প্রযুক্তিব্যস্ত এক বিজ্ঞানী ব্যাকটেরিয়ার ক্রোমোজোম তৈরি করলেন ল্যাবে, তারপর অন্য একটি ব্যাকটেরিয়ার খোলে গুঁজে দিলেন ডিএনএ। দেখালেন ব্যাকটেরিয়া দিব্যি প্রজনন করছে। ইনি জন ক্রেগ ভেন্টার। প্রবাদপ্রতিম জিনোমিক্স গবেষক। দ্রুত ডিএনএ মানচিত্রের খসড়া তৈরির জন্য বিজ্ঞানে তঁার নাম লেখা থাকবে সোনার আখরে। প্রয়াত হলেন সম্প্রতি ৮০ বছর বয়সে। লিখছেন সুমন প্রতিহার।
পেনিসিলিনের খোঁজ তখনও মানুষ পায়নি। রাশিয়া ও ইউরোপ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে বঁাচতে, প্রকৃতির ফাজ ভাইরাসকে ব্যাকটেরিয়ার গায়ে বসিয়ে, তাদের কাবু করত। বিংশ শতকের মাঝামাঝি একজন বিজ্ঞানী অভিনব ভাবনায় তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। উনি দেখালেন, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হলে মিনিটখানেকের মধ্যে তার ‘ডিএনএ’ মানচিত্র পড়ে ফেলা সম্ভব। তারপর ডিএনএ-কে লক্ষ করে ফাজ ভাইরাস প্রোডাকশন। ভাইরাসগুলিকে ব্যাকটেরিয়ার গায়ে ছেড়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। কতক্ষণ লাগবে, বড়জোর একবেলা।
যঁার মাথায় পরিকল্পনার এমন ঘূর্ণাবর্ত, সেই মানুষটি মারা গেলেন– জন ক্রেগ ভেন্টার (১৯৪৬-২০২৬)। বিজ্ঞানের হাত ধরে কল্পজগতে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। ক্যানসারের ওষুধের পার্শ্বক্রিয়া যখন তঁার মরশরীর ঝঁাজরা করে দিল, দেহঘড়িতে বয়স তখন ৮০।
এয়ারপোর্টের ফেন্সিং ভেঙে হুড়মুড়িয়ে বাইক নিয়ে পৌঁছে যান রানওয়ের পাশে, উড়বে বলে দৌড়তে থাকা প্লেনের সঙ্গে রেস টানতে। কিশোর বয়সের ভেন্টার এমনই দামাল। সুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপ, বাইচ প্রতিযোগিতা হলেই নাম দেওয়া চাই। আর সি-সার্ফিং? ওটায় যৌবনের কিছু শ্বাস জমা রেখেছিলেন যেন। ভিয়েতনামে সৈন্যবাহিনীতে কর্তব্যরত ভেন্টার একদিন দমশেষ সঁাতরে পৌঁছলেন দক্ষিণ চিন সমুদ্রের গভীরে, ইচ্ছা– জীবন শেষ করবেন এখানে, সমুদ্রে খবর হল, সাপ থেকে হাঙর দেখতে এল প্রত্যকে। প্রথমে রেগে গেলেও ভয়ও পেলেন, ফিরলেন। এমন ছেলেরই বিজ্ঞান হয়। হয় মানে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ৩ বছরে ২১টি গবেষণা প্রকাশ করে ডক্টরেট ডিগ্রি দখল করলেন। ওই একবারই! বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অত কম দিনে ডক্টরেট দেওয়া সম্ভব হয়নি আর।
ভেন্টারের কোনও ভাবনাই ছেঁড়াখোঁড়া করা নয়। ভাইরাস সংক্রমণ হলে, তাকে চিনে, ভ্যাকসিন তৈরি করতে আমেরিকার মোটামুটি ৩৫ দিন সময় লাগে। ভেন্টার বললেন: ধুর, ৫ দিনই যথেষ্ট।
বলিহারি সব কাণ্ড ঘটিয়েছেন ভেন্টার। তঁার বিশ্বাস ‘ডিজিটাল বায়োলজি’-তে, বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। একবার বলে বসলেন, জীবন তৈরির জন্য ঈশ্বরের কী প্রয়োজন। প্রযুক্তিব্যস্ত বিজ্ঞানী ব্যাকটেরিয়ার ক্রোমোজোম তৈরি করলেন ল্যাবে, তারপর অন্য একটি ব্যাকটেরিয়ার খোলে গুঁজে দিলেন ডিএনএ। দেখালেন ব্যাকটেরিয়া দিব্যি প্রজনন করছে। ভেন্টার দেখাচ্ছেন দিশা, বাকিরা দিশাহারা। তঁারা প্রশ্ন তুলছেন নীতির, বলছেন ভেন্টরের পরীক্ষার ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো নয়। বিজ্ঞানের থিওরি বলে এটাই তো হওয়ার, রাসায়নিকভাবে ডিএনএ তৈরির প্রয়োজনীয়তা কী! থোড়াই কেয়ার।
ভেন্টারের কোনও ভাবনাই ছেঁড়াখোঁড়া করা নয়। ভাইরাস সংক্রমণ হলে, তাকে চিনে, ভ্যাকসিন তৈরি করতে আমেরিকার মোটামুটি ৩৫ দিন সময় লাগে। ভেন্টার বললেন: ধুর, ৫ দিনই যথেষ্ট। আবার হঠাৎ আর-একটা ভাবনা ভেন্টারের মাথায় গুমরাতে থাকে। জীবনের জন্য নূ্যনতম ক’টি জিন প্রয়োজন। প্রশ্নটিই বেয়াড়া। ভঁাজ পড়া কপালে– এসব প্রশ্নের পিছু ধাওয়ার শক্তিসাহস ভেন্টারেই সাজে। যে-সময় ভাবনা আরম্ভ হল, সেই বিস্ফোরণের বিন্দুটি থেকে ভেন্টার সব দেখতে পান। অনুমিত কল্পনা নিয়ে দেখেন খুব শুরুতে, তারপর খুঁজে খুঁজে একদিন লক্ষ্যটি পেয়ে যান। সে দেখা আসে প্রমাণটি হাতে নিয়ে। এসে দঁাড়ায় প্রত্যেকের সামনে। ভেন্টার দেখালেন– জীবনের জন্য প্রয়োজন ৪৭৩টি জিন, যার মধ্যে ১৪৯টির কাজ অজানা। ১৯৯৫ সালে স্বাধীনভাবে বেঁচেবর্তে থাকা ব্যাকটেরিয়া, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েনজি-র জিন মানচিত্র পড়ে ফেলেন। তারপর থেকেই হুড়ুদ্দুম সব ভাবনা। নতুন চিন্তাসমূহ ড্রপ না খেলেই মনখারাপ হয়ে যায় তঁার।
১৯৯৮ থেকে ‘ব্যাড বয়’ তকমাটি ভেন্টারের আগে জুড়ে যায় উপাধি হয়ে। ১৯৯০ সালে আমেরিকার ‘ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি’ এবং ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’ ঘোষণা করে– মানুষের সম্পূর্ণ জিন মানচিত্র প্রকাশ করবে।
৬৭ বছরের জন্মদিনে লিখলেন চমৎকার একখানি বই– ‘লাইফ অ্যাট দ্য স্পিড অফ লাইট: ফ্রম দ্য ডাব্ল হেলিক্স টু দ্য ডন অফ ডিজিটাল লাইফ’। জীবন হোক বা জিন, গতি চান আলোর। হিদার কোয়ালস্কি, জিনোমিক্স বিজ্ঞানী, কোম্পানি দেখভাল করতেন, ২০০৮ থেকে নিলেন ভেন্টারের মন দেখভালের অতিরিক্ত দায়িত্ব। তঁাদের বুদ্ধিমান ছটফটে কুকুরের ডাকনাম আবার ‘ডারউইন’।
১৯৯৮ থেকে ‘ব্যাড বয়’ তকমাটি ভেন্টারের আগে জুড়ে যায় উপাধি হয়ে। ১৯৯০ সালে আমেরিকার ‘ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি’ এবং ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’ ঘোষণা করে– মানুষের সম্পূর্ণ জিন মানচিত্র প্রকাশ করবে। সময় ১৫ বছর, আনুমানিক খরচ ৩ বিলিয়ন ডলার। ভেন্টার তত দিনে ডিএনএ মানচিত্র দ্রুত পড়ে নেওয়ার শটগান পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। প্রতিষ্ঠা ককরেছেন নিজের কোম্পানি ‘সেলেরা জিনোমিক্স’। সরকারি মানব জিনোম প্রকল্পের দায়িত্বে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’-এর ডাইরেক্টর ফ্রান্সিস কলিন। ভেন্টর বলছেন, শর্টগান পদ্ধতি ব্যবহার করলে মাত্র ৩ বছরেই কাজ সম্ভব। ভেন্টারের প্রস্তাবে চাপ বাড়ল সরকারি পরিকল্পনায়, কিছুটা বাধ্য হয়ে নেওয়া হল ভেন্টারের প্রযুক্তি।
ভেন্টার লাগাতার ডিএনএ সিকোয়েন্সিং জমা করেন। ১৯৯৮ সালে এসে দুই কঁাধের ঠোকাঠুকি অহরহ। আগুন ঝরে। ২০০০ সালে, হোয়াইট হাউসের পুব দিকের একটি ঘরে, বিল ক্লিনটনের সাথে করমর্দন, ছবি ছাপা হল ভেন্টারের। সাক্ষাৎকারে বললেন– তঁার পছন্দ দু’টি– জিন আর বোট। মানব জিনোমের প্রথম খসড়া প্রকাশ করলেন দু’জনে, সময়ের বছর তিনেক আগেই। ২০০১ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, ফ্রান্সিস কলিন ও ভেন্টারের ছবি। ২০০৭– ‘হোল জিনোম শর্টগান’ পদ্ধতিতে– ভেন্টার নিজের সম্পূর্ণ ডিএনএ মানচিত্র প্রকাশ করলেন। তাজ্জব সব রকম। ভাবনা কিলবিলিয়ে উঠলে ভেন্টার গিয়ে দঁাড়ান ঘড়ির তলায়, শুরু হয় রেস।
১৯৪৪ সালে একখানি বই লিখেছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আরভিন শ্রডিংগার– ‘হোয়াট ইজ লাইফ: দ্য ফিজিক্যাল অাসপেক্টস অফ লিভিং সেল’। ভেন্টারের মনে হয়েছিল– এটা তো প্রশ্ন, উত্তর যে তঁাকেই দিতে হবে। উত্তর দিলেন– ‘লাইফ ইজ ডিএনএ সফটওয়্যার সিস্টেম’। বিজ্ঞানী ক্লদ বার্নাডের একটা লব্জ ক্রেগ ভেন্টারের ভারী পছন্দ ছিল: ‘আর্ট ইজ আই, সায়েন্স ইজ উই।’ বলতেন বটে, তবে মানতেন না বোধহয়।
(মতামত নিজস্ব)
