ওষুধ বিক্রিতে প্রফিট মার্জিন ক্রমশ কমছে। পাশাপাশি এসে গিয়েছে ন্যায্যমূলে্যর দোকান ও জনঔষধি– রিটেলারদের নাভিশ্বাসের কারণ। সঠিক ওষুধ বিক্রি করে যে-লাভ হয় তা দিয়ে দোকানঘরের ভাড়া, বিদু্যৎ বিল, কর্মচারীদের মাইনে মিটিয়ে লাভের কড়ি ঘরে আনা প্রায় অসম্ভব। স্বভাবতই কিছু কিছু অসাধু মানুষ ঝুঁকছে ‘জাল’ ওষুধের দিকে। প্রতিকার কোন পথে? লিখছেন অভিজিৎ তরফদার।
কিছু দিন আগেই বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবরটি প্রকাশিত। জীবনদায়ী ১৫টি ওষুধের দাম বাড়ল। ৬ থেকে ১২ শতাংশ অবধি মূল্যবৃদ্ধি। মুখের কথা নয়! সাধারণ, ভুক্তভোগী, যাদের বাড়িতে অসুস্থ বা বৃদ্ধ মানুষ আছে এমন পরিবারে, মাসের খরচের একটি বড় অংশ ওষুধ কিনতে ব্যয় হয়। অবশ্যই খবরটি জায়গা পেয়েছিল সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায়, নিচের দিকে, হয়তো ২০০ শব্দও তার জন্য ব্যয় করা হয়নি।
এখন দেখা যাক, কী কী কারণে ওষুধের দাম বাড়তে পারে। প্রথম কারণ, কঁাচামালের দামবৃদ্ধি। মনে রাখতে হবে, যে কোনও ওষুধ, আমরা যা হাতে পাই, তার কেন্দ্রে থাকে আসল ওষুধ, যাকে বলা হয় ‘কঁাচামাল’। সেই কঁাচামালটি মোড়কে ভরে বা শিশিজাত হয়ে যখন আমাদের হাতে পৌঁছয় তা ক্যাপসুল, পাউডার, ট্যাবলেট বা তরল পদার্থ যে কোনও চেহারা ধারণ করতে পারে। তাছাড়া ওষুধটিকে গ্রহণযোগ্য (Palatable) করার জন্য তার উপর কোটিং থাকতে পারে, থাকতে পারে স্বাদবর্ধক অন্যান্য সামগ্রী।
স্বীকার করে নেওয়া ভালো, যত ওষুধ বাজারে আছে তার সামান্য শতাংশেরই কঁাচামাল ভারতে পাওয়া যায়। বাকি কঁাচামাল আনতে হয় বিদেশ থেকে। যেসব ওষুধের ‘পেটেন্ট’ এখনও শেষ হয়নি সেসবের যারা ইনোভেটর, অর্থাৎ যে কোম্পানির গবেষণালব্ধ সেই ওষুধ, সেসব ওষুধ পেরেন্ট কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোথাও থেকে আমদানি করা আইনবিরুদ্ধ। গবেষণার খরচ তোলার জন্য ইনোভেটর কোম্পানি গোড়ার দিকে সেসব ওষুধের দামও করে রাখে আকাশছেঁায়া। ফলে পেটেন্টের রাহুগ্রাস মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সেসব ওষুধ থাকে সাধারণ মানুষের ধরাছেঁায়ার বাইরে।
‘পেটেন্ট’-মুক্ত হলে পৃথিবীর বহু দেশ সেই ওষুধটির ‘নকল’ তৈরিতে নেমে পড়ে। এই নকলনবিশী কিন্তু বেআইনি নয়। এসব ওষুধকে বলা হয় ‘জেনেরিক’। ভারত জেনেরিক ওষুধ তৈরিতে বিশ্বকে পথ দেখায়। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে টিভি, যে কোনও শিল্পে, হাতফেরত প্রোডাক্ত বানাতে আমরা সিদ্ধহস্ত। যেহেতু মৌলিক গবেষণায় কোনও ইনসেনটিভ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যায় না, ভারতের শিল্প সংস্থাগুলি নকলনবিশী করতেই কাছা খুলে নেমে পড়ে। ওষুধ-শিল্প এর ব্যতিক্রম নয়।
যত ওষুধ বাজারে আছে তার সামান্য শতাংশেরই কঁাচামাল ভারতে পাওয়া যায়। বাকি কঁাচামাল আনতে হয় বিদেশ থেকে। যেসব ওষুধের ‘পেটেন্ট’ এখনও শেষ হয়নি সেসবের যারা ইনোভেটর, অর্থাৎ যে কোম্পানির গবেষণালব্ধ সেই ওষুধ, সেসব ওষুধ পেরেন্ট কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোথাও থেকে আমদানি করা আইনবিরুদ্ধ।
‘জেনেরিক’ ওষুধের ভালো দিকগুলি কিন্তু ভুললে চলবে না। কয়েক বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য রেখে সভামঞ্চ থেকে নেমে আসছি, একজন, ভিনদেশি ডেলিগেট এসে আলাপ করলেন।
–আপনি ভারত থেকে আসছেন?
–হঁ্যা, কেন বলুন তো?
–আপনাকে অভিনন্দন।
–আমাকে? হঠাৎ?
–আপনি ভারত থেকে এসেছেন, তাই।
অবাক হলাম। এমন কমপ্লিমেন্ট আগে পাইনি। ভদ্রলোক ব্যাখ্যা করলেন।
–আমি নাইজিরিয়া থেকে আসছি। আমরা আফ্রিকায় আগে অঙ্গ সংস্থাপনের (organ transplantation) কথা ভাবতেই পারতাম না। তার প্রধান কারণ ওষুধের অস্বাভাবিক দাম। ভারত থেকে জেনেরিক ওষুধ আসতে শুরু করায় এখন সস্তায় ‘ইমিউনোসাপ্রেসিভ’ (immunosuppressive) ওষুধ পেতে শুরু করেছি। আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ দেশে যে ট্রান্সপ্লান্ট প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে তার জন্য ভারতের কাছে ঋণী আমরা। কিন্তু যে-প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না তা হল– এসব জেনেরিক ওষুধ গুণমানে কি আসল ওষুধটির সমতুল? সেটাই হওয়া উচিত। এই প্রসঙ্গে দু’টি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিই।
প্রথমটি এক ফার্মাকোলজি অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপচারিতা। তঁার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, জেনেরিক ওষুধের গুণমান কি গবেষণালব্ধ ওষুধের সমান? অধ্যাপকমশাই যা বলেছিলেন তার সারমর্ম: কোনও কোম্পানি যখন অফ-পেটেন্ট ওষুধ তৈরি করতে মনস্থ করে, তখন শর্ত থাকে– তার গুণমান যেন আসল ওষুধটির গুণমানের অন্তত ৮০ শতাংশ থাকে। যা গুণমান যাচাই করা সংস্থা দেখে নেয়। প্রশ্ন করেছিলাম, পরবর্তী কোম্পানিরা? মানে, প্রথমটির পর আরও যারা ‘জেনেরিক’ ওষুধ তৈরি করবে? তাদের ক্ষেত্রেও কি এই নিষেধাজ্ঞা একইভাবে প্রযোজ্য? অধ্যাপকমশাই মুচকি হেসে চুপ করে গিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা আমার নিজস্ব। হায়দরাবাদের একবার পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলাম। খবর পেলাম কাছেই নাকি একটি ওষুধ তৈরির কারখানা, যেখানে ‘জেনেরিক’ ওষুধ তৈরি হয়। কোম্পানিকে অনুরোধ করায় তারা রাজি হল প্লান্ট ঘুরে দেখাতে। দেখা হল। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, প্লান্টের একটি বিশেষ অংশে যেতে দেওয়া হল না। কেন জানতে চাওয়ায় যা জবাব পেলাম তাতে হাত-পা ঠান্ডা হওয়ার জোগাড়। কর্তৃপক্ষ জানাল, কারখানার ওই অংশে যে-ওষুধ তৈরি হয় তা ‘জেনেরিক’– কিন্তু তা রপ্তানি হয় বিদেশে, যার মধে্য বিশ্বের ধনী দেশেরা পড়ে। ওই প্লান্টে ঢুকতে গেলে মহাকাশচারীদের মতো পোশাক পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে, বিশেষ অনুমতি নিয়ে তবে ঢুকবে হবে। বুঝতে অসুবিধা হল না, ভারতের আপামর জনসাধারণের জন্য ‘গুণমান’ যা, তা-ই বজায় রেখে বিশ্বের বাজারে জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করতে গেলে তা বিচারে ফেল করে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই দু’রকম ব্যবস্থা!
কঁাচামালের দামের পরই যে-কারণটি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে তা আনা-নেওয়ার খরচ। আগেই বলেছি ওষুধের কঁাচামাল আমদানি করতে হয়। এবার ব্যাপারটা যেহেতু আমদানির, সেহেতু আনতে হয় জাহাজে। বিশ্বের বাজারে তেলের দাম বাড়লে জাহাজের ভাড়াও বৃদ্ধি পায়, সেই বৃদ্ধি ওষুধের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। তাছাড়া ওষুধের প্যাকেজিং থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছু পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য থেকে আহরণ করা হয়। পেট্রোলিয়ামের দাম বাড়ার সঙ্গে ওইসব জিনিসের দামও বাড়ে। একটি উপসাগরীয় যুদ্ধ এইভাবে অনেক কিছুর পাশাপাশি ওষুধের দামও বৃদ্ধি করে।
ভারতের আপামর জনসাধারণের জন্য ‘গুণমান’ যা, তা-ই বজায় রেখে বিশ্বের বাজারে জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করতে গেলে তা বিচারে ফেল করে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারি ট্যাক্স কম করা হয়। মনে রাখতে হবে, যে কোনও দ্রবে্যর মতো ওষুধের উপরও সরকার ট্যাক্স ধার্য করে। সেই ট্যাক্স কমানো বা বাড়ানো সরকারি ইচ্ছাধীন। কোন ওষুধ জীবনদায়ী আর কোনটি নয়– তা নির্ধারণ করে একটি কমিটি। কমিটির সদস্যদের অভিমতই এখানে চূড়ান্ত। স্বভাবতই সিদ্ধান্ত যেখানে সাবজেক্টিভ কমিটির সদস্যরা কোন নিরিখে নির্দিষ্ট কোনও ওষুধকে ট্যাক্সের আওতা থেকে বাদ রাখবে, আর কার উপর ট্যাক্স চাপাবে তা সবসময় যে প্রশ্নাতীত, তা বলা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, দেখা গিয়েছে বড় কোনও নির্বাচন এলে ওষুধের দাম বাড়ে। যদিও কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ধারণ করা অনুমানসাপেক্ষ, ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির অনেকেই রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ফান্ডে চঁাদা দেয়। সেই টাকা তারা নিজেদের পকেট থেকে দেবে এমনটা কার্যত অসম্ভব। স্বভাবতই সেটা চাপিয়ে দেওয়া হয় ওষুধের দামের উপর। ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ।
পরের যে লাখ টাকার প্রশ্ন সামনে আসে– তা হল, ওষুধের গুণমান। পয়সা দিয়ে কিনে যে ওষুধটি খাচ্ছি তার ভিতরে ঠিকঠাক ওষুধ আছে তো? এই প্রসঙ্গে দু’টি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমটি বহু বছর আগের, আমার মেয়ে তখন ছোট। জ্বর-কাশি হয়েছে, ‘কোট্রিইমক্সাজল’ (Cotrimoxazole) খেলে ওর তাড়াতাড়ি সারত। হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে মেট্রো থেকে নেমে একটি ওষুধের দোকানে গিয়ে চাইলাম। চাওয়ামাত্র তাক থেকে পেড়ে দোকানের কর্মচারী হাতে ধরিয়ে দাম বললেন। দাম মেটানোর সময় অনুরোধ করলাম ক্যাশ মেমো দিতে। এবার মালিক এগিয়ে এলেন। বললেন, প্রেসক্রিপশন না দিলে ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় না। আমি বললাম, সে কথাটাই যদি দয়া করে মালিক দোকানের প্যাডে লিখে দেন, ভালো হয়।
বিশ্বাস করবেন না, মালিক আমার হাত থেকে ওষুধের শিশিটি একরকম ছিনিয়ে নিলেন! তারপর ভেতর থেকে আর-একটি কোম্পানির কোট্রিইমক্সাজল সিরাপ এনে ক্যাশ মেমো-সহ হাতে দিয়ে হঁাফ ছেড়ে বঁাচলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা আরও আগের। আমি তখন ডাক্তারি ছাত্র। শীতকাল, রাতের কর্ড লাইন লোকালে বর্ধমান যাচ্ছি। ট্রেন প্রায় ফঁাকা। কম্পার্টমেন্টের অন্য প্রান্তে দু’জনের আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টি আকর্ষণ করল। সিট বদলে কাছাকাছি গিয়ে বসলাম। হেসে বললাম, ‘ওদিকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে তাই এপাশে চলে এলাম।’ সহযাত্রী দু’জন হেসে ঘাড় নেড়ে ফেলে যাওয়া আলোচনা আবার শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধে্য যা জানতে পারলাম তা হাড়হিম করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কলকাতার একটি বিশেষ বাজারে নাকি নামকরা কোম্পানির ওষুধের ক্যাপসুলের খাপ বিক্রি হয়। সেই খাপ কিনে এনে তার মধে্য ধুলোমাটি চকের গুঁড়ো মিশিয়ে বিক্রি করা হয় গ্রামেগঞ্জে। ঘটনাটি অন্য কেউ বললে গালগল্প বলে উড়িয়ে দিতাম। নিজের কানে শোনা ঘটনা কেমন করে মিথে্য বলি?
কিছু দিন আগেই কলকাতার কলুটোলা স্ট্রিটের একটি স্টোর থেকে রেড করে একটি দামি ও জীবনদায়ী ওষুধের নকল আবিষ্কার করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এক-দু’পেটি নয়, জাল ওষুধে প্রায় ভর্তি ছিল স্টোর রুমটি, কেন এত জাল ওষুধের রমরমা? প্রথম কারণ: ওষুধ বিক্রিতে প্রফিট-মার্জিন ক্রমশ কমে আসছে। বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি কোনও দিনই দোকানদারের জন্য বিরাট পরিমাণ লাভের বন্দোবস্ত করত না। হালে ভারতীয় সংস্থাগুলিও প্রফিট-মার্জিন কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। পাশাপাশি এসে গিয়েছে ন্যায্যমূলে্যর দোকান ও জনঔষধি– রিটেলারদের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। সঠিক ওষুধ বিক্রি করে যে-লাভ হয়, তা দিয়ে দোকানঘরের ভাড়া, বিদু্যৎ বিল, কর্মচারীদের মাইনে মিটিয়ে লাভের কড়ি ঘরে আনা প্রায় অসম্ভব। স্বভাবতই কিছু কিছু দোকানদার অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে ঝুঁকছে জাল ওষুধের দিকে। জাল ওষুধই নয়, জাল যন্ত্রপাতি এমনকী ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ-নিড্ল সবই জাল হচ্ছে।
এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
কিছুদিন আগে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের ব্যবহারে যেসব নিড্ল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছিল তা থেকে এইচআইভি সংক্রামিত হয়। যদিও ঘটনাটি এই রাজে্য ঘটেনি, ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে দক্ষিণে কিছু দূর এগলেই দেখা যাবে বস্তাভর্তি হাসপাতালের বর্জ্য স্তূপাকৃতি হয়ে রাস্তার ধারে পড়ে আছে। তার মধ্য থেকে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ-নিড্ল আলাদা করে প্যাকটজাত হয়ে আবার দোকানে দোকানে জায়গা করে নিচ্ছে এমন নয় তো? মনে রাখতে হবে, অনেক দোকানদারই এই অসাধু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু বাজারের চাপ এবং অস্তিত্বরক্ষার লড়াই তাদের বাধ্য করছে রাস্তা বদল করতে।
ফল: সৎ দোকানদারদের সংখ্যা কমছে, দল ভারী হচ্ছে তাদের, যারা সততার থেকেও লাভের অঙ্ক বুঝে নিতে বেশি আগ্রহী। এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী? মাঝে মাঝে রেড হয়। তা সংবাদমাধ্যমকে জানানোও হয়। সংস্থার মাথায় যঁারা, তঁারা সেজেগুজে টিভির পর্দায় আসেন। মানুষ নড়েচড়ে বসে। দুর্জনেরা অবশ্য অন্য কথা বলে। তাদের বক্তব্য– এত বড় সিন্ডিকেট একা-একা চলতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধে্যও এমন কেউ আছে, যে বা যারা ক্রয়যোগ্য। তারা আবার আরও উপরের কাউকে বশে রাখার জন্য যা-যা করা উচিত তা-ই করে থাকে। শেষ ধাপে বিরাজ করে রাজনৈতিক নেতারা। তাদেরই অঙ্গুলিহেলনে ঠিক হয় গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলিতে কে বা কারা থাকবে। যারা এসবের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না, তারা বাণপ্রস্থ গ্রহণ করে।
সরকারের দিক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা কিন্তু নয়। জনঔষধির দোকান, ন্যায্যমূলে্যর বিপণিতে সঠিক দামে ভাল ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এখনও অবধি ওষুধের মান নিয়ে তেমন কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। ভবিষ্যৎ বলবে, যে কোনও ভাল উদে্যাগের মতো এটিরও অকালে সদ্গতি হবে কি না। মানুষেরও দোষ নেই– তা বলা যাবে না। সরকার থেকে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দিয়ে বারবার সাবধান করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে:
এক) ওষুধ কেনার সময় ক্যাশ মেমো নিতে ভুলবেন না। দুই) ওষুধের ফ্ল্যাপের উপর ‘QR-Code’ দেখে তবেই ওষুধ কিনবেন। ক্রেতাকে বোঝানো হচ্ছে, ক্যাশ মেমো নিলে ‘জিএসটি’ লেগে যাবে, ফলে ওষুধের দাম বেশি লাগবে। ক্যাশ মেমো না নিলে ওষুধটি সস্তায় পাওয়া যাবে। ফঁাদে পা দিচ্ছেন ক্রেতা। সস্তায় জাল ওষুধ নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন।
আর, QR-Code? সেটা কী জিনিস বোঝাতেই প্রাণান্ত হচ্ছেন চিকিৎসক। এদিক থেকে বরং নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি যত্নবান। নতুন প্রজন্মের রোগী ও আত্মীয়স্বজনকে বোঝালেই তারা ঠিকঠাক ওষুধ সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছে।
এক সময় সরকার থেকেই নিয়ম করা হয়েছিল ডাক্তাররা ওষুধের বাণিজি্যক নাম লিখতে পারবে না। লিখতে হবে ওষুধের ‘কম্পোজিশন’। ‘ট্রেড নেম’ লিখলেও কম্পোজিশন লেখা বাধ্যতামূলক করা হল। মেডিক্যাল কাউন্সিলকে ভার দেওয়া হল খবরদারি করতে। ডাক্তারদের কনফারেন্স স্পনসর করা বন্ধ করা হল। পুলিশ যেভাবে ফুটপাথ থেকে হকার নির্মূল করে– হকার তোলার ১৫ দিনের মধে্য আবার হকার বসে যায়, একইভাবে নিয়ম চালু হওয়ার কিছু দিনের মধে্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার খবরদারির রাশ আলগা হল। আবার শুরু হল ‘ট্রেড নেম’ লেখা।
তাছাড়া ডাক্তার ট্রেড নেম না লিখলে ওষুধের ব্র্যান্ড ঠিক করার দায়িত্ব পড়ে দোকানদানের উপর। দোকানদার সেই ব্র্যান্ডের ওষুধই গছাতে শুরু করল যে কোম্পানি দোকানদারের স্বার্থ দেখবে। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলি ডাক্তারের পরিবর্তে দোকানদারদের সস্ত্রীক মালদ্বীপ বেড়াতে নিয়ে যাওয়া শুরু করল। হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ করে যে-দফতর, যারা বাল্ক পারচেজ করে সেখানে যে বা যারা ওষুধ কেনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের খুশি না করতে পারলে কোম্পানি ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যেতে পারে। তখন ওষুধ বিক্রিই বন্ধ হয়ে যাবে।
স্বভাবতই কোম্পানিগুলি চাইবে না সেই পরিস্থিতি তৈরি হোক, তাই দেখা যায় ওষুধ-প্রস্তুতকারী সংস্থারা ওসব প্রতিষ্ঠানে হতে্য দিয়ে পড়ে থাকে কীভাবে তাদের ওষুধগুলির নাম লিস্টে ঢোকানো যায়। শুধু অনুরোধ-উপরোধে যে কাজ হয় না, বলাই বাহুল্য। তাই যেসব দফতর বাল্ক পারচেজ করে তাদের অফিসারের বাড়ি থেকে গোছাগোছা নোট আবিষ্কার হলে আর কেউ ভুরু কেঁাচকায় না।
সরকার বাহাদুর কি এসব তথ্য জানে না? জানে না বলা শক্ত। তবে জেনেও যে চোখ বন্ধ করে থাকে তার একটি কারণ, সরকার কোনও নিরাবয়ব বায়বীয় বস্তু নয়। সরকারের পা থেকে মাথা পর্যন্ত রয়েছেন অফিসারেরা, যঁাদের প্রতে্যকেই শালগ্রাম শিলার মতো পবিত্র– এমন কথা নিন্দুকেও বলতে পারবে না। দ্বিতীয় কথা, মসনদে যে-পার্টিই থাকুক না কেন, তাদের ভোটে জিততে হলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই অর্থ আমদানির জন্য যাদের উপর নির্ভর করতে হয়, তাদের মধে্য ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাও পড়ে।
কিন্তু যে-তথ্যটি কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না তা হল, কোনও ওষুধ কোম্পানি ওষুধ বিক্রির জন্য যাদের উপর নির্ভর করে থাকে তারা কিন্তু স্টাফ, যাদের সাধারণ মানুষ ‘এমআর’ বা ‘মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসাবে চেনে। হাজার হাজার এসব কর্মী সামান্য মাইনেতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে মালিকের ঘরে যে লাভের টাকা এনে দেয়, তা থেকেই তাদের মাইনে হয়। কোম্পানির লাভ হলে তার একটি অংশ ইনসেন্টিভ হিসাবেও জোটে। এই ফিল্ড স্টাফেরা মুখে রক্ত তুলে যে-পরিশ্রম করেন তার লক্ষ্য কিন্তু সেই উপার্জন যা দিয়ে তঁাদের সংসার চলে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি হাত বাড়িয়েও যে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়– তার একটি
বড় কারণ– এই অগণিত সাধারণ কর্মী, কারণ ধরপাকড় করলে আঘাত প্রথমেই তাদের উপর নেমে আসবে, চাকরিহারা হবে তারা, যার সামাজিক অভিঘাত কম নয়। অর্থাৎ এ এক এমন পরিস্থিতি, যেখানে এগতে গেলে বিপদ, পিছতে গেলেও বিপদ কম নয়। পরিত্রাণ কী এবং কবে তা লক্ষ টাকার প্রশ্ন হিসাবেই ঝুলে থাকে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
(মতামত নিজস্ব)
