আকবর জমানার ‘তারিখ-ই-ইলাহি’-ই ১৫৮৪ সালে প্রবর্তিত বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ? বিশেষ নববর্ষ নিবন্ধ। লিখছেন শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায়।
বিকেলের অনিবার্য গন্তব্য পাড়ার রঘুজেঠুর মুদির দোকান। জমজমাট হালখাতা। মোটা সাদা সুতলি দিয়ে বঁাধা মেরুন রঙের একখান জাবদাখাতা। বাঙালির আদিম ‘ক্রেডিট হিস্ট্রি’। ধারবাকি, পাওনাগন্ডার হিসাব। পয়লা বৈশাখে বাংলা বাজারের এই ‘খেরোর খাতা’টি সযতনে পাতা থাকত একটা ছোট্ট গণেশ মূর্তির পদতলে।
দোকানে ঢুকেই সর্বাগ্রে গণপতিবাপ্পার শ্রীচরণকমলে টুক করে একটা ‘ভক্তিপূর্ণ’ প্রণাম। তাতেই সন্তুষ্ট রঘুজেঠু মিষ্টি হেসে, ‘শুভ নববর্ষ’ বলে পরিবার-পিছু একটি করে প্যাকেট ধরিয়ে দিত। বাক্সে লেখা ‘সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বিশিষ্ট মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান’। লেখাটা সামান্য তেলচিটে। কারণ, তার পেটে একটি কচুরি ঠাসা। সঙ্গে লাড্ডু-সহ তিন পিস মিষ্টি। আর ‘টেক ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি’ হিসাবে রবারের গার্ডার দিয়ে রোল করে মোড়া একটি ক্যালেন্ডার। বাংলা বর্ষপঞ্জি।
ফ্যানের হাওয়ায় দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটা ওয়ালক্লকের পেন্ডুলামের মতো দুলত সারাক্ষণ। তাতে ওই টিনের পাতের খোঁচায় আমাদের ঘরের রংচটা দেওয়ালটায় ভাঙা বৃত্তের মতো একটা দাগ তৈরি হত। সময়ের চিহ্ন। ইতিহাসের দাগ।
বাড়ি ফিরেই ভাইবোনদের ভাগাভাগি করে মিষ্টির বাক্স হজম। হাতটাত মুছেই সাত তাড়াতাড়ি ক্যালেন্ডার খোলার পালা। অবধারিত ঠাকুরদেবতার ছবি। মাখনচোর নন্দকিশোর, রাধাকেষ্টর যুগলমূর্তি, দুর্গার মুখ, শিব ঠাকুরের জটায় বঁাধা গঙ্গাদেবী, রামচন্দ্রের চরণযুগলে সীতার প্রণাম। ছবির নিচে ক্রোড়পত্রের মতো চারটে পাতা জোড়া। প্রতিটি পাতায় তিনটি করে বাংলা মাস। ওই পাতাগুলি দেখতে দেখতে আমরা বাংলার বারো মাসের নাম শিখেছিলাম। ক্যালেন্ডার খুলেই আমরা প্রথমেই দেখতাম কবে দুর্গাপুজো? সরস্বতী পুজো কবে পড়ল? দোল?
বাঙালির জীবনখাতার ওই ক্যালেন্ডারটার কয়েকটি দিন লাল কালি দিয়ে ঘিরে দিত মা। সঙ্গে লিখে রাখত ‘মান্তুর বৃত্তিপরীক্ষা’, ‘মউয়ের গানের স্কুলে ক্লাস শুরু’, ‘কুটুর বসন্তের টিকা’! ক্যালেন্ডারের মাথায় থাকত একটা টিনের পাতের ফ্রেম। গরমকালে আমাদের ওই গুমট ঘরটায় একটা ‘ডি সি’ সিলিং ফ্যান ঘুরত, ঊষা কোম্পানির। ফ্যানের হাওয়ায় দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটা ওয়ালক্লকের পেন্ডুলামের মতো দুলত সারাক্ষণ। তাতে ওই টিনের পাতের খোঁচায় আমাদের ঘরের রংচটা দেওয়ালটায় ভাঙা বৃত্তের মতো একটা দাগ তৈরি হত। সময়ের চিহ্ন। ইতিহাসের দাগ।
আমাদের পয়লা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের ‘জনক’ এই শাহেনশাহ ভারতের ইতিহাসে ‘মোগল সম্রাট আকবর’ নামে পরিচিত। আর, তঁার সেই বন্ধুটির নাম আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি।
কয়েকশো বছর আগে বঁাকুড়ার সোনাতপন আর ডিহারগ্রামের কয়েকটা টেরাকোটার শিবমন্দিরের দেওয়ালে এরকম কিছু আবছা ‘দাগ’ দেখা গিয়েছিল। পুরাতাত্ত্বিকরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে উদ্ধার করেছিলেন, ওই দাগটা আসলে একটি বাংলা শব্দ। ‘বঙ্গাব্দ’। সম্ভাব্য যে-সময়ে মন্দিরগাত্রে খোদাই হয়েছিল এই শব্দ, দিল্লিতে তখন এক তরুণ তেজস্বী বাদশার জমানা। তঁার ছিল ‘দিন গোনার’ অদ্ভুত নেশা। সেই বাদশার ছিল এক সবজান্তা খ্যাপাটে বন্ধু। অবকাশে, অবসরে এই বন্ধুর সঙ্গে বসে ক্যালেন্ডার কষতেন সেই দিল্লিশ্বর, শব্দছক মেলানোর মতো। এভাবেই বর্ষছক মেলাতে মেলাতে ওই দুই বন্ধু মিলে রচনা করেছিলেন বাংলা বর্ষপঞ্জি। পারসি-প্রভাবিত বাদশা ওই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটির নাম দিয়েছিলেন ‘পহেলা বৈশাখ’। আমাদের পয়লা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের ‘জনক’ এই শাহেনশাহ ভারতের ইতিহাসে ‘মোগল সম্রাট আকবর’ নামে পরিচিত। আর, তঁার সেই বন্ধুটির নাম আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি।
পণ্ডিতমহলের একটি বড় অংশের ধারণা, বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনা করেছিলেন সুবে বাংলার প্রথম স্বাধীন সম্রাট মহাশৈব শশাঙ্ক। নিজনির্মিত গৌড়রাজ্যের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনার সিংহাসনে বসেই ৫৯৩ সালে তিনি ওই ক্যালেন্ডার খসড়া ‘আবিষ্কার’ করেন। এই ইতিহাসের উল্লেখ আছে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’-য়। কুণাল ও শুভ্র চক্রবর্তীর ‘হিস্ট্রোরিক্যাল ডিকশনারি অফ বেঙ্গলিজ’-এ এটাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে শামসুজ্জামান খানের ‘বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস ও সংস্কার’ বইয়ে লেখা হয়েছে, এটা হতেই পারে যে, বাংলা বর্ষের রূপায়ণে শশাঙ্কের কৃতিত্ব রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, বাংলা বর্ষপঞ্জিকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জীবনোপযোগী করে তুলেছিলেন সম্রাট আকবর এবং তঁার সর্বজ্ঞ
সখা সিরাজি।
আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ অনুযায়ী, আকবর নিজে ছিলেন বিদ্যোৎসাহী এবং যাবতীয় সৃজনশীলতার পৃষ্ঠপোষক। নানা কৃষ্টি, শিল্প, সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজজীবন ও বিজ্ঞানের ব্যাপারে তঁার ছিল অসীম আগ্রহ। তাই তিনি নিজের রাজসভায় সসম্মানে স্থান দিয়েছিলেন বিভিন্ন বিষয়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সুপণ্ডিতদের। সিরাজি ছিলেন আকবরের তেমনই এক সমুজ্জ্বল সভাসদ। সাহিত্য, শিল্প, গণিত ও বিজ্ঞানের ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস’ সিরাজি ছিলেন রাজবদ্যিও। আকবরের বহু দিনের স্বপ্ন ছিল দেশ জুড়ে সর্বধর্মসমন্বয়। বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলন। এই দর্শনের অঙ্গ রূপেই তিনি সিরাজিকে দিয়ে ‘চন্দ্রপঞ্জিকা’ বা হিজরি এবং সংস্কৃতের সৌরপঞ্জিকে মিলিয়ে একটি সহজ সরল ও সমাজোপযোগী বাংলা ক্যালেন্ডার নির্মাণ করিয়েছিলেন। তখন এই বর্ষপঞ্জির নাম ছিল ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের দিনক্ষণ’। ১৫৮৪ সালে এটিই বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ হিসাবে সর্বজনগ্রাহ্য হয় এবং বঙ্গসমাজের সর্বস্তরে স্বীকৃতি পায়।
‘চন্দ্রপঞ্জিকা’ বা হিজরি এবং সংস্কৃতের সৌরপঞ্জিকে মিলিয়ে একটি সহজ সরল ও সমাজোপযোগী বাংলা ক্যালেন্ডার নির্মাণ করিয়েছিলেন সম্রাট আকবর। তখন এই বর্ষপঞ্জির নাম ছিল ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের দিনক্ষণ’।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, আকবর হঠাৎ বাংলা ক্যালেন্ডার নিয়ে পড়েছিলেন কেন? আসলে, তিনি ১৫৭৬ সালে করবানি বংশের শেষ সুলতান দাউদ খানকে হারিয়ে ‘বাংলা’-কে প্রথম মুঘল সাম্রাজ্যের আওতায় এনেছিলেন। এবং তিনি-ই সংস্কৃতিমনস্ক বন্ধু মুনিম খানকে বাংলার প্রথম সুবেদার রূপে নিয়োগ করেন। এই মুনিমের কৃতিত্বেই আকবর বাংলার সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রেমে পড়েছিলেন। তঁার মনে হয়েছিল, কৃষিমাতৃক বাংলায় একটি ক্যালেন্ডার তখনই জনসহায়ক হয়ে উঠতে পারে, যদি তা সঠিক অর্থে ‘ফসলি সন’ হয়। তাতে খাজনা আদায় ব্যবস্থাকেও সুগম ও সক্রিয় করা যায়। বহু গণনা এবং সমীক্ষার পরে ঠিক হয়, চাষাবাদের মরশুমকে প্রাধান্য দিতে হলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় অর্থাৎ বৈশাখ মাসেই বঙ্গবর্ষপঞ্জি শুরু করতে হবে। সেই থেকেই ১৫ এপ্রিল হল বাংলার নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ।
ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত, বাংলা বর্ষছকে খুব স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে আকবরের ধর্মীয় উদারতা, প্রগতিশীল দর্শন এবং মুক্তমনা চারুকলা। বাংলার জন্য ফসলি সনের উদ্ভাবনকে তিনি নিয়েছিলেন ‘দীন-ই-ইলাহি’ বা ‘কমন রিলিজিওন’ প্রবর্তনের অবচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে। আর, এই বাদশাহের যে ছিল ক্যালেন্ডারের নেশা, তা তো অমর্ত্য সেনও লিখেছেন ‘দ্য আরগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ বইয়ে। তিনি লিখেছেন, বাংলা ক্যালেন্ডার আসলে ধর্মকে ছাপিয়ে কর্মের জয়পতাকা।
পয়লা বৈশাখের বিকেলে আমাদের বাড়ির দেওয়ালে যে ক্যালেন্ডারটা হাওয়ায় পতপত করে উড়ত, সেটা আসলে সেই মুক্ত ও উদার বাঙালিয়ানার পতাকা। একই পতাকায় দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। একই আকাশে যেমন চন্দ্র-সূর্যের উদয়াস্তের পালা। বাংলা নববর্ষ এলেই তাই আমার আমাদের বাড়ির দেওয়ালের সেই দাগটির কথা মনে পড়ে। ওটাই তো আমাদের হতদরিদ্র শৈশবের বর্ণোজ্জ্বল বাঙালিয়ানা। খুব সহজে ও-দাগটা মিটবে না!
(মতামত নিজস্ব)
