যৌনতার যে-ধারণা সরাসরি প্রজননের সঙ্গে যুক্ত নয়; তার চারপাশে বরাবরই কুহক তৈরি করেছে সমাজ ও প্রতিষ্ঠান। এবং রূপান্তরকামী মানুষরা বরাবরই এই সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মূল স্রোতের বিপ্রতীপে গড়ে তুলতে চেয়েছে স্বতন্ত্র জীবনস্পন্দন। দেহ-মনের ঐচ্ছিক স্রোতের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হয়েছে ক্যুইয়ার মানুষরা। কখনও রাস্তায়, কখনও কর্মক্ষেত্রে চায়ের আড্ডায়। এবার তাতে পড়ল আইনি সিলমোহর। লিখছেন শুচিস্মিতা দাস।
‘ক্লসেট’ (closet)। এই শব্দটি সাধারণত বাড়ির ভিতরের একটি বদ্ধ, ব্যক্তিগত জায়গাকে বোঝাতে ব্যবহার হয়। কিন্তু মানুষের পরিচিতির ক্ষেত্রে এই শব্দটি যখন বসে, তখন শুধু একটি স্থান নয়, বরং এক গভীর সামাজিক ও মানসিক অবস্থাকে চিহ্নিত করে। নিজের যৌনতা বা লিঙ্গ-পরিচয়কে ‘ক্লসেট’, অর্থাৎ আড়াল, করে রাখার অর্থ হল– এক ধরনের বাধ্যতামূলক নীরবতা, যা ব্যক্তির নিজের পছন্দের চেয়ে সামাজিক চাপেই বেশি নির্ধারিত হয়।
এক বন্ধুর মুখে শুনেছি– সে ‘ক্লসেটেড গে’।
আর-একজন রূপান্তরকামী মানুষের থেকে জানা, কীভাবে তাদের অনেককেই নিজের লিঙ্গ-পরিচয়কে প্রতিনিয়ত গোপন রাখতে হয়– যেন প্রতিদিনের যাপন চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই গোপনীয়তাই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। যারা ‘শরীরে পুরুষ কিন্তু মননে নারী’ বা ‘শরীরে নারী কিন্তু মননে পুরুষ’– তাদের জন্য এই ‘ক্লসেট’ বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং প্রতিমুহূর্তের বাস্তবতা। কাজ করা, চলাফেরা করা, সামাজিক কাঠামোয় টিকে থাকা– সবই করতে হয় নিজের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে। এই আড়ালই তাদের বেঁচে থাকার শর্ত।
এমন প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক আইনগত পরিবর্তনগুলি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২৪ মার্চ লোকসভায় পাশ হওয়া নতুন বিল– যা কার্যত স্ব-লিঙ্গ নির্ধারণের স্বাধীনতাকে খর্ব করে– রূপান্তরকামী মানুষদের জীবনে এক নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছে। আগে যেখানে ব্যক্তি নিজের লিঙ্গ-পরিচয় নিজেই নির্ধারণ করতে পারত, এখন সেখানে বাধ্যতামূলক মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশ প্রয়োজন। এই বোর্ড, যার নেতৃত্বে থাকবেন চিফ মেডিক্যাল অফিসার, আবেদনকারীর শরীর পরীক্ষা করে সুপারিশ করবে, এবং সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই জেলা প্রশাসন পরিচয়পত্র প্রদান করবে।
আর-একজন রূপান্তরকামী মানুষের থেকে জানা, কীভাবে তাদের অনেককেই নিজের লিঙ্গ-পরিচয়কে প্রতিনিয়ত গোপন রাখতে হয়– যেন প্রতিদিনের যাপন চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই গোপনীয়তাই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
আইনি পরিভাষার কেজো সমস্যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি গভীর ঐতিহাসিক প্রশ্ন–
যৌন-পরিচয়কে শরীরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দেখা। নাগরিকত্বের পাশাপাশি মানুষের মন ও অভিজ্ঞতা, তার আত্মপরিচয়ের অনুভূতি– সবকিছু অগ্রাহ্য করে শরীরই হয়ে ওঠে একমাত্র মানদণ্ড। এই ধারণা শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে সীমাবদ্ধ নয় বরং মানবাধিকারের প্রশ্নেও উদ্বেগজনক।
এ বিল পাশ হওয়ার পর থেকেই প্রতিবাদের বেগুনি ঢেউ উঠেছে সারা দেশে। কলকাতায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, নন্দন চত্বর, এমনকী শহরের প্রান্তিক এলাকায় রূপান্তরকামী মানুষ ও তাদের সহযোদ্ধারা পথে নেমেছে। এই প্রতিবাদ শুধু আইনের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে, যা মানুষের যৌনতা, ইচ্ছা এবং কামনাকে তার জন্মনির্ধারিত লিঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দেয়। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন স্তরেও এর প্রভাব স্পষ্ট। বহু রূপান্তরকামী মানুষ পছন্দমতো নাম ব্যবহার করে– যে নামে তারা পরিচিত হতে চায়। কিন্তু নতুন প্রশাসনিক কাঠামো সেই নামকেই প্রশ্নের মুখে দঁাড় করাচ্ছে। অনেকেই নিজের পরিচয়ে ‘they’ সর্বনাম ব্যবহার করে, কিন্তু সেটিও স্বীকৃতি পেতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
এর মধ্যেও রয়েছে বহুস্তরীয় প্রান্তিকতা। ধর্ম, শ্রেণি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে রুপান্তরকামিতার বৈষম্য আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষত গোঁড়া ধর্মাবলম্বী সমাজের ক্যুইয়ার মানুষরা অনেক সময় দ্বিগুণ প্রান্তিকতার শিকার হয়– একদিকে রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে বৃহত্তর সমাজের বৈষম্য। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় রূপান্তরকামী মানুষের জন্য বরাদ্দ জমির উদাহরণ এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। তারা সেই জমিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে, কিন্তু এখন সেই জমির মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভবিষ্যতে তাদের ‘ইতিবাচক বৈষম্যমূলক’ সুবিধাগুলি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
২০১৮ সালে সমকামীদের বৈধতা দেওয়ার পর আশার আলো দেখিয়েছিল কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, যদিও সেগুলিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। উদাহরণস্বরূপ ‘গরিমা গৃহ’ আশ্রয়কেন্দ্রগুলি রূপান্তরকামী মানুষদের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলার একটি চেষ্টা লক্ষ করা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়– এই পুনর্বাসন কি সত্যিই ক্ষমতায়ন, না কি আবারও এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে তাদের স্থাপন করা? একইভাবে, কর্পোরেট কর্মক্ষেত্রের স্তরেও কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে। অনেক বেসরকারি সংস্থা এখন তাদের নীতিতে ‘যৌন অভিমুখিতা’ এবং ‘লিঙ্গ-পরিচয়’কে বৈষম্যবিরোধী কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করছে। ভাষার ব্যবহারেও পরিবর্তন আসছে: লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শব্দচয়ন, ‘they’ সর্বনামের স্বীকৃতি, কিংবা সমলিঙ্গের সঙ্গীদের জন্য কর্মক্ষেত্রের সুবিধা (যেমন: স্বাস্থ্যবিমা) সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ শৌচাগারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এ বিল পাশ হওয়ার পর থেকেই প্রতিবাদের বেগুনি ঢেউ উঠেছে সারা দেশে। কলকাতায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, নন্দন চত্বর, এমনকী শহরের প্রান্তিক এলাকায় রূপান্তরকামী মানুষ ও তাদের সহযোদ্ধারা পথে নেমেছে।
এ উদ্যোগগুলির লক্ষ্য– কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তন; যাতে কর্মক্ষেত্রে ক্যুইয়ার সহকর্মীদের প্রতি যে সামাজিক কলঙ্ক বা অস্বস্তি কাজ করে, তা ধীরে ধীরে কমে আসে। তবে এই পরিবর্তনগুলি কখনওই সর্বত্র সমানভাবে কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে এগুলি সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে শহুরে, সচ্ছল বা নির্দিষ্ট কিছু সীমিত কর্পোরেট কিংবা অ্যাকাডেমিক পরিসরে। বৃহত্তর সমাজে, বিশেষত প্রান্তিক অঞ্চলগুলিতে, রূপান্তরকামী মানুষদের বাস্তবতা এখনও অনেক বেশি অনিশ্চিত ও সংকটপূর্ণ।
‘দোলাচল’ শব্দটি আধুনিক জীবনে বহুল ব্যবহৃত, এর মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্যোতনা। এই দোলাচল কখনও প্রশ্ন করেছে রূপান্তরকামী মানুষের দেহ, বাসনা, গলার স্বর বা পোশাককে। এই দোলাচল বারবার তারা বয়ে নিয়ে চলেছে– ঘরে, পাড়ায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা অফিসে। ‘নাগরিকত্ব’ শব্দটিও একমাত্রিক নয়। নাগরিকত্বের পরিচিতি মানে কি দেশ, ধর্ম না কি শরীরের পরিচয়? সভ্যতা ও প্রকৃতির পুরনো লড়াইয়ে রাষ্ট্র বারবার পায়ে বেড়ি পরাতে চেয়েছে স্বাধীন ইচ্ছার। মানুষের ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সর্বোপরি পরিচয়ের। শরীরের বাধ্যতামূলক বীক্ষণ কোথাও আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে মানবমনের ওপর সেই একরৈখিক যুক্তিবাদের নিয়ন্ত্রণ। নানা ভাষা, নানা মতের ভূমিও সেই হরেক রং হারিয়ে এখন নিষ্ফলা হতে বসেছে। আইনের দ্বারা রুদ্ধ হয়েছে তার স্বাধীন কণ্ঠ। রূপান্তরকামী মানুষরা বরাবরই পরিবার বা সমাজের মূল স্রোতের বিপ্রতীপে গড়ে তুলতে চেয়েছে একটি স্বতন্ত্র জীবনস্পন্দন। আর্থিক বা শ্রম-স্বনির্ভরতা তাদের জীবনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রান্তিক মানুষদের স্বক্ষমতাকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা যায়– শ্রমগত ও প্রজননগত। যৌনতার যে-ধারণা সরাসরি প্রজননের সঙ্গে যুক্ত নয়; তার চারপাশে বরাবরই কুহক তৈরি করেছে সমাজ। শরীর বীক্ষণের এই বদ্ধমূল ধারণাও এইখান থেকেই উঠে আসে। দেহ-মনের ঐচ্ছিক স্রোতের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন হয়েছেন ক্যুইয়ার গোষ্ঠীর মানুষ রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে চায়ের আড্ডায়। এবার তাতে পড়েছে আইনি সিলমোহর। উদ্বেগ এই যে, পরিবারতন্ত্রের মতো এবার কর্মক্ষেত্রেও ঘনীভূত হবে লজ্জা। আরও সংকীর্ণ হবে তাদের পরিসর। জটিলতা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ‘পেশাগত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ বিধি, ২০২০’-র ধারা ২৩(২) অনুযায়ী, রূপান্তরকামী কর্মীদের জন্য পৃথক ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক, বাস্তবে এই নির্দেশনার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ।
একজন ক্যুইয়ার বন্ধুর থেকে শোনা, ২০২৬ সালের আইন পাশের পর অফিসগুলিতে শৌচালয় ব্যবহারের মতো একটি মৌলিক প্রয়োজনও হয়ে উঠছে বিতর্কের বিষয়! ২০১৪ সালে সমকামিতা আইনি বৈধতা পাওয়ার পর রেনবো আন্দোলনের একটি শক্তিশালী ঢেউ তৈরি হয়েছিল দেশের নানা জায়গায়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ জীবনের। কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় সেই প্রতিশ্রুতিগুলিই যেন পুনরায় প্রশ্নের মুখে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, বাসন্তী দেবী কলেজ
dassuchismita04@gmail.com
