ক্লাসরুমে মুসলিম ছাত্রকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ দাগিয়ে সাসপেন্ডেড বেঙ্গালুরুর অধ্যাপক। বচনে ‘ফিল্টার’ কবে লাগাবে দেশের নাগরিকরা? আশার আলো একটাই। তাঁর কৃতকর্মের সক্রিয় প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে সমাজ।
ভারতে লোকসভা ও বিধানসভা ভোট মাত্রেই ধর্ম হাতিয়ার করে প্রচার জলবৎ তরলং। শুধু ভারতে নয় অবশ্য, আবিশ্বের প্রতিটা কোনায় সম্প্রতি এই ছবি দৃশ্যমান। ফোটোগ্রাফি স্টুডিওর অন্ধকারে যেমন ক্যামেরায় তোলা ছবিটির ‘নেগেটিভ’ থেকে প্রিন্ট বা ডিজিটাল ফাইল তৈরি হয়, সামনে আসে এক সুস্পষ্ট অবয়ব– বর্তমান বিশ্বে ধর্মান্ধতার নেতিবাচক জিগিরও ক্রমশ অন্ধকার ভেঙে স্পষ্ট করে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকটতর। নগ্নতর। থিওক্রেটিক দেশগুলো যেহেতু ধর্মগুরু বা গুরুবাদের ছায়ায় পুষ্ট, সেখানে ভিনধর্মীদের ধর্মাচারণ বা প্রকাশ্য-অবমাননার ঘটনাগুলো তেমন অচেনা নয়। তবে ভারতের মতো সংবিধানগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্মের ‘ট্যাগ’ বিদ্ধ করার ঘটনা ঘটলে তা দৃশ্য-শ্রাব্যকটু হয় বইকি! আর অনভিপ্রেত ঘটনাটি ঘটান যদি কোনও শিক্ষক, তাহলে সমাজকে লজ্জায় মাথা নোয়াতে হয় অচিরেই।
অধ্যাপক মুরলীধর দেশপাণ্ডে করে বসেন এমনই এক কাণ্ড। বেঙ্গালুরুর (Bengaluru) পিইএস বিশ্ববিদ্যালয় গত ২৪ মার্চের ঘটনা। পড়ুয়াভর্তি ক্লাসরুমে আফান নামের এক মুসলিম ছাত্রকে হঠাৎই দাগিয়ে দেন ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে। আফান একজনের সঙ্গে দেখা করবে বলে ‘স্যর’-এর অনুমতি চেয়ে বেরতে যাচ্ছিল। তখনই তার উপর নেমে আসে মুরলীধরের নগ্ন বাক্যবাণ। আফানকে তঁার জিজ্ঞাসা– কী খেয়ে আসো? ভেবেছিলাম আজ শান্ত থাকব। তোমাদের লজ্জা লাগে না? অপদার্থ!
ভারতের মতো সংবিধানগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্মের ‘ট্যাগ’ বিদ্ধ করার ঘটনা ঘটলে তা দৃশ্য-শ্রাব্যকটু হয় বইকি! আর অনভিপ্রেত ঘটনাটি ঘটান যদি কোনও শিক্ষক, তাহলে সমাজকে লজ্জায় মাথা নোয়াতে হয় অচিরেই।
আরও বলেন, ‘এদের মতো লোকজনই ইরান যুদ্ধের জন্য দায়ী’, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প আসবে আর এই ব্যাটাকে নিয়ে যাবে’, ‘তুমি জাহান্নামে যাবে’। ঘটনাটির ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেয় ক্লাসরুমে উপস্থিত ছাত্রদের একজন। তা ভাইরাল হলে তীব্রভাবে সমালোচিত হন মুরলীধর।
ব্যক্তিগত বিশ্বাসে ‘ধোয়া তুলসীপাতাটি’ হয়তো ৯৯ শতাংশ দেশবাসীই নন। ভাষা-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদে আক্রোশের বীজ আমরা সবাই কমবেশি পুঁতে রেখেছি নিজেদের ভিতর। তবে মনুষ্যত্ব বোধ পরিমিতি ও সৌজনে্যর শিক্ষা দেয়। সমাজের সুস্থতা ও স্থিরতা বজায় রাখতে যা একান্ত কাম্য। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি এই মুহূর্তে ধর্মের সংকীর্ণ চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছে। তবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের– বিশেষত মানুষ গড়ার কারিগরদের কাছ থেকে– অন্তত নূ্যনতম পরিমিতি বোধের আশা করা নেহাত বাড়াবাড়ি কিছু নয়। ভাবনায় ‘ফিল্টার’ না-ই থাকুক, অন্তত বক্তবে্য সংযমের সুতোটুকু থাকুক– এমন আশা করা কি বাতুলতা? তাই ‘অধ্যাপক’ মুরলীধর(রা) হতাশ করেন। উদাসীন করেন।
ব্যক্তিগত বিশ্বাসে ‘ধোয়া তুলসীপাতাটি’ হয়তো ৯৯ শতাংশ দেশবাসীই নন। ভাষা-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদে আক্রোশের বীজ আমরা সবাই কমবেশি পুঁতে রেখেছি নিজেদের ভিতর। তবে মনুষ্যত্ব বোধ পরিমিতি ও সৌজনে্যর শিক্ষা দেয়।
আশার আলো একটাই। তঁার কৃতকর্মের সক্রিয় প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে সমাজ। তিনি সমালোচিত তো হয়েছেনই, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে সাসপেন্ডেডও হয়েছেন। আরও কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। যে ‘করে প্রচার বিদ্বেষ তবু তঁার এ প্রেমের হাটে’, তার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এখনও ধরে আমাদের দেশ। এই মৃত উপমহাদেশে এটুকু রোদ্দুরই বা কম কী!
