শুক্রবার ভোরবেলা ঘোষিত কর্মসূচির বাইরে পা ফেলে ‘নমো’ ক্যামেরা হাতে গঙ্গায় নৌকবিহার করলেন এবং যাত্রা শেষে জড়িয়ে ধরলেন মাঝিকে। ভারতের এবং বিশেষ করে বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে নৌকাবিহার বা প্রেমের তাড়নায় কিংবা পেটের দায়ে নদীর জলে নৌকাযাত্রার অভাব নেই। ‘নমো’-র অকস্মাৎ গঙ্গাবক্ষে প্রভাতি নৌকাবিহার এই ভোটের বাজারে যে সম্পূর্ণ রাজনীতি-বর্জিত– এমন বিশ্বাসে কুণ্ঠার কাঁটা বিঁধে থাকতে বাধ্য। ঠিক ততটাই অনিবার্য হয়ে উঠেছে গঙ্গাবক্ষে ‘নমো’-র নৌকবিহারের সূত্রে বাঙালির মনে রাজনীতি-বর্জিত নৌকাযাত্রার আখ্যান।
নৌকাবিহার বলতেই বাঙালির মনে আসে বিদ্যাপতি আর চণ্ডীদাসের রাধাকৃষ্ণ এবং যমুনা নদী। কোথাও নেই রাজনীতির অনুষঙ্গ। প্রচারের ইশারা। বরং আছে বিশুদ্ধ প্রেমের তাড়না, আড়াল, গোপনীয়তা, ভয় এবং রাধার প্রশ্নহীন কৃষ্ণনির্ভরতা। অন্ধকার ঝড়ের রাত। যমুনার উপর নৌকায় রাধা। আর সেই রোম্যান্টিক জলযাত্রার মাঝি স্বয়ং কৃষ্ণ। রাধা কখনও মাঝিকে জড়িয়ে ধরেছেন ভয়ে, কখনও প্রণয়ে। পুরাণের নৌকাবিহার থেকে ইতিহাসের নৌকাবিহার– সেই একই যমুনায় নাচ-গান-বাইজি প্রমোদের বজরা ভাসিয়েছেন মুসলমান বাদশারা। সেই বিশুদ্ধ আমোদের কোথাও নেই কূটনীতির ছলচাতুরি।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে, এক অফুরান সৃজনশীল শহুরে বাঙালির প্রায় টানা ১০ বছর পদ্মানদীর বুকে তরণিজীবন। তিনি নিজের ইচ্ছায় সরে গিয়েছিলেন শহুরে জীবনের আরাম ও আনন্দ থেকে, প্রতিদিনের প্রচার ও প্রশংসা থেকে, আত্মসন্ধানের নিঃসঙ্গ নিবিড়তায় এবং সৃষ্টির শুদ্ধ সাধনায়।
যমুনায় বজরা ভাসিয়ে শাজাহান বেগমদের নিয়ে তাজমহল দর্শন করছেন মুগ্ধ মেদুরতায়, কিংবা মুর্শিদাবাদের গঙ্গায় ভাসছে নবাবের ময়ূরপঙ্খী– সবই কূটনীতির দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ বিলাসের। ইংরেজ আমলে গঙ্গার নৌকাবিহারে এল যুগান্তর: শুরু হল সাহেবি স্টিমার পার্টির নতুন ঢেউ। আর সাহেবদের স্টিমার পার্টির অনুকরণ করতে গিয়ে কলকাতার বাবুরা গঙ্গার বুকে যে বাড়াবাড়ি এককালে করেছেন, তার বর্ণনা আছে হুতোমের নকশায়: গঙ্গারও আজ চূড়ান্ত বাহার; বোট, বজরা, পিনেস (পানসি) ও কলের জাহাজ গিজগিজ কচ্ছে, সকলগুলি থেকেই মাতলামো, রং, হাসি ও ইয়ার্কির গররা উঠছে, কোনটিতে খ্যামটা নাচ হচ্ছে। তা হোক, কূটনীতির ছল ও চাতুরি কিন্তু কোথাও নেই।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে, এক অফুরান সৃজনশীল শহুরে বাঙালির প্রায় টানা ১০ বছর পদ্মানদীর বুকে তরণিজীবন। তিনি নিজের ইচ্ছায় সরে গিয়েছিলেন শহুরে জীবনের আরাম ও আনন্দ থেকে, প্রতিদিনের প্রচার ও প্রশংসা থেকে, আত্মসন্ধানের নিঃসঙ্গ নিবিড়তায় এবং সৃষ্টির শুদ্ধ সাধনায়। তাঁর যৌবনের অধিকাংশ কেটেছিল পদ্মার বুকে ভাসমান বজরায়। তিনি আমাদের রবীন্দ্রনাথ। পদ্মার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আত্মার। ছলনা নেই সেই পারস্পরিকতায়। আছে শুধু নিজেকে জানা ও প্রকাশের প্রণোদনা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’-র নায়িকা হতে পারত কুবেরের বউ মালা। কিন্তু মানিক উপন্যাসের পাপিষ্ঠা নায়িকা করলেন কুবেরের শ্যালিকা কপিলাকে। সে পালাতে চায়, কুবেরের সঙ্গে। মাঝি আমারে লইয়া যাইবা? তার আর্তি বাঙালির নৌকাবিহারের চিরন্তন চিত্রকল্পে ক্লেদজ কুসুমের সৌরভ ছড়িয়ে দেয় যেন।
