shono
Advertisement
Viral

ভাইরালের উড়াল

ইউটিউবে প্রথম ‘ভাইরাল’ ভিডিও কোনটি?
Published By: Biswadip DeyPosted: 02:54 PM Mar 11, 2025Updated: 02:54 PM Mar 11, 2025

সামাজিক মাধ্যমে প্রথম ‘ভাইরাল’ পোস্টের শিরোপা জিতে নিয়েছিলেন কে? উত্তর মেলে না। ইউটিউবে প্রথম ‘ভাইরাল’ ভিডিও কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরও অধরা থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, সর্বাধিকবার দেখা ভিডিও মানেই সেটি ‘ভাইরাল’ নয়। লিখলেন অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

Advertisement

মাসখানেক আগের ঘটনা। বাসে আমার উল্টোদিকের সিটে বসে দু’জন। দু’জনেই মধ্যচল্লিশ। একজন প্রায় এলিয়ে পড়েছেন বলা চলে। মুহুর্মুহু কাশছেন। নিজের কপালে হাত রেখে কিছু একটা মাপার চেষ্টা করে চলেছেন। আর, পাশে বসা মানুষটি ক্রমাগত হেসে চলেছেন। এক হাতের মুঠি দিয়ে অন্য হাতের তালুতে ঘুসি মারছেন একটু পরেই। ফের হাসছেন। কাশির দমকে বিরক্ত হয়ে পাশে বসা, এলিয়ে পড়া, মানুষটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার হলটা কী?’ রুগ্‌ণ মানুষটি উত্তর দিলেন, ‘ভাইরাল।’

এবারে তিনি কোনওমতে কাশি সামলে নিয়ে পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারই-বা কী হয়েছে? এত আনন্দ, উত্তেজনার কারণ?’ উনি নিজের মোবাইলের দিকে চেয়ে, একগাল হেসে উত্তর দিলেন, ‘আমারও ভাইরাল। তিন দিন আগে পোস্ট করা ফেসবুকের রিল এক হাজার ভিউ পেরিয়েছে এইমাত্র।’

ওই দুই সহযাত্রীর পরের কথোপকথন আরও রোমাঞ্চকর।

–আপনি কী করে জানলেন ‘ভাইরাল’ হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছেন? সামান্য কাশি-জ্বর হলেই তা ‘ভাইরাল’ না কি? জ্বর ১০২ ছাড়ালে ভাইরাল হয়।

–আপনি কী করে জানলেন আপনার পোস্ট ‘ভাইরাল’ হয়েছে? সামান্য হাজার ভিউতেই তা হয় না কি? এক লক্ষ ভিউ আর এক হাজার শেয়ার হলে তা ভাইরাল হয়।

–আপনি কি আমার থেকে বেশি জানেন? থামুন তো মশাই।

–আপনি কি নিজেকে সবজান্তা বলে মনে করেন? নামুন তো মশাই।

যে-যার গন্তব্যে নেমে যাওয়া না-পর্যন্ত তঁাদের মধ্যে এরপরে বিরাজ করেছিল স্তব্ধতা।
দু’জনের মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল একে অন্যকে তির্যকভাবে দেখার প্রতিযোগিতা। বাসের অন্য যাত্রীরা হেসে কুপোকাত।

শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে বড় হয়েছি যত, নতুন শব্দ রোজনামচায় যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি, এক শব্দের চিরাচরিত অর্থর ঘাড়ে চেপে বসেছে নতুন মানে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। স্কুলজীবনে কপি বললে ফুলকপি, বঁাধাকপি, ওলকপি বাদ দিলে শুধু খাতার কথাই বুঝতাম। সেই কপি-ও যে হার্ড কিংবা সফ্‌ট হয়, কম্পিউটারের আগমনে জেনেছি। ‘ভাইরাল’ কথাটি উচ্চারিত হলে এখন স্টেথোস্কোপ মুখ লুকোয়। জেগে থাকে মোবাইল। ‘বাইনারি’ দুনিয়ার ‘ভাইরাল’ শব্দটি কবে প্রথমবার শুনেছিলাম, তা মনে পড়ে না আর।

মজার বিষয় হল, ‘ভাইরাল’ শব্দটির কোনও যুক্তিযুক্ত সংজ্ঞাই নেই। বেশ কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদের সঙ্গে কথা বললাম এ বিষয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, “‘ভাইরাল’ কারে কয়?” খোঁজ নিলাম আন্তর্জালেও। কোনও সঠিক উত্তর নেই। একজন বলেছিলেন, ‘ভাইরাল হওয়া আসলে একটি বোধ। আত্মতৃপ্তি। নিজেই নিজের জামার কলারটা তুলে ধরা, সোশ্যাল মিডিয়ায়। কোনও সংখ্যার শিকলে একে বেঁধে ফেলা যায় না।’ একটি ওয়েবসাইট বলল, “ফেসবুকে ভরে দেওয়া কোনও পোস্টের যদি ১০ লক্ষ ভিউ কিংবা শেয়ার হয়, তাহলে সেটিকে ‘ভাইরাল’ বলা যেতে পারে। একই শর্ত প্রযোজ্য ইউটিউবে আপলোড করা কোনও ভিডিওর ক্ষেত্রেও। তবে ১০ লক্ষ ভিউ ছাড়িয়ে যাওয়া দরকার খুব কম সময়ে।” কিন্তু এই ‘কম’ সময়েরও কোনও সংজ্ঞা নেই। ওয়েবসাইট বদলে গেলে ভাইরাল হওয়ার পরিসংখ্যানও বদলে যায়। বাস্তবের সঙ্গে এই সংখ্যার বিস্তর ফারাক। খবরের কাগজে কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলে আমরা যেসব খবরের ভাইরাল হওয়ার কথা শুনি, তার শেয়ার কিংবা ভিউয়ের সংখ্যা এর ধারে-কাছেও যায় না। কিন্তু ‘ভাইরাল’ হয়। শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রহস্য সহসা থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমাকে শুধু ভোগ করো। গবেষণা করার দরকার নেই।’

সামাজিক মাধ্যমে প্রথম ভাইরাল পোস্টের শিরোপা জিতে নিয়েছিলেন কে? উত্তর মেলে না। ইউটিউবে প্রথম ভাইরাল ভিডিও কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরও অধরা থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, সর্বাধিকবার দেখা ভিডিও মানেই সেটি ভাইরাল নয়। কত অল্প সময়ের মধ্যে ভিডিওটি কতবার দেখা হয়েছে এবং শেয়ার করা হয়েছে, সেটাই ভাইরাল লেখা সিঁড়িতে চড়ার মাপকাঠি। দু’টি নমুনা দেওয়া যাক।

নমুনা এক। ভুবনবিখ্যাত কোনও পরিচালকের অস্কার জয় করা চলচ্চিত্র গত ৫ বছরে ১২ লক্ষ বার দেখা হয়েছে। তাকে ‘ভাইরাল’ বলা যাবে না।

নমুনা দুই। কলেজপড়ুয়া কপোত-কপোতী একটি ঘরে ঢুকে ক্যামেরার সামনে চোখ মারল এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ১০ সেকেন্ডের ভিডিওর বিষয় এটাই। ৫ দিনে ৬ লক্ষ বার শেয়ার হল। নিঃসন্দেহে ‘ভাইরাল’।

যা অত্যন্ত জলদি ছড়িয়ে পড়ে, ভাইরাসের মতো, তাই তো ভাইরাল। ভাষা নিয়ে চর্চা করা এক সুহৃদের থেকে জানতে পারলাম, ‘অক্সফোর্ড’ অভিধানে ডাক্তারিশাস্ত্রের বাইরের ‘ভাইরাল’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯৮৯ সালে। বোঝাতে চাওয়া হয়েছিল কোনও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা। এর আরও দেড় দশক পরের সংস্করণে প্রথম ‘গোয়িং ভাইরাল’ বিষয়টির উল্লেখ পাওয়া যায়। পশ্চিমের দেশে দেশে তত দিনে বেশ জঁাকিয়ে বসেছে কম্পিউটার-ইন্টারনেট। গুটিগুটি পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াও। পোস্ট হচ্ছে প্রতিদিন।

শেয়ারও হচ্ছে বেশ। তবে ২০০৪-’০৫ সালে, এদেশে ‘গোয়িং ভাইরাল’ বললে কতজন মানে বুঝতে পারতেন, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। মার্কিন সাহিত্যিক ও মিডিয়া তাত্ত্বিক ডগলাস রাশকফ ১৯৯৪ সালে ‘মিডিয়া ভাইরাস! হিডেন অ্যাজেন্ডাজ ইন পপুলার কালচার’ নামক একটি বই লেখেন। ‘ভাইরাল মিডিয়া’ বলে একটি শব্দবন্ধ তিনি ব্যবহার করেন সেখানে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হবে ভাইরাল মার্কেটিংয়ের কথাও। নয়ের দশকে ‘ভাইরাল’ কথাটি তার চিরাচরিত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিল বড্ড তাড়াতাড়ি। এ-সময়েই চালু হয়েছিল হটমেল। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে যে কোনও ইমেলের শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জুড়ে যেতে লাগল একটি ম্যাজিক লাইন– ‘গেট ইয়োর ফ্রি ইমেল অ্যাট হটমেল’। প্রবল জনপ্রিয়তা পায় হটমেলের এই কৌশল। অগুনতি মানুষ এই ইমেলের দ্বারস্থ হন সেই সময়। মার্কেটিংয়ের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা মানুষের একটা বড় অংশ মনে করে, ভাইরাল মার্কেটিংয়ের জন্ম হয়েছিল এভাবেই। এর অবশ্য একটি সংজ্ঞাও রয়েছে! সামাজিকভাবে এবং মুখের কথায় যে-স্ট্র্যাটেজি ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির মতো ছড়িয়ে দেওয়া যায় সেটাই ‘ভাইরাল মার্কেটিং’। আর কে না জানে, সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রচারের মাধ্যম শুধুমাত্র মুখের কথা। ওয়ার্ড অফ মাউথ। সামাজিক মাধ্যমে আমাদের অ্যাকাউন্ট তো দিনের শেষে নিজেদের মুখগুলিকেই ফুটিয়ে তোলে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মার্কেটিংয়েরও জুড়ি নেই এখনকার দিনে।

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির মতো আন্তর্জালে ঝরে পড়ে কোনও পোস্ট কিংবা ভিডিও ভাইরাল করার টিপস, বিনা পয়সায়। ভাইরাল উপদেষ্টার কাতর অনুরোধ– ভালো লাগলে আমার এই পোস্টটিও ভাইরাল করে দিন ফেসবুকে, ইউটিউবে। কী করে মন মাতানো হেডিং দিতে হবে, কত সেকেন্ডের ভিডিও হলে তা একেবারে লা-জবাব, কী কী ইমোজি কখন ঢোকাতে হবে, কোন সময় লাইক কিংবা সাবস্ক্রাইব করার আবেদন জানাতে হবে, আর কখনই বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার ‘প্রোডাক্ট’টি পোস্ট করতে হবে, তা নিয়ে উপদেশের তালিকা অন্তহীন।
কুম্ভলগ্নে দেখা এক আশ্চর্য ভিডিওর কথা মনে পড়ছে। দেখি, এক ভদ্রমহিলা ভিডিও কলে কোনও প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে মোবাইলটি জলে ডুবিয়ে দিলেন, ফের তুললেন, ফের ডোবালেন, ফের তুললেন। তিনি নিজেও কুম্ভমেলায়। দূরে থাকা প্রিয়জনকে এভাবেই করিয়ে দিলেন পবিত্রস্নান। ভিডিওটি ‘ভাইরাল’ হয়েছিল, বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কতজন মানুষ এতে অনুপ্রাণিত হয়ে সাধের মোবাইলটি জলাঞ্জলি দেবেন কিংবা ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন, সে-খবর অজানা। এমন অজস্র ভিডিওর সন্ধান আমরা জানি। ছাপার অক্ষরে পড়ার থেকে পর্দায় চেখে দেখাই প্রকৃত সুখের সন্ধান দেবে।

সামাজিক মাধ্যমে বন্দি তো হয়েছি আমরা কবেই। ইতিমধ্যেই ‘ভাইরাল’ হয়ে যাওয়া কোনও পোস্ট কিংবা ভিডিও যেন আমার নজর না এড়ায় তা নিয়ে আমরা মহাব্যস্ত থাকি। আর যে কোনও পোস্ট করার সময় নিজেদের মনের মধ্যেও জলপ্রপাতের মতো সহর্ষে বইতে থাকে এক অনন্ত ইচ্ছে– আমার এই পোস্টটিকে ‘ভাইরাল’ করে দাও। হয়তো পিছনে তখন দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে ট্রেন। হয়তো আর দু’-ইঞ্চি পিছনে চলে গেলেই আহ্বান জানাবে গভীর গিরিখাত। জীবনকে ‘লাইক’ করার ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ পাঠায় মৃত্যু, অগোচরে। আমরা দমি না।

মুশকিলটা হল, এই অন্যরকমের ‘ভাইরাল’ জ্বর নিয়েও লোকেরা ইদানীং ভিড় বাড়াচ্ছেন চিকিৎসকদের চেম্বারে। এ চিকিৎসায় স্টোথোস্কোপের কোনও প্রয়োজন নেই অবশ্য।
(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • সামাজিক মাধ্যমে প্রথম ‘ভাইরাল’ পোস্টের শিরোপা জিতে নিয়েছিলেন কে? উত্তর মেলে না।
  • ইউটিউবে প্রথম ‘ভাইরাল’ ভিডিও কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরও অধরা থাকে।
  • এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, সর্বাধিকবার দেখা ভিডিও মানেই সেটি ‘ভাইরাল’ নয়।
Advertisement