এমন আচরণ ‘নৈতিকভাবে ভুল, অশোভন ও অসদাচরণ’ বলে গণ্য হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫৪সি ধারা অনুযায়ী ‘ভয়্যারিজম’ অর্থাৎ ‘গোপনে যৌন অভিসন্ধিমূলক নজরদারি’ বা ‘উঁকিঝুঁকি’-র যে আইনি সংজ্ঞা, তাতে এ-কাজ নাকি অপরাধের মধ্যে পড়ে না! বম্বে হাই কোর্টের রায়ে অনুক্ত বিড়ম্বনার দিকটি অবহেলাযোগ্য নয়! লিখছেন চিরঞ্জীব রায়।
ট্রেনে একজন পুরুষ সামনে বসা যুবতীর শরীরের ভঁাজে ভঁাজে নাছোড় দৃষ্টি বোলাচ্ছেন। সে-দৃষ্টি শ্লীলতাহীন, কামজর্জর। প্রবল অস্বস্তিতে যুবতী কুঁকড়ে যাচ্ছেন। তঁার সম্ভ্রম তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আত্মমর্যাদা লুণ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু তিনি এই আচরণের আইনি প্রতিবাদ করতে পারবেন না। প্রতিকার চাইতে পারবেন না। কারণ, ওই পুরুষের আচরণ অশোভন বা অনৈতিক হতে পারে, কিন্তু ‘voyeurism’ বা গোপনে রতিদর্শন নয়, তাই আইন অর্থাৎ, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী, শাস্তিযোগ্য অপরাধও নয়। বম্বে হাই কোর্ট অতি সম্প্রতি এমনই রায় দিয়েছে।
একটি বিখ্যাত বিমা সংস্থায় পদস্থ কর্তার নজর দিনের-পর-দিন, মিটিংয়ের-পর-মিটিংয়ে অধঃস্তন মহিলার দৃষ্টি নয়, বক্ষজুড়েই নিবদ্ধ থাকত। কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ (‘পশ’) আইন মোতাবেক মহিলা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চান। অফিসের আভ্যন্তরীণ তদন্ত অভিযুক্ত অভিজিৎ বাসোয়ান্ত নিগুঢ়কারকে নির্দোষ ঘোষণা করে। প্রতিকার না পেয়ে থানায় এফআইআর করেন অভিযোগকারিণী। ২০১৫ সালের সেই মামলাকে চ্যালেঞ্জ করে বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন নিগুঢ়কার। গত ৮ এপ্রিল বিচারপতি অমিত বোরকার তঁাকে বেকসুর ঘোষণা করেছেন, এবং রায়ে যৌন গোপনীয়তা ভঙ্গ করার, ভারতীয় আইনি ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম, সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ: অফিসের পরিবেশে সহকর্মীর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকার অভিযোগে যদি সত্যও হয়, এমন আচরণ ‘নৈতিকভাবে ভুল, অশোভন এবং অসদাচরণ’ বলে গণ্য হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫৪সি ধারা অনুযায়ী ‘ভয়্যারিজ্ম’ অর্থাৎ ‘গোপনে যৌন অভিসন্ধিমূলক নজরদারি’ বা ‘উঁকিঝুঁকি’-র যে আইনি সংজ্ঞা রয়েছে– অফিসের খোলামেলা পরিবেশে সহকর্মীর বক্ষদেশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই অপরাধের মধ্যে পড়ে না। তাই, এই মামলা চালিয়ে যাওয়া মানে ‘আইনি পদ্ধতির অপব্যবহার’।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ: অফিসের পরিবেশে সহকর্মীর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকার অভিযোগে যদি সত্যও হয়, এমন আচরণ ‘নৈতিকভাবে ভুল, অশোভন এবং অসদাচরণ’ বলে গণ্য হতে পারে।
কোনও মহিলার ব্যক্তিগত মুহূর্ত– যেমন: পোশাক বদলানো, বাথরুম ব্যবহার, একান্ত শারীরিক কার্যকলাপ, ব্যক্তিগত যৌন আচরণ, তঁার অজান্তে তঁাকে দেখা, ছবি তোলা বা ছড়িয়ে দেওয়া এই ৩৫৪সি ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে সাব্যস্ত হবে। আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, ‘ভয়্যারিজম’-কে হতে হবে একটি ‘গোপনীয় কার্যকলাপ’। অভিযুক্ত বিকৃতকাম কাণ্ডটি ঘটাবে এমন এক স্থানে যেখানে প্রশ্নাতীতভাবে গোপনীয়তা কাম্য; যেমন: পোশাক বদলানোর, স্নানের বা শোয়ার ঘর। তাই সহকর্মীর প্রতি দৃষ্টিতে যে পরিমাণ লালসাই ঝরে পড়ুক না কেন, স্থানটি যেহেতু গোপনীয়তাহীন অফিসের মিটিং রুম, কাজেই ‘অনৈতিক, অশোভন’ কাণ্ডটি কখনওই আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিচার্য হতে পারে না। রাস্তার মোড়ে, বাসে-ট্রেনে, বাজারেহাটে পুরুষের কামাতুর চোখ নারীর শরীর আপাদমস্তক লেহন করলেও, তাতে নারী অস্বস্তিতে অপমানে দুমড়ে মুচড়ে গেলেও, আকছার ঘটতে থাকা এমন ঘটনার ঘনঘটাকে নিছক অনভিপ্রেত, অশোভন, অনুচিত বলে গল্পে ইতি টানতে হবে। প্রতিকার চাওয়া যাবে না। কারণ, রাস্তার মোড় থেকে বাস ও ট্রেনের কামরা তো গোপনীয়তা-বর্জিত খোলামেলা জায়গা! এবং বিস্ফারিত নেত্রে দেখতেই থাকা, তা যতই নোংরা নজরে হোক, সে তো কোনও ব্যক্তিগত আচরণ গোপনে দেখার সমার্থক নয়!
এই অবকাশে স্বতঃপ্রণোদিত একটি প্রশ্ন উত্ত্যক্ত করে যায়। একজন মহিলার ব্যক্তিগত এবং গোপনীয় আচরণ লুকিয়েচুরিয়ে দেখলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, অথচ প্রকাশ্যে কুৎসিত নজরে দগ্ধ করলে সেটা কেবল অনৈতিক, অশোভন? প্রতিকারযোগ্য নয়? রাস্তাঘাটে, হয়তো বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যেও যে-নারী অহরহ এমন বিকৃতকামে লাঞ্ছিত হন, তিনি সসম্ভ্রমে চলাফেরার অধিকার চাইতে পারেন না?
কোনও মহিলার ব্যক্তিগত মুহূর্ত– যেমন: পোশাক বদলানো, বাথরুম ব্যবহার, একান্ত শারীরিক কার্যকলাপ, ব্যক্তিগত যৌন আচরণ, তঁার অজান্তে তঁাকে দেখা, ছবি তোলা বা ছড়িয়ে দেওয়া এই ৩৫৪সি ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে সাব্যস্ত হবে। আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, ‘ভয়্যারিজম’-কে হতে হবে একটি ‘গোপনীয় কার্যকলাপ’।
আসলে, এখনকার ভারতীয় সমাজ গভীরভাবে প্রোথিত সংরক্ষণশীল মূল্যবোধ, এবং মাত্রাছাড়া, বা বলা উচিত দ্বিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য আধুনিকীকরণের এক টালমাটাল ককটেল। ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ নম্বর ধারায় মর্যাদা এবং সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার, নারীর নাগরিক কর্মক্ষেত্রও আছে, যেখানে পৌরাণিক আদলের নারীসুলভ সম্ভ্রম রক্ষার ছুঁতমার্গ মেনে চলা অসম্ভব। সামাজিক ভাবনার এই অবিমিশ্র বুননে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের চোখে নারীর সম্ভ্রমের সংজ্ঞা খেই হারিয়ে ফেলে।
তা সত্ত্বেও পথেঘাটে পালনীয় রোজকার রীতিনীতি, সাহিত্য, সিনেমা বলে আসছে, নারীকে অশ্লীলভাবে দেখা অসামাজিক, নারীকে অসম্মান করা, হেয় করারই নামান্তর। কিন্তু সমস্যা হল, সামাজিক রীতিমাফিক অমর্যাদা করা আর আইনের চোখে নারীর অবমাননা করার মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু অলঙ্ঘনীয় বেড়া আছে। এবং বম্বে-সহ অন্য হাই কোর্ট সেই আইনি বেড়ার সামনে নিরুপায়।
তাই বিচারপতি অমিত বোরকারকে ভারতীয় দণ্ডবিধির বেঁধে দেওয়া পথ থেকে এক চুল সরলেও চলে না। ফৌজদারি আইন হবে স্পষ্ট, সুনিশ্চিত। বিচারবিভাগীয় সক্রিয়তা বা ‘জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজ্ম’ দিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধি বা বিচার প্রভাবিত হবে না। বিচারবিভাগীয় সক্রিয়তা হল– একটি প্রগতিশীল, যুগোপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি। যে-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আদালত শুধু আইনের অক্ষরের ব্যাখ্যাই করে না, সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টিও মাথায় রাখে। তাই বম্বে হাই কোর্ট বিমা সংস্থার ঘটনার প্রেক্ষিতে নিগূঢ়কারের অপলক দৃষ্টিকে সমর্থনযোগ্য নয়, বরং নীতিগর্হিত বলছে। কিন্তু এ-কথাও উল্লেখ করছে যে, সমস্ত অনৈতিক কাজকর্মই ফৌজদারি অপরাধ নয়।
ফৌজদারি আইন কোনও নৈতিক বা মানবিক আচরণবিধি নয়। সমাজে নিত্য ঘটতে থাকা বহু নীতিহীন কাজকর্মই জেলযাত্রার মতো অপরাধ নয়, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বার্থে হওয়া উচিতও নয়।
যে আইনের উপর দেশের দণ্ডবিধি, বিচারব্যবস্থা, সাজা বা রেহাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দঁাড়িয়ে রয়েছে, তার যথার্থতা অকাট্য। তবু, একটি প্রশ্ন বিড়ম্বনায় ফেলে, কোন অনৈতিক আচরণ অপরাধ নয়? সমাজের চোখে যেটা গ্রহণযোগ্য নয়, আইনের চোখে সেটা মান্য? সমাজের রীতি, ন্যায়-অন্যায় বোধ মেনে আইন চলবে না কি আইনের অক্ষর হুবহু অনুসরণ করে দিন-প্রতিদিনের প্রতি পদক্ষেপের সামাজিক নিয়মনীতি নির্ধারিত হবে? সমাজ তো তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারিক জীবনের প্রতি বঁাকে বঁাকে পরিবর্তনশীল, প্রগতিশীল। আইন কি পারবে সেই প্রয়োজন মিটিয়ে নমনীয় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে? কতটা পথ পেরলে তবে পথিক হওয়া যায়– এর মতোই দুরূহ প্রশ্ন, কতটা অনৈতিক হলে তবে অপরাধ বলা যায়।
কোনও অনৈতিক কাজ কি অপরাধ নয়? অবশ্যই, হ্যাঁ। সেটাই অনৈতিক কর্ম যা গ্রহণযোগ্য মানবিক, সামাজিক, ব্যবহারিক রীতি লঙ্ঘন করে। আর অপরাধ সুনির্দিষ্ট আইনকে লঙ্ঘন করে, তাই রাষ্ট্র দ্বারা শাস্তিযোগ্য। সমস্যাটা সেখানেই। ফৌজদারি আইন কোনও নৈতিক বা মানবিক আচরণবিধি নয়। সমাজে নিত্য ঘটতে থাকা বহু নীতিহীন কাজকর্মই জেলযাত্রার মতো অপরাধ নয়, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বার্থে হওয়া উচিতও নয়। আদালতে তাই বারবার উল্লিখিত হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে কারও ব্যবহার ‘অশোভন’ বা ‘অমানবিক’ বলে গণ্য হতে পারে, এবং সংস্থার নিয়ম বা ‘পশ’ অনুযায়ী তার বিচার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও হতে পারে। কিন্তু সেটা ৩৫৪সি ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য হবে না।
‘ভয়্যারিজম’ বলি বা ‘পরকামিতা’ বা গোদা বাংলায়, ‘দর্শনে যৌনসুখের বিকৃতি’ পৌরাণিক আমলেও সুবিদিত। এ বিষয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের নাকি নামডাক ছিল। দেবদাসী প্রথাও এই রীতিরই অনুগামী। সোশ্যাল মিডিয়া, স্মার্টফোন আর লুকোনো সিসিটিভি ক্যামেরার কল্যাণে একবিংশ শতাব্দীতে তা বহুগুণ বেড়েছে এবং বাড়তেই থাকছে। ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’-র পরিসংখ্যান বলছে– ২০২২ সালে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার, ২০২৩ সালে নারী নির্যাতনের মামলা বেড়ে দঁাড়িয়েছে সাড়ে ৪ লক্ষে। এর মধ্যে ৪ লক্ষ মামলায় নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে। অপরাধ প্রমাণ ও সাজার হার ২১-২৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কোন পুরুষ কোন নারীর বক্ষপ্রদেশ মুখস্থ করছে তার সামাজিক অবৈধতা মেনে নিয়েও আইনি সুরাহার বন্দোবস্ত দিবাস্বপ্ন নয়, তার থেকেও অনেক বেশি অসম্ভব কিছু, হায়!
(মতামত নিজস্ব)
