এপ্রিল পড়তে না পড়তেই তাপে চাপ। এমনিতেই বাজার আগুন। সবজি থেকে গ্যাস- আগুন দাম। এ-বঙ্গে সুসময় আসবে কবে?
এ বছর মার্চের শেষ পর্যন্ত বাঙালির দ্বারে বসন্ত ছিল জাগ্রত। ফুরফুরে হাওয়া। নরম রোদ। বসন্তের বিকেলে কিছুক্ষণের বৃষ্টি। এমনকী, শিলাবৃষ্টি। ঝোড়ো বাতাসের মাতামাতি। তারপর মেঘলা সূর্যাস্ত। বাঙালিকে ভুলিয়ে রেখেছিল প্রকৃতির মায়ার খেলা। কিন্তু এপ্রিলের প্রথমেই, অর্থাৎ মধ্য চৈত্রে, যেই লাফিয়ে উঠছে বাংলায় গর্মির পারদ, অমনি হাঁসফাঁস বাঙালি। গরম পড়তে না পড়তেই তারা অনেকেই যেন শীতের দেশের মানুষ। এই অসহনীয় গ্রীষ্ম থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। কেউ খেতে চায় সমুদ্রের হাওয়া তো কেউ পালাতে চায় হিমালয়ের সান্নিধ্যে।
এক সময় বাঙালির ছিল গরমের সন্ধেবেলায় চিলতে বারান্দা। বা ফালি ছাদ। অধিকাংশ বাঙালি-জীবনে গ্রীষ্মের সেই আটপৌরে বিলাস আর নেই। তবে তার বদলে অনেক বাঙালির ঘরেই এখন ফ্রিজ আর এসি। নিদেনপক্ষে কুলার। তবে এ-কথাও ঠিক, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়’– এই গান এখনকার অধিকাংশ বাঙালি কুণ্ঠাহীন গাইতে পারে না। তার পায়রার খুপরির কোনও জানলায় কতটুকু আকাশ ধরা পড়ে? গ্রীষ্মের গুমট থেকে অধিকাংশ বাঙালির জানলা আর তাকে বাঁচায় না।
মাছের বাজার থেকে মাংসের বাজার, ফলের বাজার থেকে সবজির বাজার, সর্বত্র দাউদাউ। যে আগুন দমকল নেভাতে পারে না। দাম বাড়ছে ওষুধের। দাম বেড়েছে গ্যাসের। আরও বাড়বে।
তবে এত কথা বলার পরেও হয়তো একটা সত্যিকথা আটকাতে পারছি না। এই কথাটা হল, যত দিন যাচ্ছে বাঙালি হয়ে উঠছে তত অসহিষ্ণু। তার কারণ নিশ্চয়, আধুনিক জীবনে নানা চাপ। ৪০-৫০ বছর আগে বাঙালি জীবনে সেসব চাপ ছিল না। এ কারণেই এ যুগের বঙ্গসমাজ ও সংসার তিতিবিরক্ত। তার মধ্যে জেগে উঠেছে মাঝ চৈত্রের তাপ। বাঙালি তো হাঁসফাঁস করবেই। তাকে দোষ দেওয়া যায় না। বরং তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হওয়াটাই মানবিক হবে। গেরস্ত বাঙালির অবস্থাটা ভেবে দেখুন। মাছের বাজার থেকে মাংসের বাজার, ফলের বাজার থেকে সবজির বাজার, সর্বত্র দাউদাউ। যে আগুন দমকল নেভাতে পারে না। দাম বাড়ছে ওষুধের। দাম বেড়েছে গ্যাসের। আরও বাড়বে। এবং জন্মজন্মান্তরে এই বাংলার প্রচুর বাঙালি প্রতিদিন হারাচ্ছে নাগরিকত্ব। সেই অচেনা চাপ ভেবে দেখুন। সর্বহারা বাঙালি এত দিন অন্তত নাগরিকত্ব এবং ভোটের অধিকার হারায়নি। হারানোর এই নতুন শোক অনুপ্রবেশ করেছে বাঙালি জীবনে।
সুতরাং এপ্রিল পড়তে না পড়তেই গরমের গুঁতোয় সুকুমার রায়ের বাঙালি বড়বাবুর মতো বেচারা বাঙালি খেপে উঠতেই পারে। তবে সুখবর, আজ রবিবার থেকে নাকি আগামী তিনদিন দক্ষিণবঙ্গে মেঘের ছায়াপাতের সঙ্গে ঘটবে বৃষ্টিপাত। এবং থাকবে ঝোড়ো বাতাস। অতএব গুমট কমবেই। কিন্তু সে তো ক্ষণিকের স্বস্তি। মনে রাখতেই হবে দীর্ঘ গ্রীষ্ম আমাদের অপেক্ষায়। সেই গ্রীষ্মকে হাসিমুখে সহ্য করতে বরং স্মরণ করা যাক সবথেকে বিখ্যাত সেই বাঙালিকে যাঁর জন্মদিন বাঙালি ভুলবে না কোনও দিন। পঁচিশে বৈশাখ। এই বাঙালি আজীবন ভালবেসেছিলেন বীরভূমের লু-ছোটা দুপুরকেও: নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা। খেলো খেলো তব নীরব ভৈরব খেলা।
