সন্তানের জীবনের চেয়েও কি পরবর্তী প্রজন্মের ভাল থাকা, স্বস্তিতে থাকা বেশি মূল্যবান? ভবিষ্যতের জন্য গুছিয়ে নেওয়াই শ্রেয়!
পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর, গভীর ও নিঃস্বার্থের সম্পর্ক হল মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। এখানে স্বার্থের ভূমিকা থাকে না, উচিতও নয় থাকা। পারস্পরিক সেই সম্পর্ক হওয়া উচিত বহুমুখী। বন্ধু, সহমর্মী, সহযোগী, শিক্ষক, অভিভাবক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের অভিমুখ পরিবর্তিত হয়। পরিস্থিতি ও ব্যক্তিত্বের বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই সুন্দর সম্পর্কের সমীকরণও বদলে যায়। চলে আসে স্বার্থের প্রসঙ্গ। লেনদেন, বাবা-মায়ের থেকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব, মা-বাবাকে আর্থিকভাবে সুরক্ষিত রাখার দায়– কখনও কখনও সম্পর্কে তিক্ততাও তৈরি করে।
সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের আত্মিক টান চিরন্তন হওয়া উচিত। তারপরেও এমন বহু ঘটনা ঘটে, যা এই চিরকালীন সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেয়। যেমন, উত্তরপ্রদেশে নিকি ভাটি খুনের ঘটনা। একই বাড়িতে দুই বোনের বিয়ে হয়। কিন্তু গত বছরের আগস্টে পণের জন্য নিকিকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ ওঠে। যার সাক্ষী নিকির বোন তথা জা কাঞ্চন। সেই ঘটনা সারা দেশেই শোরগোল ফেলে। দীর্ঘ ন’-মাস ধরে আইনি লড়াই চলছে। অভিযুক্ত স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু আচমকাই নিকির শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সমঝোতার পথে হেঁটেছে তাঁর পরিবার। প্রথমত, নিকির সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিতে রাজি হয়েছে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। দ্বিতীয়ত, নিকির বোন কাঞ্চনের দাম্পত্যজীবনে শ্বশুরবাড়ি আর হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি স্বামীকে নিয়ে অন্যত্র পৃথকভাবে বসবাস করবেন। যদিও সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, খুনের মামলা আগের মতোই চলবে। কিন্তু ঘটনার মূল সাক্ষী কাঞ্চনের বয়ান এরপর শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে কতটা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের আত্মিক টান চিরন্তন হওয়া উচিত। তারপরেও এমন বহু ঘটনা ঘটে, যা এই চিরকালীন সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলে দেয়।
স্বাভাবিকভাবেই অভিযুক্ত শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে নিকির পরিবারের সমঝোতায় স্তম্ভিত আত্মীয়, প্রতিবেশীরা। প্রশ্ন উঠেছে, সন্তানের জীবনের চেয়েও কি পরবর্তী প্রজন্মের ভাল থাকা, স্বস্তিতে থাকা বেশি মূল্যবান? না কি যে গিয়েছে সে তো আর ফিরবে না। তার চেয়ে অপর সন্তান ও নাতির ভবিষ্যতের জন্য গুছিয়ে নেওয়াই শ্রেয়!
অর্থাৎ, সেই স্বার্থের সম্পর্ক। সন্তানের কাছে মা-বাবার অনেক রকম প্রত্যাশা থাকে। সেই প্রত্যাশা সমাজ থেকে আসে, কিংবা মা-বাবার অতীত-জীবন থেকে। অনেকেই নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের উপর চাপিয়ে দেন। এমনিতে মনে করা হয়, সন্তান পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে সেই নিদারুণ যন্ত্রণা বাবা-মাকে শোকে পাথর করে তোলে। বাহ্যিক বাকি সব সুখ-আহ্লাদ তাঁদের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। এখানে অবশ্য নিকির সন্তানের ভবিষ্যৎ যুক্ত। হতে পারে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা লাঘব করতে চেয়েছেন নিকির বাবা-মা। কিন্তু সেজন্য নিকির শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করার কি খুব প্রয়োজন ছিল? আইনি পথে নিকির মৃতু্যর সুবিচার মিলত না? এরপর তো অনেক বিত্তশালী পরিবারই অপরাধ করে টাকা দিয়ে এভাবেই দায়মুক্ত হতে চাইবে। প্রহসনে পরিণত হবে বিচার।
