নতুন বছরে তাঁদের যৌথ প্রয়াস ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’। ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি’, ‘বাবা বেবি ও’, ‘ফাটাফাটি’র পর এই নিয়ে চতুর্থবার তাঁরা একসঙ্গে কাজ করছেন। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে পরিচালক অরিত্র মুখোপাধ্যায় ও গল্পকার জিনিয়া সেন প্রসঙ্গে। উইন্ডোজ-এর অফিসে শীতের দুপুরে জমল আড্ডা। শুনলেন শম্পালী মৌলিক।
'ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল' আসছে নতুন বছরে, ২৩ জানুয়ারি। যখন ছবি দেখার জন্য লোকের আগ্রহ থাকে, ছুটি, সরস্বতী পুজো, সব মিলিয়ে। কতটা আশাবাদী?
জিনিয়া: আমরা খুবই আশাবাদী। কারণ, যে ছবিটা আমরা করেছি সেটা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। বরাবরই তাই থাকি। এটা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী, কারণ বিনোদনের অনুপাত বেশি। মশালা ফিল্ম, খুব মজার ছবি।
অরিত্র: এটাকে ত্রয়ীর কম্বিনেশন বলছি। কারণ, ভয় আছে, মজা আছে আবার রোমান্সও আছে। তার সঙ্গে ইস্যু ধরে রাখার বিষয়টাও। সারা পৃথিবীতে যা ঘটছে, ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে সেই জায়গাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে গিয়েছি আমরা।
ছবির পরিচালনায় অরিত্র আর গল্প জিনিয়ার। চিত্রনাট্য-সংলাপে জিনিয়ার সঙ্গে গোধূলি শর্মা। আপনাদের একাধিকবার কোল্যাবরেশন-এর জায়গাটা জানতে চাই।
জিনিয়া: কারণ, অরিত্র আর আমি একটা টিম। আলাদা করে ভাবার বিষয় নয়। আমরা ভাবি দু’জনে একসঙ্গে কী করব।
বাংলায় খুব একটা হরর কমেডি হয় না। সেই ভাবনার নেপথ্যে কী?
জিনিয়া: গতবছর আমি, দিদি (নন্দিতা রায়) আর শিবপ্রসাদ বেড়াতে গিয়েছিলাম। একপ্রকার জোর করেই যেতে চেয়েছিলাম, বলেছিলাম নইলে লিখব না (হাসি)। তো কালিম্পং যাই আমরা চারদিনের জন্য। খুব বড় আর সুন্দর হোটেলে ছিলাম। বেশ পুরনো দিনের স্থাপত্য তার, ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, লম্বা করিডর, বলরুমের সাইজের ডাইনিং স্পেস। সেই সময় হোটেলে লোকজন কমই ছিল। আমি বেশ হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াতাম। হাঁটতে হাঁটতে মনে হত আমি একাই হাঁটছি, নাকি আশপাশে লোকজন আছে? যাদের দেখতে পাচ্ছি না। সেই ভাবনা আমার দু'দিন ধরে চলে। ঘরের মধ্যে মেঘ ঢুকে আসত জানলা দিয়ে, রীতিমতো গা-ছমছমে পরিবেশ। তারপর আমি দিদির কাছে গিয়ে বলি বিষয়টা যে, হন্টেড হোটেল নিয়ে ভাবছি। যদি একটা গল্প বলি, শুনবে? আমরা তো সোশ্যাল ড্রামাই করেছি, এরকম তো করিনি। সঙ্গে সঙ্গে দিদি বলেন, ‘কেন শুনব না!’ অনেকটা গল্প ওখানেই তৈরি হয়ে যায়। তারপর ফিরে এসে অরিত্রকে বললাম।
অরিত্র: শুনে থম মেরে গিয়েছিলাম। হরর জঁরটা করার ইচ্ছে থাকলেও, শুট করা শক্ত। গ্রাফিক্স, সাউন্ড ডিজাইন সবটা ঠিক না হলে, অ্যাচিভ করা মুশকিল। তারউপর অনেক চরিত্র আমাদের। পাহাড়ে শুট করেছিলাম তিনদিন। সেখানে মূল চরিত্রই ছিল ৩২ জন। কিন্তু ‘ভানুপ্রিয়া’র টিমকে ধন্যবাদ তারা এত ভালো কাজ করেছে। কঠিন মনে হয়নি।
জিনিয়া: আর গল্পে আমারই মতো অতিথিরা বুঝতে পারবে তারা এই হোটেলে একা নেই।
অরিত্র: ‘ইরি’ জায়গায় গেলে যেমন অনুভূতি হয়, সেটাই সারাক্ষণ থাকবে। মানে ধরো, যার সঙ্গে কথা বলেছি, পরে গল্পতে শুনলাম ওই মানুষটা বহুকাল আগে চলে গিয়েছে (হাসি)।
ছবির কাস্টিং, মানে প্রধান দুটি জুটি মিমি চক্রবর্তী-সোহম মজুমদার এবং স্বস্তিকা দত্ত-বনি সেনগুপ্ত। এই বিষয়েও কি দু’জনের মিলিত সিদ্ধান্ত?
জিনিয়া: শুধু দু’জন নয়। আমাদের একটা বড় ডিরেক্টোরিয়াল টিম আছে। অরিত্র যেমন আমাকে বলে দিয়েছে, লিখতে গিয়ে যেন কারও কথা ভেবে না বসি, সেক্ষেত্রে সমস্যা হয়। কিন্তু সবসময় সেটা হয়ে ওঠে না। সেইরকম এই ছবির ক্ষেত্রে সোহমের কথা ভেবেছিলাম। অরিত্রকে সেটা বলেছিলাম। বাকি অভিনেতাদের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই মানা হয়েছে। মানে আমাদের টিমের। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা প্রযোজকদের কাছে যাই। তাঁদেরও প্রশ্ন থাকে।
অরিত্র: আমার, জিনিয়ার এবং আমাদের টিমের তিনটে প্রেজেন্টেশন থাকে। মোট ১২ জনের কাছ পাস হলেই চূড়ান্ত নির্বাচন।
তিনটে বড় রিলিজ ২৩ জানুয়ারি। ‘হোক কলরব’, ‘বিজয়নগরের হীরে’ আর ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’। আবারও সেই শো পাওয়া এবং হল দখলের লড়াইয়ের সম্ভাবনা। কীভাবে দেখছেন?
জিনিয়া: আমাদের ছবিটা ২৫ ডিসেম্বর আসার কথা ছিল। সেখান থেকে আলোচনার মাধ্যমে ছবিটা সরে যায়। এগজিবিটররা বলেছিলেন, যারা সরে যাবে তাদের প্রায়োরিটি শো দেবেন। আমরা দুটো ছবি সরে গিয়েছিলাম– ‘বিজয়নগরের হীরে’ আর আমরা। এবার আমরা অপেক্ষায় আছি, তাঁরা যেমন বলেছিলেন। তাঁদের সাজেশন শুনেছি, বাকিটা দেখার কটা শো আমরা পেতে পারি।
পুজোর সময় আমরা দেখেছি, ছবিগুলোর মধ্যে লড়াই শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করেছে। বড়দিনেও প্রায় তেমন দেখা গেল। আপনি নিজেও একসময় অবাঞ্ছিত ঘটনার শিকার হয়েছেন পুজোর সময়। এই বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
জিনিয়া: আমার মনে হয়, আমরা শালীনতার মাত্রা যদি অতিক্রম করে যাই, যে কোনওভাবেই, তাহলে তখন প্রশাসন ও পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আমার অষ্টমী কেটেছিল রবীন্দ্র সরোবরের থানায়। কারণ, আমি এফআইআর করতে বাধ্য হয়েছিলাম। মনে করি, যতবার এরকম কিছু হবে, ততবারই এফআইআর হবে। সেদিন স্ক্রিনিং কমিটির মিটিংয়ে আবারও বিষয়টা উঠে এল। স্বরূপদা (বিশ্বাস) আলোচনার মধ্যে বললেন, এরকম যদি আবারও হয়, এবার আমরা লালবাজারে গিয়ে ধরনা দেব। যতক্ষণ না অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে। সেই আশ্বাস কিন্তু ওঁরা দিয়েছেন। অর্থাৎ লড়াইটা জারি রাখতে হবে।
এইটুকু ছোট ইন্ডাস্ট্রি সবার তো মিলেমিশে কাজ করার কথা।
জিনিয়া: মিলেমিশে কাজ করার দায়িত্ব তো সবার। সকলে যদি করেন তাহলে সমস্যা থাকে না।
খুব কম হয় গল্পকার এবং পরিচালক একসঙ্গে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কী?
অরিত্র: এই হাউসে গল্প-চিত্রনাট্যের একটা গুরুত্ব আছে।
জিনিয়া: কারণ আমরা বিশ্বাস করি কনটেন্ট ইজ দ্য কিং।
চিত্রনাট্য সব ছবির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
জিনিয়া: আমাদের হাউসে চিত্রনাট্যে বিশেষ গুরুত্ব দিই। কারণ, কনটেন্টকে মানি। সেটা পুজো করার মতো ব্যাপার।
অরিত্র: সেইটা পরিচালক এবং গল্পকার সেম পেজে থাকলে ভালো হয়। সত্যি বলতে, আমরা টিমের মতো। আমাকে যখন প্রথম গল্প জমা দিতে
বলা হয়েছিল, কে আমার জন্য লিখবে ভেবে পাচ্ছিলাম না। জিনিয়া যে আমার জন্য লিখবে ভাবিনি। ওকে যখন বলেছিলাম, ওর উত্তর ছিল, ‘তোমার কেরিয়ারটাই শেষ হয়ে যাবে, আমার লেখাতে।’ আমি চেয়েছিলাম দু’জনে একসঙ্গে শুরু করতে। খারাপ হলে দু’জনেরই হবে। আমাদের টিমে আরেকজনও আছে, দীপায়ন। সে সারাদিন দৌড়চ্ছে ছবিটার জন্য, রাত জাগছে গ্রাফিক্সের জন্য। চাইলে ওকে নিয়েও বসতে পারি আমরা।
জিনিয়া: অরিত্র, আমি আর দীপায়ন পার্মানেন্ট টিম।
অরিত্র: জিনিয়া ছবির কস্টিউম দেখে। ডিজাইনারের সঙ্গে আলোচনা সবটা।
আপনাদের ঝগড়া হয় না?
জিনিয়া: সারা বছর মুখ দেখাদেখি থাকে না। অফিসে অরিত্র একতলায় বসে, আমি তিনতলায়। শুধু যখন কাজ করি ভাব হয় মাঝেমাঝে।
অরিত্র: আমরা সকালে এসে দু’জনে চুক্তি সাইন করি, তারপর রাতে ঝগড়া করে বেরোই।
জিনিয়া: আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ঝগড়া।
অরিত্র: আমরা ঝগড়াতেই একে অপরকে বেটার বোঝাই (হাসি)।
