মানুষে-মানুষে নয়, মাছে-মানুষে। এ গল্প জাপানের একজন স্কুবা ডুবুরির সঙ্গে গভীর সমুদ্রের একটি ‘কবুডাই’ প্রজাতির মাছের বন্ধুতার। সখ্য এমনই মোলায়েম যে, দু’জনেই অপেক্ষা করে একে অপরের জন্য– আবার কবে, কখন, কোথা হবে দেখা! মায়ায় লেপ্টে, ভালবাসায় ভিজে যায় পৃথিবীর দুই পিঠের দুই প্রাণ। লিখছেন, সুমন প্রতিহার।
হিরোয়ুকি আরাকাওয়া থাকেন জাপানে। পেশায় স্কুবা ডুবুরি। ডুব দিতে ভারি ভাল লাগে তাঁর। জলমহল নতুন পৃথিবী, অন্য জগৎ। প্রতিদিন ডুব দেন, তিনি একা, জল আঁধারিতে শিন্টো প্রার্থনাঘরের পবিত্রতা রক্ষা করেন হিরোয়ুকি। ২ হাজার বছর আগে জাপানের জন্ম নিয়েছিল এক বিশ্বাস। প্রকৃতির প্রতিটা স্পন্দনে রয়েছে আত্মা, কামি। শিন্টো-রা কামিদের ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে।
টোকিও সৈকত ছেড়ে সমুদ্রের খানিক গভীরে ইঞ্জিন থামিয়ে দেন হিরোয়ুকি, স্কুবা পোশাক পরা থাকে, মাথায় হেলমেট গলিয়ে ঝাঁপ। ক্রমশ গভীর হয় জল, সূর্যের আলো জলে গুলে রঙিন, ওখানে রয়েছে শিন্টো প্রার্থনাঘরের দ্বার। ১৮ বছরে হিরোয়ুকির প্রথম ডুব। তারপর আর হিসাব রাখেননি। বয়স যখন পঞ্চাশের কোঠায়, এক ডুবে হঠাৎ দেখা, আলু-মাথা একটি মাছের! বিজ্ঞান অবশ্য বলে– শিপহেড রাসে (sheephead wrasse)। এটাই হতে পারত কোনও অণুগল্পের প্রধান চরিত্রের প্রথম দেখা, যদি না সেটা মহাকাব্যিক রূপ নিত।
জাপানিরাও এই মাছ চেনে, তবে ‘কবুডাই’ নামে ডাকে। হিরোয়ুকি অবশ্যি তার দেখা কবুডাইয়ের নাম দিয়েছেন ‘ইয়োরিকো’। স্কুবা ডুবুরির পোশাকে হিরোয়ুকি আগেই দেখেছিলেন এই মাছ। পরে একদিন ডুবশেষে ওঠার সময় দেখেন ইয়োরিকো আহত, এতটাই, যে, নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারছে না। বেজায় অস্বস্তিতে পড়লেন হিরোয়ুকি, মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। জল থেকে উঠলেন তবু, ইয়োরিকো কী খাবে, চিন্তাটা রইল মাথায় ঘোলাটে হয়ে। ভাবলেন। ভেজা পোশাকে লাগালেন আরও এক ডুব। কাঁকড়া ভেঙে, ঝিনুক ছিঁচে ছোট ছোট মণ্ড করে খাওয়ানো শুরু। মাছ তো আবার একবারে খেতে পারে না। একবার-দু’বার নয়, দিনে তিনবার বোট নিয়ে চললেন হিরোয়ুকি। ইঞ্জিন বন্ধ করে ঠাহর করলেন কোথায় রয়েছে তাঁর ইয়োরিকো। তারপর আবার মুখোমুখি, নিজের হাতে খাইয়ে আসা। এরকম চলল পাঁচ দিন। এবার খানিক সুস্থ ইয়োরিকো, নিজে খুঁজে নিচ্ছে খাবার। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন হিরোয়ুকি।
হিরোয়ুকি নিজের কাজের প্রয়োজনে ফিরে ফিরে যান জলে, প্রথমটা ঠাহর করতে না পারলেও পরে নিশ্চিত হন, প্রতিদিন কেউ পিছু নিচ্ছে তাঁর। এবারে চমকে যাওয়ার পালা। এ তো সেই আহত মাছ, যাকে তিনি পাঁচ দিন খাইয়েছেন! হিরোয়ুকি নাম রাখলেন ইয়োরিকো।
‘কবুডাই’ মাছের আচরণ এই প্রথম অবাক করল এমনটা নয়, বিজ্ঞানীদের বেজায় ভাবিয়েছে কবুডাই। শিপহেড রাসে মাছের বাড়ি প্রশান্ত মহাসাগরের ঠান্ডা জলে। শরীরে গোলাপি, কমলা রঙের আভা। রঙিন এই মাছ দেখতে যেতে হবে জাপান-কোরিয়া-চিনে। তবে বিস্ময়ের বিষয় হল, জন্মায় সব মাছ মেয়ে হয়ে, ছেলে নেই! এমন মহিলা মহলে পুরুষের আবির্ভাব হওয়াটাই বিস্ময়, দলের নেতৃত্ব থাকা মস্তান পুরুষ মারা গেলে, সবচেয়ে বড় স্ত্রী মাছটি ধীরে ধীরে পুরুষে রূপান্তরিত হয়। ডিম্বাশয় বদলে যেতে থাকে শুক্রে, মাথায় ফুলে ওঠে ঢেলা, বেশ গোলাপি তার রং। পরিণত পুরুষ হয়েই দল দখলের লড়াই শুরু। দলের সমস্ত মেয়ে মাছের অধিকার সমঝে নেওয়াই তার মস্তান হয়ে ওঠার কারণ। সমুদ্র যাদের ঘর, তাদের প্রায় ৫০০টি মাছ এমন করে নিজেদের লিঙ্গ বদলে ফেলতে পারে। জন্মের পরেই যাদের একটি প্রাথমিক পরিচিতি মেয়ে, সুযোগ পেলে পুরুষজন্ম, তাদের বিজ্ঞানীরা চেনে, তারা প্রোটোগাইনাস। ইয়োরিকো ছেলে মাছ। তবে ইয়োরিকোর কাণ্ড বাকি এখনও।
হিরোয়ুকি নিজের কাজের প্রয়োজনে ফিরে ফিরে যান জলে, প্রথমটা ঠাহর করতে না পারলেও পরে নিশ্চিত হন, প্রতিদিন কেউ পিছু নিচ্ছে তাঁর। এবারে চমকে যাওয়ার পালা। এ তো সেই আহত মাছ, যাকে তিনি পাঁচ দিন খাইয়েছেন! হিরোয়ুকি নাম রাখলেন ইয়োরিকো। মাছ কি তবে মানুষ চেনার স্মৃতি ধারণ করে? বিজ্ঞান প্রায় সমস্ত সম্ভাবনাকে উল্টে দেখে, পাল্টে দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান বলছে, মাছের মানুষের মুখ চেনার তাজ্জব ক্ষমতা রয়েছে। দু’টি মুখকে আলাদা করতে পারে। ২০১৬-তে সায়েন্টিফিক রিপোর্ট জার্নালে প্রকাশিত মাছ নিয়ে গবেষণায় জানা গিয়েছিল, আর্চার মাছ দু’টি মানুষের মুখকে আলাদা চিনতে পারে। আর-এক গবেষণা বলেছিল, মাছেরা নিজেদের পরিবেশ চেনে ভাল। মাছেরা নাকি তাদের সামাজিক কাঠামোটাও বুঝতে পারে, প্রয়োজনে কিছু সমস্যা সমাধান করেও তাক লাগিয়ে দিতে পারে। মাছেদের বোকা ভাবাটাই বোকামি। ইয়োরিকো বোকা নয়, মানুষ চেনার স্মৃতি সে মাথায় রাখতে পারে।
দলের নেতৃত্বে থাকা মস্তান পুরুষ মারা গেলে, সবচেয়ে বড় স্ত্রী মাছটি ধীরে ধীরে পুরুষে রূপান্তরিত হয়। ডিম্বাশয় বদলে যেতে থাকে শুক্রে, মাথায় ফুলে ওঠে ঢেলা, বেশ গোলাপি তার রং। পরিণত পুরুষ হয়েই দল দখলের লড়াই শুরু। দলের সমস্ত মেয়ে মাছের অধিকার সমঝে নেয় সে।
হিরোয়ুকি এবার ইয়োরিকোর বন্ধুত্বের প্রমাণ চান। একই সময়ে সমুদ্রে ডুব না দিয়ে, ডুবলেন নানা সময়। প্রতিবার হিরোয়ুকির উপস্থিতি টের পেলেই পিছু নিচ্ছে ইয়োরিকো। এভাবে মায়ায় লেপ্টে, ভালবাসায় ভিজে যায় জলের দুই পিঠের দুই প্রাণ। ইয়োরিকোর সঙ্গে কাটানো সময়টুকু জন্যই হিরোয়ুকির সূর্যের অপেক্ষায় থাকেন। আলো ফুটলেই বোট নিয়ে সমুদ্রের মাঝে ইঞ্জিন থামে, স্কুবা পোশাকে ডুব। বাকি দিন ক্রমে ক্লান্ত হয়, বড় বড় রাত আসে, হিরোয়ুকির অপেক্ষা চলে। ইয়োরিকো এখন শিন্টো মন্দিরের আশেপাশেই থাকে। হিরোয়ুকির শব্দ পেলেই সাঁতরে আসে, তৈরি হয় দুই বন্ধুর মায়াবি পৃথিবী। খোলা সমুদ্রের মাছেরা মানুষ এড়িয়ে চলে, ইয়োরিকো তেমন নয়। হিরোয়ুকিকে পেলেই হল তার। কাছে আসবে, গা ঘষে চলে যাবে, খাবারের জন্য হ্যাংলা হবে। আরও কত নতুন নতুন খুনসুটি।
এমন করেই চলে যায় ৩০টি বছর। এখন হিরোয়ুকি ৮০। কবুডাই মাছেরা ২০ থেকে ৩০ বছর বাঁচে, কেউ কেউ বা ৪০। ইয়োরিকোর বয়স হয়েছে, খোলা সমুদ্রের প্রতি দিনকার চ্যালেঞ্জ আর ক’-দিন বলা যায় না। হিরোয়ুকি এখনও প্রায় ইয়োরিকোর মাথার গোলাপি ডেলায় চুমু খান। বিজ্ঞান অবশ্য জানে না, চুমুই কী তবে দুই বন্ধুকে একটু একটু সবুজ করে দিচ্ছে!
