দক্ষিণ বেরুবাড়ি সীমান্তে অবশেষে বসতে চলেছে কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার জন্য জমিদানে সম্মত ৬৫টি পরিবার। ফুটবে এবার বিয়ের ফুল।
‘যে পারে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে।’– এই উক্তি রবীন্দ্রনাথের। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের অরক্ষিত, পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাওয়া দিগন্তবিস্তৃত সীমান্তে এত দিন কিন্তু বিয়ের ফুল ফোটানো সহজ ছিল না। যেখানে দুটো দেশের মধ্যে নেই কোনও নির্দিষ্ট বেড়া, ভেদরেখা, সেখানে কি ঠাহর করা সহজ, কে কোন দেশের? আর এমন অনির্ণেয় তারল্যের মধ্যে বিয়ের ফুল কি নিশ্চিন্তে ফুটতে পারে?
৩০ মে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত দীপুর বিয়ে ভাঙার গল্পটা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, পাঠক? মেয়ের বাড়ির লোকেদের পছন্দ হয়েছিল দীপুকে। পাকা কথা তাঁরা একরকম জানিয়েই দিয়েছিলেন দীপুর মা সুমিত্রা রায়কে। আর সুমিত্রা এই আনন্দ সংবাদ আত্মীয়স্বজন-পাড়াপড়শিদের না জানিয়ে পারেননি। তারপর মেয়ের বাড়ির লোকেরা এলেন, যে-বাড়িতে মেয়েকে দেবেন, সে-বাড়ি দেখতে। আর এসেই গেলেন বিগড়ে। এবং দীপুর মা সুমিত্রাকে বলেই দিলেন মুখের উপর– ‘আপনাদের দোরগোড়ায় তো দেখছি উদম সীমান্ত! কোথায় শেষ হচ্ছে এপার বাংলা, কোথায় শুরু হচ্ছে ওপার বাংলা, কোনও পার্টিশন নেই, বেড়া নেই, এই অনিশ্চয়তার মধ্যে মেয়ে পাঠাব কী করে? অসম্ভব।’ দীপুর বিয়ের ফুল ফুটব ফুটব করেও ফুটল না।
যেখানে দুটো দেশের মাঝখানে নেই কোনও ভেদচিহ্ন, নেই কোনও কাঁটাতারের বেড়া, সেই উদম খোলা সীমান্তে ছেলে বা মেয়ের শ্বশুরবাড়ি– ব্যাপারটা কতটা রিস্কি হয়ে যাচ্ছে ভেবে দেখুন!
শুধু দীপুর বিয়ে নয়, যেখানে দুটো দেশের মাঝখানে নেই কোনও ভেদচিহ্ন, নেই কোনও কাঁটাতারের বেড়া, সেই উদম খোলা সীমান্তে ছেলে বা মেয়ের শ্বশুরবাড়ি– ব্যাপারটা কতটা রিস্কি হয়ে যাচ্ছে ভেবে দেখুন! সুতরাং এই অনিশ্চিত তেপান্তরে অবৈধ কর্মকাণ্ড যতটা সহজ, ততটাই কঠিন বিয়ের ফুল ফোটার। এবার কিন্তু নতুন বিজেপি সরকার কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। কার ঠিকানা কার বাড়ি কোন দেশে– সেই অনিশ্চয়তা আর থাকছে না। সুতরাং এই রাজ্যের সীমান্তে বিয়ের ফুল অচিরে ফুটতে চলেছে। তার একটা বড় কারণ, এই দিকশূন্যপুরের মানুষ বেড়ার জন্য জমিদানে আগ্রহী দাতাকর্ণ। ইতিমধ্যে ৬৫টি পরিবার জমির দানপত্রে বসিয়েছে স্বাক্ষর।
এত দিন অবস্থাটা কেমন ছিল? যেমন জলপাইগুড়ি। টানা ৩৫ কিলোমিটার দূরে মানিকগঞ্জ ফাঁড়ি। তার মধ্যে ছোট্ট গ্রাম দক্ষিণ বেরুবাড়ি। একেবারে গা ঘেঁষে বাংলাদেশ। সম্পূর্ণ অরক্ষিত ১৯ কিলোমিটারের এই সীমান্ত। রাত বাড়লে সেই চরাচরে ব্যাপারটা কত দূর গড়াতে পারে, ভেবে দেখতে পারেন। নতুন সরকার এই রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য বিএসএফকে জমি দিতে রাজি হয়েছে। এবং জমিদাতারাও রাজি ৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা বিঘা মূল্যে। সুতরাং কাঁটাতারের বেড়া পড়ল বলে। অন্ধকারেও অবাধ পাচার ও অনুপ্রবেশ আর সম্ভব হবে না। কার বাড়ি এ-দেশে, কার ও-দেশে, ঠিকানার এই অনিশ্চয়তা হতে চলেছে দুঃস্বপ্নের অতীত। এবং আশার আলো ফুটছে রাজ্যের সীমান্তে। সেই সঙ্গে ফুটতে চলেছে বিয়ের ফুল। দীপুর মা সুমিত্রা রায়ের মুখে আশ্বাসের হাসি কি সেই বার্তাই দিচ্ছে না?
