দুর্লভ ক্রেট বা কোরাল সাপের অ্যান্টিভেনামও রীতিমতো বিরল।
কিং কোবরা বা শঙ্খচূড়।
বিশেষজ্ঞদের দাবি অনুযায়ী, বিষধর সাপের মধ্যে সাধারণত ২ ধরনের বিষ দেখা যায়। একটি নিউরোটক্সিন ও হেমোটক্সিন। কোবরা ও কোরাল প্রজাতির সাপের বিষ সাধারণত নিউরোটক্সিন হয়। এই বিষ সরাসরি স্নায়ুতে আঘাত হেনে প্রাণীকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেয়। অন্যদিকে, বোড়া প্রজাতির সাপে পাওয়া যায় হেমোটক্সিন। এই বিষ ব্লাড সেল বা রক্তকোষ ও টিস্যুকে ধ্বংস করে। সাপের প্রজাতিভেদে আবার বদলে যায় বিষের ধরন। ফলে রাসেল ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার অ্যান্টিভেনাম পিট ভাইপারের জন্য অতটাও কার্যকরী হয় না। একই জিনিস প্রযোজ্য কেউটে ও শঙ্খচূড়ের ক্ষেত্রেও। সমস্যা এখানেই।
প্রতিষেধক তৈরির উদ্দেশ্যে সাপের বিষ সংগ্রহ।
বর্তমানে ভারতে মাল্টিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম প্রধানত চেন্নাই থেকে সংগৃহীত বিষ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য কেরলের স্থানীয় সাপের বিষ সংগ্রহ করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করেছে, কিন্তু এই দাবি এখনও পূরণ করা হয়নি। একই সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও। দাবি করা হয়, বাংলার চন্দ্রবোড়ার বিষ দক্ষিণের রাজ্যে পাওয়া চন্দ্রবোড়ার বিষের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। ফলে সেখানকার অ্যান্টিভেনামে এখানে পর্যাপ্ত ফল পাওয়া যায় না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বাংলার গ্রামাঞ্চলে আকছার দেখে মেলে এই চন্দ্রবোড়ার।
