shono
Advertisement
India–Oman Trade Deal

ওমান চুক্তি ও বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত

উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, ওমানের সঙ্গে এই চুক্তি তারই প্রতিফলন। লিখলেন বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।
Published By: Biswadip DeyPosted: 12:17 PM Jun 02, 2026Updated: 03:13 PM Jun 02, 2026

ভারত ও ওমানের মধ্যে কার্যকর হওয়া ‘সর্বাঙ্গীণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (India–Oman Trade Deal) দুই দেশের বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পণ্যের জন্য ওমানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, ওমানের সঙ্গে এই চুক্তি তারই প্রতিফলন। লিখলেন বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।

Advertisement

ভারতীয় ছাত্রছাত্রী, শিল্পী, মহিলা, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগীদের জন্য নতুন সুযোগ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর নতুন নতুন বাজার তৈরি এবং আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এর মূল উদ্দেশ্য। এই আবহে ভারত-ওমান অবাধ বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ১ জুন থেকে এই চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে।

ওমানের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিকভাবে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সে-দেশে প্রায় ৭ লক্ষ ভারতীয় বসবাস করে। এদের মধ্যে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, যারা ২০০-৩০০ বছর আগে সে-দেশে গিয়েছে। প্রতি বছর ওমান থেকে ভারতীয়রা প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়ে থাকে। সে দেশে ৬ হাজারের বেশি ভারতীয় সংস্থা সক্রিয়।

ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর নতুন নতুন বাজার তৈরি এবং আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। এই আবহে ভারত-ওমান অবাধ বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ১ জুন থেকে এই চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে।

দু’-দেশের মধ্যে ‘সর্বাঙ্গীণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ বা ‘কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (‘সিইপিএ’) আর্থিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে ৯৯.৩৮ শতাংশ ভারতীয় রফতানিযোগ্য পণ্যসামগ্রী ওমানের ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। প্রাক-‘সিইপিএ’ যুগের সঙ্গে এক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হবে। অতীতে ওমানের শুল্কমুক্ত বাজারে মাত্র ১৫.৩ শতাংশ ভারতীয় পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হত। বর্তমানে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া পণ্যসামগ্রীর উপর ওমান ৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক চাপিয়ে থাকে। রপ্তানি করা পণ্যসামগ্রীর মোট পরিমাণ ৩৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। এর ফলে, ভারত কিছু প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।

‘সিইপিএ’ থেকে ভারতের বেশ কিছু ক্ষেত্র যথেষ্ট উপকৃত হবে। এর মধ্যে রয়েছে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ। মূলত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, লোহা ও ইস্পাত, বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, গাড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ উপকৃত হবে। এই সংস্থাগুলি আরও বেশি করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বরাত পাবে। ফলে, এ দেশে বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশীয় পণ্য আরও বেশি করে উৎপাদিত হবে। সারা বিশ্বে এক অস্থির পরিস্থিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আবহে ‘সিইপিএ’ ভারতীয় রফতানিকারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। এ দেশের পণ্যসামগ্রীকে আরও নতুন নতুন বাজারে নিয়ে যাওয়ার ফলে চিরাচরিত বাজারগুলির উপর নির্ভরশীলতা কমবে। সংশ্লিষ্ট বাজারগুলিতে আর্থিক মন্দা ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হচ্ছিল।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি

এই চুক্তি বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, অলংকার শিল্প এবং কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের মতো শ্রমিক-নির্ভর ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ করে দেবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলি সবথেকে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।

ওমানে আরও বেশি করে বস্ত্র রফতানি করা হলে এ-দেশের বস্ত্রশিল্পের বড় বড় কেন্দ্রে উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পাবে। ফলে, তিরুপুর, সুরাত, লুধিয়ানা, পানিপথ, কোয়েম্বাটোর, ভারোহি, মুরাদাবাদ, জয়পুর এবং আহমেদাবাদের মতো শহর উপকৃত হবে। আবার, তন্তুবায় ও হস্তশিল্পীরাও উপকৃত হবেন, কারণ তঁাদের পণ্যসামগ্রীর আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়বে। চর্মশিল্পেও ভারতজুড়ে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ছাড়াও মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশও এর ফলে লাভবান হবে।

এই চুক্তি বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, অলংকার শিল্প এবং কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের মতো শ্রমিক-নির্ভর ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ করে দেবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলি সবথেকে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।

‘সিইপিএ’-র ফলে অলংকার শিল্পও উপকৃত হবে। এই শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ভারত ইতোমধ্যেই হীরে, সোনা ও রুপোর অলংকার ও হাতে তৈরি বিভিন্ন অলংকারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। শুল্ক সংক্রান্ত বাধা না থাকার ফলে ভারতীয় রফতানিকারকরা ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের থেকে ভাল অবস্থানে থাকবে। আগামী তিন বছরে ওমানে এই শিল্পের উৎপাদিত পণ্য রফতানি ১৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং গুজরাতের মতো যেসব রাজ্যে অলংকার তৈরির ক্লাস্টার রয়েছে, সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।

কৃষক ও মৎস্যজীবী

দেশের কৃষক এবং সংবেদনশীল কৃষিক্ষেত্রের স্বার্থরক্ষা করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ভারত গম, চাল, ভুট্টা, দানাশস্য, ডেয়ারি শিল্প, ফলমূল, শাকসবজি, রান্নার তেল, তৈলবীজ, চা, কফি ও মধুর মতো পণ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে কোনওরকমের শুল্ক ছাড় দেয় না।
ভারত মাখন, মধু, মিষ্টি বিস্কুট, ডিম এবং কনফেকশনারি পণ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের থেকে কিছু বাড়তি সুবিধা পাবে। এর ফলে, দেশের কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়বে। ফলস্বরূপ, গ্রামাঞ্চলে রোজগার বৃদ্ধি পাবে।

এই চুক্তি ভারতের ‘ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর অরগ‌্যানিক প্রোডাকশন’-এর শংসাপত্রকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেবে। ফলস্বরূপ, জৈবচাষে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর ওমানের বাজারে বিক্রির সুযোগ বাড়বে। ওমানে এই ধরনের পণ্যের চাহিদা প্রচুর। সামুদ্রিক পণ্যেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

এই পণ্যসামগ্রীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এই চুক্তি সহায়ক হবে। ২০২২-’২৪ সময়কালে ওমান ১১ কোটি ৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার মূল্যের সামুদ্রিক পণ্য আমদানি করে। ভারত থেকে এত দিন ৭৭ লক্ষ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্যসামগ্রী আমদানি হত। এই চুক্তির ফলে চিংড়ি এবং হিমায়িত কাট্‌লফিশের মতো ভারতীয় সামুদ্রিক খাবারের প্রচুর চাহিদা বাড়বে। শ্রম-নির্ভর সামুদ্রিক খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন শিল্প আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। মাছ ধরা, মাছের প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজজাত করা, হিমঘরে পণ্য পরিবহণ করা এবং রফতানির অন্যান্য কাজে নতুন কাজের সুযোগ বাড়বে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা

ইউএসএফডিএ, ইএমএ, ইউকে এমএইচআরএ, এবং টিজিএ-র মতো নিয়ামক সংস্থা নিজ-নিজ দেশে ভারতীয় ওষুধের বিক্রিতে অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে, ওমানেও ৯০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ওষুধগুলি বিক্রি করা যাবে। ‘সিইপিএ’ ভারতের চিরায়ত চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যও নতুন নতুন সুযোগ নিয়ে আসবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।

পরিষেবা ও যাতায়াত

এই চুক্তির ফলে পরিষেবা এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে। ভারতের রফতানি সংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে কারণ, বিভিন্ন পেশাদারি পরিষেবা, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, গবেষণা এবং পরিবেশজনিত নানা ধরনের পরিষেবা ওমানে সহজলভ্য হবে। হিসাবরক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, ওষুধ, নির্মাণ শিল্প এবং নানা ক্ষেত্রে পরামর্শদানের সঙ্গে যুক্ত ভারতীয়রা এর ফলে উপকৃত হবেন।

ভারতীয় কর্মী এবং পেশাদাররা যাতে সহজেই ওমানে যেতে পারেন, সেই বিষয়টি নতুন চুক্তির ফলে নিশ্চিত হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বদলি এবং চুক্তি-ভিত্তিক কাজের সুযোগ পাওয়া যাবে। এই চুক্তি চার বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। পাশাপাশি, যেসব পেশাদার ব্যক্তিত্বরা স্বাধীনভাবে কাজ করেন, তঁারা স্বল্পকালীন সময়ে ওমানে থাকার সুযোগ পাবেন। নতুন চুক্তির ফলে ওমান এবং ভারতের কর্পোরেট সংস্থাগুলির মধ্যে কর্মী বদলির হার ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছবে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি ভারতীয়র জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সবরকমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। উন্নত রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এরই অঙ্গ।

উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অভিন্ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, ওমানের সঙ্গে এই চুক্তি তারই প্রতিফলন। সংরক্ষণবাদী এই বিশ্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি স্পষ্ট বার্তা জানিয়ে দিয়েছেন। আস্থায় ভরপুর ভারত এখন আর কোনও পঁাচিলের ঘেরাটোপে আবদ্ধ থাকতে রাজি নয়, বরং অংশীদারিত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে সে ক্রমশ এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement