উত্তর ভারতে যোগী আদিত্যনাথ যেমন হিন্দুত্ব ও প্রশাসনিক কঠোরতার প্রতীক, উত্তর-পূর্বে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আঞ্চলিক সম্প্রসারণের মুখ– তেমনই বাংলায় শুভেন্দুকে সামনে এনে পূর্ব ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
পূর্ব ভারতে বিজেপির নতুন ‘পোস্টার বয়’ রূপে এখন উঠে আসছেন শুভেন্দু অধিকারী। এক সময় উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা-কে সামনে রেখে যে রাজনৈতিক বিস্তার ঘটিয়েছিল বিজেপি, এবার সেই একই ছক বাংলাকে কেন্দ্র করে অঁাকতে শুরু করেছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর, সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
’২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ‘ঐতিহাসিক’ জয়ের পর থেকে দলের অভ্যন্তরে এই রাজনৈতিক বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল-নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘঁাটি ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়, তৎসহ নন্দীগ্রামে পুরনো আধিপত্য বজায় রাখা– বিজেপির কাছে শুধুমাত্র নির্বাচনী সাফল্য নয়, এটিকে বড় রাজনৈতিক প্রতীক হিসাবেও দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপি এখন এমন আঞ্চলিক মুখ খুঁজছে– যিনি বাংলার রাজনৈতিক আবেগ, হিন্দুত্বের মেরুকরণ, সংগঠনের বিস্তার, এবং কেন্দ্রের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি– এই চারটি স্তম্ভকে একসঙ্গে বহন করতে পারবেন। সেই জায়গায় শুভেন্দুই দলের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মুখ। ২০২১ সালে ‘বিরোধী দলনেতা’ রূপে শুরু হওয়া তঁার লড়াই ২০২৬ সালে তঁাকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে পৌঁছে দিয়েছে।
’২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ‘ঐতিহাসিক’ জয়ের পর থেকে দলের অভ্যন্তরে এই রাজনৈতিক বার্তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘঁাটি ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়, তৎসহ নন্দীগ্রামে পুরনো আধিপত্য বজায় রাখা– বিজেপির কাছে শুধুমাত্র নির্বাচনী সাফল্য নয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই তৃণমূলের ভিতরে ভাঙনের ইঙ্গিত এবং একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হওয়ার ঘটনা বিজেপির আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ফলে দিল্লির কাছে এখন শুভেন্দু শুধুমাত্র বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন, পূর্ব ভারতে ‘গেরুয়া রাজনীতি’-র নতুন ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’। শুভেন্দুকে ‘পোস্টার বয়’ রূপে তুলে ধরার নেপথ্যে বিজেপির শীর্ষনেতৃত্বের গভীর অঙ্ক বিদ্যমান। ঠিক যেমন উত্তর ভারতে যোগী আদিত্যনাথ হিন্দুত্ব ও প্রশাসনিক কঠোরতার প্রতীক, উত্তর-পূর্বে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আঞ্চলিক সম্প্রসারণের মুখ– তেমনই বাংলায় শুভেন্দুকে সামনে এনে পূর্ব ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। কারণ, বাংলার রাজনৈতিক প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে ভূ-রাজনৈতিকভাবে ওড়িশা, অসম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের একাংশে।
দলের শীর্ষ সূত্রের খবর, বিজেপি এখন থেকে বাংলাকে ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র রূপে দেখছে। সেই কারণে শুধুমাত্র একজন মুখ্যমন্ত্রী নন, বরং ‘পূর্ব ভারতের বিজেপি মডেল’-এর মুখ রূপে শুভেন্দুকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা প্রথম থেকেই শুরু করে দিতে চাইছেন মোদি-শাহ। আর, এর জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অনুপ্রবেশ-বিরোধী অবস্থান, কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মতো বিষয়কে সামনে রেখে তঁার ‘ভাবমূর্তি’ তৈরি করার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালু করা থেকে শুরু করে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের জন্য জমি হস্তান্তরের মতো সিদ্ধান্তকে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে বড় ‘বার্তা’ রূপে তুলে ধরছে। আবার, ইদের দিন মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে গিয়ে শুভেন্দুর গো-সেবার চিত্র তুলে ধরে বিজেপির যে-হিন্দুত্বের বার্তা, তা জোরালোভাবে দেওয়ায় কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলার রাজনৈতিক প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে ভূ-রাজনৈতিকভাবে ওড়িশা, অসম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের একাংশে।
বিজেপির অন্দরমহলে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে ‘বার্তা’: উত্তরে যোগী, উত্তর-পূর্বে হিমন্ত, আর পূর্ব ভারতে শুভেন্দু। ’২৯ লোকসভা ভোটের আগে এই ‘ত্রয়ী’-কে সামনে রেখেই জাতীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ গড়ে তুলতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
