আবার সেই একই কায়দায় সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে মাওবাদী নামাঙ্কিত পোস্টার মিলল পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে! বোরো থানার আঁকরোর পর রবিবার সাত সকালে বান্দোয়ানের কুমড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের যশপুর অঞ্চল তৃণমূল কার্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেওয়ালে একাধিক মাওবাদী নামাঙ্কিত ওই পোস্টার উদ্ধার হয়। ওই পোস্টারগুলিতে তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা ও ঝাড়খণ্ড পার্টি (আদিত্য)-র নেতাদের নাম নিয়ে তাঁদের 'বেনিয়ম' তুলে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি গণ আদালতে বিচার হবে বলে ওই পোস্টারে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। তবে এই পোস্টারগুলিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ালেও এগুলো মাওবাদীদের নয়। মাওবাদী নামাঙ্কিত একেবারে 'ভুয়ো' পোস্টার বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত-সহ জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক মহলের অনুমান। কেউ বা কারা আতঙ্ক তৈরির জন্য এই কাজ করেছে। বান্দোয়ান থানার পুলিশ খবর পাওয়া মাত্রই ওই পোস্টারগুলিকে উদ্ধার করে তদন্ত শুরু করেছে।
পুরুলিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অভিযান) রসপ্রীত সিং বলেন, "ওই পোস্টারগুলি কারা দিয়েছে, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।" দেশজুড়ে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ৩১ মার্চের মধ্যে সিপিআই (মাওবাদী) নির্মূল করতে হবে, এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগোচ্ছে কেন্দ্র। অথচ মাওবাদী নামাঙ্কিত ওই পোস্টারে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি শব্দ উল্লেখ নেই। যেখানে সিপিআই (মাওবাদী)-র নানান প্রেস বিবৃতিতে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। মাওবাদী দমনে যুক্ত রাজ্য পুলিশের কর্তারা বলেন, খুব সাধারণভাবে মাওবাদীদের পোস্টারের তলায় সিপিআই (মাওবাদী) কথাটি যেমন উল্লেখ থাকে। তেমনই কোনও না কোনও বিষয় ভীষণই সুসংহতভাবে তুলে ধরা হয় তাদের নীতি অনুযায়ী। হাতের লেখাও স্বচ্ছ ও সুন্দর হয়। বানান ভুল থাকে না। সঠিকভাবে বাক্য গঠন থাকে। বোরোর আঁকরোর মতো এই পোস্টারগুলিতেও সেই বিষয়টি নেই।
গণ আদালতে বিচার হওয়ার ওই পোস্টারে ভবতোষ দাস নামে প্রথম যে নামটি রয়েছে, তিনি কুমড়া অঞ্চল তৃণমূল সভাপতি। তিনি পার্টির নাম করে টাকা খেয়েছেন বলে ওই পোস্টারে উল্লেখ রয়েছে।
তাছাড়া রাজ্যে পালা বদলের পর থেকেই এই জঙ্গলমহলে সেভাবে মাওবাদীদের কোনও কার্যকলাপ নেই। বান্দোয়ান ব্লক তৃণমূলের অভিযোগ, এই ঘটনার পিছনে নিশ্চিতভাবে রাজনীতি রয়েছে। বান্দোয়ানের কুমড়া অঞ্চল বর্তমানে শাসক বিরোধী মহাজোটের। প্রধান রয়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার। উপপ্রধান কংগ্রেসের। এই গ্রাম পঞ্চায়েত সব সময় উল্টো পথে হাঁটে। রাজ্যে যে দল ক্ষমতায় থাকে তার বিরোধীরা মহাজোট গড়ে এখানে পঞ্চায়েত পরিচালনা হয়। বাম আমলে তৃণমূলের মহাজোট ছিল। এখন তৃণমূল ক্ষমতায় থাকায় তাদের বিরোধী মহাজোট। তবে এই এলাকায় বিজেপির কোনও প্রভাব না থাকায় ওই জোটে পদ্ম নেই। তাই পোস্টার গুলিতে নিশানা করা হয়েছে বিজেপি ছাড়া প্রায় সকল রাজনৈতিক দলকেই। তবে কুমড়া গ্রাম পঞ্চায়েতে বিজেপির কোনও সদস্য নেই।
গণ আদালতে বিচার হওয়ার ওই পোস্টারে ভবতোষ দাস নামে প্রথম যে নামটি রয়েছে, তিনি কুমড়া অঞ্চল তৃণমূল সভাপতি। তিনি পার্টির নাম করে টাকা খেয়েছেন বলে ওই পোস্টারে উল্লেখ রয়েছে। পোস্টারে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ওই এলাকার সিপিএম নেতা সুধাংশু মহাপাত্র, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চার অনিল হাঁসদা, কংগ্রেসের জগবন্ধু সিং মানকিকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে শাসক বিরোধী মহাজোট পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতের টাকা খাওয়া। এছাড়া স্থানীয় তৃণমূল নেতা সঞ্জয় দাস পাত্র-র নাম ওই পোস্টারে রয়েছে। তিনি চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা খেয়েছেন বলে মাওবাদী নামাঙ্কিত ওই পোস্টারে উল্লেখ আছে।
বান্দোয়ান ব্লক তৃণমূল সভাপতি জগদীশ মাহাতো বলেন, "এই পোস্টার মাওবাদীদের নয়। এই ঘটনার আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। কারণ, বান্দোয়ানে আর কোনওরকম অশান্তি নেই। সব রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে।"
ওই পোস্টারে রয়েছে স্থানীয় সিপিএম নেতা দীনবন্ধু সিং-র নাম। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনার টাকা খাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। স্থানীয় সিপিএম নেতা ও ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত শম্ভু মানকিকে 'মিরজাফর' তকমা দিয়ে ওই পোস্টারে আক্রমণ করা হয়েছে। একইভাবে ঝাড়খণ্ড পার্টি (আদিত্য)-র নেতা কালিপদ মান্ডির নাম দিয়ে তাকে 'মিষ্টিভাষী চোর' বলে আখ্যা দেওয়া হয় ওই পোস্টারে। আরেকটি পোস্টারে এদের নাম লিখে 'এরা সকলে কুমড়া অঞ্চলের চোর' অভিহিত করে 'এবার মাওবাদীদের খেলা হবে' বলে উল্লেখ রয়েছে।
পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের যশপুরে মাওবাদী নামাঙ্কিত পোস্টার উদ্ধার ঘিরে বিভ্রান্তি। নিজস্ব চিত্র
বান্দোয়ান ব্লক তৃণমূল সভাপতি জগদীশ মাহাতো বলেন, "এই পোস্টার মাওবাদীদের নয়। এই ঘটনার আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। কারণ, বান্দোয়ানে আর কোনওরকম অশান্তি নেই। সব রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে। যারা আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক লড়াই। অন্যদিকে, পুলিশ পুলিশের মতো তদন্ত করছে।" পোস্টারে নিশানা করা কংগ্রেসের জগবন্ধু সিং মানকি বলেন, "আমি ২৮ বছর ধরে কংগ্রেসে রয়েছি। ২৮ বছরে ২৮ টাকাও কোথাও নিইনি। যদি এটা কেউ প্রমাণ করতে পারে আমি স্বেচ্ছায় গণ আদালতে বিচার চাইব।"
বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে ভোট এলেই জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে মাওবাদী নামাঙ্কিত এই ধরনের পোস্টার উদ্ধার হয়। অতীতে পুলিশি তদন্তে দেখা গিয়েছে, যারা একসময় মাওবাদী লিঙ্কম্যান হিসাবে কাজ করত, তারাই সাধারণভাবে এই কাজে যুক্ত বলে অভিযোগ। মাওবাদী আত্মসমর্পণের প্যাকেজে চাকরি পেতে এইভাবে তারা প্রশাসন তথা সরকারের নজরে আসতে চায়। কিন্তু মাওবাদী আত্মসমর্পণের প্যাকেজ রয়েছে যারা স্কোয়াড বা প্ল্যাটুনে থেকে জঙ্গলে মাওবাদী কার্যকলাপে একেবারে সরাসরি যুক্ত তাদের জন্যই।
