shono
Advertisement
WB Assembly Election 2026

অতীতের কং 'দুর্গে' কঠিন লড়াই কাজল শেখের, দায় নিতে হচ্ছে পূর্বসূরির 'ব্যর্থতা'রও, কী বলছে হাসন?

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের সময় থেকে ৩টি বিধানসভা নির্বাচনে ৩ জন আলাদা আলাদা বিধায়ক পেয়েছে বীরভূমের হাসন৷ তবে বরাবরের লো-প্রোফাইল এই বিধানসভা কেন্দ্রই এ বার জেলার অন্যতম হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ।
Published By: Subhajit MandalPosted: 04:10 PM Apr 05, 2026Updated: 05:15 PM Apr 05, 2026

তারাপীঠ মন্দির। রাজ্যের ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে একেবারে প্রথম সারির নাম। সেই তারাপীঠ মন্দির এই বিধানসভার মধ্যেই। এশিয়ার সবচেয়ে বড় গ্রামও (মাড়গ্রাম) এই বিধানসভার অন্তর্গত। সেদিক থেকে দেখতে গেলে রাজ্যের সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল বিধানসভাগুলির মধ্যে পড়া উচিত বীরভূমের হাসনের। অথচ রাজ্য রাজনীতিতে এখনও 'লো-প্রোফাইল' হয়েই থেকে গিয়েছে এই কেন্দ্রটি।

Advertisement

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের সময় থেকে ৩টি বিধানসভা নির্বাচনে (WB Assembly Election 2026) ৩ জন আলাদা আলাদা বিধায়ক পেয়েছে বীরভূমের হাসন। তবে বরাবরের লো-প্রোফাইল এই বিধানসভা কেন্দ্রই এ বার জেলার অন্যতম হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ, সৌজন্যে কাজল শেখ। বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা জেলার রাজনীতিতে তৃণমূলের অন্যতম বড় মুখ এবং রাজ্য রাজনীতিতে সাড়া ফেলে দেওয়া কাজল শেখ এবারই প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিজের বাড়ি নানুর থেকে অনেকটাই দূরে হাসন কেন্দ্রে এসে প্রথমবার বিধায়ক পদের জন্য লড়াই শুরু করলেও ইতিমধ্যেই নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে ফেলেছেন কাজল। জেলার রাজনীতিতে কাজল অনুগামী বলে পরিচিত বিভিন্ন প্রান্তের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নিয়ে গোটা এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যেই তাঁর সমর্থনে জনসভা করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ দ্বন্দ্ব মিটিয়ে সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন অনুব্রত মণ্ডলও। এই অবস্থায় হাসন কেন্দ্রের ফলাফল কী হবে তার দিকে নজর রয়েছে অনেকেরই।

কাজল শেখ। নিজস্ব চিত্র।

মুর্শিদাবাদ ঘেঁষা এই বিধানসভা কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। একটা দীর্ঘ সময় এই আসনে কংগ্রেসের সঙ্গে মূল লড়াই ছিল রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা আরসিপিআইয়ের। ১৯৭৭ সালে এই আসনে নির্দল প্রার্থী অসিত মালকে হারিয়ে জয়ী হন আরসিপিআই প্রার্থী ত্রিলোচন মাল। ১৯৮২ সালে অসিত মাল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচনে লড়াই করেন। কিন্তু সেবারেও নির্দল প্রার্থী ত্রিলোচন মালের কাছে হারতে হয় তাঁকে। এরপর ১৯৮৭ সালে নির্দল প্রার্থী ত্রিলোচন দাসকে হারিয়ে প্রথমবার বিধায়ক হন অসিত। তবে ১৯৯১ সালে ফের ত্রিলোচন দাসের কাছে হার স্বীকার করতে হয় অসিত মালকে। তবে ১৯৯৬ সাল থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরসিপিআই-এর মিহির বায়েনকে, ২০০৬ সালে সিপিএমের খগেন্দ্রনাথ মালকে এবং ২০১১ সালে আরসিপিআইয়ের কামাল হাসানকে পরাজিত করে বিধায়ক হন কংগ্রেসের অসিত মাল। তবে ২০১১ সালে রাজ্যের পালাবদলের পর অসিতও কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। কিন্তু হাসনের ফলাফল তাতে বদলায়নি। ২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের অসিত মালকে হারিয়ে জয়ী হন কংগ্রেসে থাকাকালীন অসিতের অন্যতম শিষ্য মিল্টন রশিদ। রাজ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরেও হাসন কেন্দ্রটি নিজেদের দখলে পেতে ব্যর্থ হয় তৃণমূল। গোটা জেলায় ওই একটি কেন্দ্রই সেবার তৃণমূলের হাতছাড়া হয়। ২০২১ সালে চিকিৎসক অশোক চট্টোপাধ্যায় প্রথমবার হাসন কেন্দ্রে জোড়াফুল প্রতীকে জয়ী হন, তৃতীয় স্থানে চলে যান বাম-কংগ্রেসের জোট প্রার্থী মিল্টন রশিদ। দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসেন বিজেপির নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি।

সমস্যা হল, নির্বাচনে জয়ী হলেও হাসন কেন্দ্রে গত কয়েক বছরে বিধায়ক অশোক চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। বিধায়ক হিসেবে এলাকায় তাকে খুব একটা পাওয়া যেত না এমন অভিযোগ উঠছিল বিভিন্ন স্তর থেকে। এই অবস্থায় ফের হাসন কেন্দ্র যাতে হাতছাড়া না হয়, তার দায়িত্ব তৃণমূলের তরফে দেওয়া হয়েছে কাজল শেখকে। অন্যদিকে হাসন কেন্দ্রকে ফের 'হাতে' নিয়ে আসতে প্রাক্তন বিধায়ক তথা এলাকার পোড়খাওয়া নেতা মিল্টন রশিদের উপরই বাজি ধরেছে কংগ্রেস। আবার গতবার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর এবারও আস্থা রেখেছে বিজেপি। আর সিপিএম প্রার্থী করেছে রামপুরহাট আদালতের তরুণ আইনজীবী কামাল হাসানকে। তাই এ বার আর দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী লড়াই নয়, বরং হাসন কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখতে সম্মুখসমরে নেমে পড়েছে চার পক্ষই।

কংগ্রেস প্রার্থী মিলটন রশিদ। ফাইল ছবি।

হাসন কেন্দ্রে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের ছাপ তৃণমূল প্রার্থী কাজল শেখের চোখেমুখে। প্রত্যেকটি জনসভা থেকে শুরু করে ছোট ছোট প্রচার কর্মসূচি সব জায়গাতেই তিনি হাসিমুখে জানাচ্ছেন জেলায় ১১টি বিধানসভার মধ্যে তৃণমূলের সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জয় আসবে হাসনেই। যদিও তথ্য সে কথা বলছে না। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ১৫টি পঞ্চায়েতের মধ্যে তিনটি পঞ্চায়েত গিয়েছিল বাম ও কংগ্রেস জোটের দখলে। এখনও সেই পঞ্চায়েতগুলি বিরোধীরা চালাচ্ছে। জেলার অন্য প্রান্তের সঙ্গে তুলনা করলে সেটা চমকপ্রদ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে বিজেপিও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উঠে এসেছে। আর তার উপর তৃণমূল প্রার্থী কাজল শেখের বিরুদ্ধে উঠেছে বহিরাগত তত্ত্ব। কংগ্রেসের মিল্টন রশিদ প্রায় প্রত্যেকটি প্রচারে এই তথ্য তুলে ধরে দাবি করছেন ২০২১ সালে বহিরাগত তৃণমূল প্রার্থী অশোক চট্টোপাধ্যায়কে জয়ী করে হাসন কেন্দ্রের মানুষ বুঝে গিয়েছে বহিরাগত বিধায়ক হলে কী কী সমস্যা হতে পারে। সেই একই ভুল তারা আর করবেন না। বিজেপি ও সিপিএমের প্রার্থীও কাজলের বিরুদ্ধে বহিরাগত তত্ত্ব তুলে ধরছেন। সিপিএমের কামাল হোসেন সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, নানুরে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন কাজল শেখ, তাকেই হাসনের মাটিতেও প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছেন তিনি। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ না রেখে নানুর থেকে গুন্ডাবাহিনী নিয়ে এসে ভোট করানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন কামাল।

সিপিএম প্রার্থী কামাল হোসেন। ফাইল ছবি।

এর উপর আবার কাজল শেখের আর এক মাথাব্যথা এসআইআর। এখনও পর্যন্ত যা তথ্য, তাতে হাসন বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের নাম বাদ গিয়েছে এসআইআরে। বাদ যাওয়া নামের প্রায় সবটাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। হাসন কেন্দ্রে প্রায় ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষের বাস। এই কেন্দ্রের ৩০ শতাংশেরও বেশি ভোটার তফশিলি জাতিভুক্ত। এখন সংখ্যালঘুদের ভোট থেকে যদি ১০-১২ হাজার ভোট বাদ পড়ে যায় আর ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাবে তফশিলি জাতিভুক্ত ভোটাররা বিজেপির দিকে ঝুঁকে যান, তাহলে এই কেন্দ্রের ফলাফল সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

হাসন বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের নাম বাদ গিয়েছে এসআইআরে। বাদ যাওয়া নামের প্রায় সবটাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। হাসন কেন্দ্রে প্রায় ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষের বাস। এই কেন্দ্রের ৩০ শতাংশেরও বেশি ভোটার তফশিলি জাতিভুক্ত।

যদিও কাজল শেখের দাবি, হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে গোটা হাসন বিধানসভার মানুষ তাঁর পাশে আছে। জয় শুধুই সময়ের অপেক্ষা। অন্যদিকে বিজেপির নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, হাসনের শান্তিপ্রিয় মানুষ কাজলের গুন্ডামিকে প্রশ্রয় দেবে না। হিন্দু ভোট তো বটেই এমনকি রাষ্ট্রবাদী মুসলমানদের একটা বড় অংশের ভোটও তাঁর ঝুলিতেই পড়বে৷ জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত কংগ্রেসের মিল্টনও। তাঁর দাবি, বহিরাগত প্রার্থী থাকলে কী হয়, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে হাসন, তাই আবারও এখানকার মানুষ ঘরের ছেলের উপরেই ভরসা রাখবে। আর এই সবকিছুর বাইরে গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিকে অতিক্রম করে সব শ্রেণির সমর্থন নিয়ে বিধায়ক আসনে আসবেন বলে দৃঢ়প্রত্যয়ী সিপিএমের কামাল হাসান। তাঁর মতে, দ্বারকা সেতু, বনগ্রাম সেতু, মাড়গ্রাম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়নের মতো আরও অজস্র কাজ বাকি আছে হাসনে। সেই কাজ যে শুধু সিপিএমই করতে পারে, তাও মানুষ জানে৷ তাই ভোটবাক্সেই নিজেদের মতামত বুঝিয়ে দেবে তারা৷

চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস দেখালেও তাই বাধা অনেক কাজল শেখের বিধায়ক হওয়ার পথে। এইসব বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রথম পরীক্ষাতেই সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে পারেন নাকি কংগ্রেসের পুরনো গড় ফের কংগ্রেসকেই বেছে নেবে? চমক দেখাতে পারে বিজেপিও। হাসন কেন্দ্রে সিপিএম ডার্ক হর্স হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেছে। চূড়ান্ত ফলাফল অনেকটা নির্ভর করছে ভোটের দিন পর্যন্ত কার জনসংযোগ কতটা জনমানসে প্রভাব ফেলে সেটার উপর। শেষ পর্যন্ত যদি 'ঘরের ছেলে' বনাম 'বহিরাগত' তত্ত্ব কাজ করে যায়, তাহলে চাপে পড়তে পারেন কাজল। সেক্ষেত্রে মিলট রশিদ, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়রা ভালো চাপে ফেলতে পারেন কাজলকে। আবার যদি এসআইআর ভীতিকে কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের একজোট করতে পারে তৃণমূল, তাহলে তাঁদের জয়ে সমস্যা হবে না। আপাতত সবটাই নির্ভর করছে ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় কোন দল সক্ষম হচ্ছে সেটার উপর। আর কে না জানে, ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় শাসক শিবির বরাবরই এগিয়ে থাকে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement