Advertisement

কূটনীতির স্বার্থে তালিবানের সঙ্গে কি ভারতের ভাল সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন?

03:37 PM Aug 21, 2021 |

তালিবানের শত খারাপ দিক থাকলেও যদি নয়া প্রতিশ্রুতি, নয়া কর্মসূচি নিয়ে সরকার গঠিত হয়, তাহলে ভারতকে ভাবতে হবে যে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কৌশলে কি তালিবানের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন? আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে অনেক দূরে, কিন্তু ভারতের থেকে দূরে নয়! লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

Advertisement

 

আরবি ভাষায় ‘তালিবান’ শব্দটির অর্থ ‘ছাত্র’। অর্থাৎ, ইসলাম এবং ইসলামিক আইন শরিয়তের ছাত্রকে বলা হয় ‘তালিবান’ (Taliban)। কিন্তু গোয়েন্দা বাহিনীর সরকারি রিপোর্টে ‘তালিবান’ শব্দটির মানে হয়ে দাঁড়াল জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদী। সিআইএ এবং কেজিবি-র ফাইলে শব্দটা প্রবেশ করল। এরপর আফগানিস্তানের মাটিতে তালিবানের বিদ্রোহ বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রূপে দেখা গিয়েছে। আজ ইসলামিক এমিরেটের প্রত্যাবর্তন হচ্ছে আফগানিস্তানে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ‘তালিবান ২.০’, অর্থাৎ, এই দ্বিতীয় দফার তালিবান কি প্রথম দফার তালিবান, অর্থাৎ ‘তালিবান ১.০’-র থেকে আলাদা হয়ে শান্তির পথে যাবে? চাইবে একটা সাংবিধানিক আফগানিস্তান গড়ে তুলতে? না কি আঞ্চলিক অস্থায়িত্ব আরও বাড়বে? অনেকে বলছেন যে, ‘তালিবান’ এবং ‘শান্তি’- এই দুটো একত্রে সোনার পাথরবাটি। সুতরাং, এটা কখনওই হতে পারে না। ভবিষ্যৎ-ই বলবে আফগানিস্তানে তালিবান-ই ভবিষ্যৎ কি না!

কিন্তু এখন আমাদের কাছে, অর্থাৎ ভারতীয়দের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আমরা কী করব? ভারত সরকার জানিয়েছে, আমাদের নীতি, ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’। সত্যিকথা বলতে, ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ ছাড়া অন্য কোনও নীতি গ্রহণের কি কোনও উপায় রয়েছে? কিন্তু আমেরিকা কেন এমন করল? এর সবটাই ভারতের বিদেশমন্ত্রকের কাছে অপ্রত্যাশিত! আমেরিকার (America) কাছেও কি আজ যা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ তাদের স্ক্রিপ্টের বাইরে? চিন, রাশিয়া, সর্বোপরি পাকিস্তান যেভাবে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের পর তালিবানি সরকার গঠনের জন্য উদ্বাহু নৃত্য শুরু করেছিল, এই মুহূর্তে তারাও কি একইভাবে উৎসাহিত? না কি পাকিস্তান তালিবানকে সম্পূর্ণ মদত দেওয়ার পরেও ভিতরে ভিতরে ভয় পাচ্ছে যে, তালিবানি সরকারটাই আসল ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে পৃথিবীর কাছে এই মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি হয়ে উঠবে! আর তখন পাকিস্তানের উপরেই যদি তাদের আঘাত নেমে আসে! অতীতেও তালিবানিদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের কখনও কখনও প্রেম হয়েছে, আবার কখনও বহু তালিবানি জঙ্গিকে পাকিস্তান জেলে পুরেছে- আমেরিকা তথা আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে গোপনে আঁতাঁতের জন্য।

[আরও পড়ুন: Afghanistan Crisis: তালিবানের ‘ত্রাস’ পঞ্জশিরের ‘সিংহশাবক’! কে এই আহমেদ মাসুদ?]

‘আফগানিস্তান’ নামক বিষয়টা কাজেই একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক এবং বেশ জটিল। তালিবানিরা জঙ্গি, তারা তো জাতি নয়। সুতরাং, আফগান জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যেও নানা স্তর আছে, নানা জাত-পাত আছে। তালিবানরা আফগান জঙ্গি, কিন্তু সমস্ত আফগান তালিবান নয়। আবার আফগান জাতির মধ্যেও ‘পশতুন’ যেমন আছে, ‘কাজাখ’ যেমন আছে, সেরকম আরও বেশ কিছু জাতি-গোষ্ঠী আছে। প্রত্যেকেই তালিবানিদের পক্ষে নয়। যেমন, মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হাজারা অ্যাক্টিভিস্টরা ভীষণভাবে তালিবানদের বিরুদ্ধে এবং তারা আফগানিস্তানের ১১০ বছরের স্বাধীনতা দিবসে রাস্তায় নেমে তালিবানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। যেভাবে হিন্দু, শিখ এবং অ-মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্তদের ভারতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi), তাতে প্রশ্ন উঠেছে, হাজারা মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট, যারা তালিবান-বিরোধী এবং আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসতে চাইছে- তাদের ক্ষেত্রে ভারত তাহলে কী ভিসা-নীতি নেবে?

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আফগানিস্তানে ভারপ্রাপ্ত আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি যখন তালিবানের ডেপুটি লিডার মৌলানা আবদুল গনি বরাদরের সঙ্গে দোহাতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, তখন ঠিক হয়েছিল যে, আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। জালমে খলিলজাদ আমেরিকার পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কথা বলা হয়েছিল। সে কথাই জো বাইডেন বললেন ২০২১-এর ১৪ এপ্রিল, আমেরিকা ৯/১১-র বার্ষিকীর আগেই নিঃশর্তে সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। আসলে, আমেরিকা ভেবেছিল, এই সময়ে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া ভাল। তার কারণ, যে-সরকার আফগানিস্তানে ছিল, তারা দুর্নীতির কারণে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল। আর, আমেরিকাও নানা আর্থিক সমস্যায় জেরবার। সেখানকার নাগরিকরা মনে করেছে, আমেরিকার ইরাক, আফগানিস্তানে নাক গলানোর দরকারটা কী! তার চেয়েও বড় কথা, কাবুলের প্রশাসন জনপ্রিয়তা হারিয়েছে আর তালিবানি শক্তিও আস্তে আস্তে মানুষের সমর্থন পাচ্ছে এবং বিজয়লাভের দিকে এগিয়ে আসছে- এই দেখে আমেরিকা ভেবেছিল, শান্তিপূর্ণভাবে তালিবান সরকারের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত হবে। কিন্তু তালিবানরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েই, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে, এভাবে রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য বিস্ফোরণ ঘটাবে- তা বাইডেন প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না।

আমেরিকার অনেকগুলো ভুল হয়েছে। সেই ভুলগুলোর মধ্যে একটা- ২০০১ সালে আমেরিকা আফগানিস্তানে গিয়েছিল কাউন্টার টেররিজমের মিশন নিয়ে, যুদ্ধ করার জন্য নয়। তারপর দেখা গেল, দমন-নীতির মোকাবিলায় তালিবানরা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। অন্যদিকে, ২০০৩-এ ইরাকের দিকে মার্কিনদের মন দিতে হল। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে কাউন্টার ইনসারজেন্সি যখন সফল হল না, তখন আমেরিকা আরও বড় যুদ্ধের দিকে চলে গেল। আমেরিকা যে ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে, তা নয়। মূলত এক বছরই তারা ‘কমব্যাট অপারেশন’ চালায়। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ২০০১ থেকে ২০১৪- এই সময়ে ২,৩৫২ জন মার্কিন সেনা মারা গিয়েছেন এবং তার পরবর্তী ছ’বছরে মারা গিয়েছেন ৯৬ জন। বার্ষিক যে খরচ আমেরিকা আফগানিস্তানের (Afghanistan) জন্য করত, তা তারা অনেক দিন আগেই কমিয়ে দিয়েছিল। তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট যেখানে ৭০০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে আফগানিস্তানের জন্য তাদের খরচ ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

সুতরাং, আসল কথা আর্থিক লোকসান নয়, আসল কথা ছিল পাকিস্তানে গিয়ে তালিবানরা আশ্রয় পাচ্ছে বা মদত পাচ্ছে। আফগানিস্তান ঘিরে রাশিয়া এবং চিনের ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার উপর চাপ ফেলছিল। রাশিয়া ও চিন চেষ্টা করছিল আফগানিস্তানে তালিবানদের মদত দিয়ে আমেরিকাকে প্যাঁচে ফেলতে। তালিবানদের সঙ্গে বোঝাপড়ার পথে আমেরিকা যেতে চেয়েছিল এবং সেই কারণে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল-ও তালিবানদের সঙ্গে একটি যোগসূত্র তৈরি করেছিলেন। যদিও মতাদর্শগতভাবে নরেন্দ্র মোদির সরকার ভয়ংকরভাবে তালিবান-বিরোধী।

এখন প্রশ্ন হল, এই যে তালিবানরা এখন ক্ষমতায় এল, আগামী দিনে তারা কীভাবে এগবে? একটা কথা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, আরও রক্তক্ষয়ের সম্ভাবনা কম, তা হওয়ার হলে ইতিমধ্যেই হয়ে যেত। কেউ বলছে, আজকের তালিবান সেই অতীতের তালিবান নয়। তালিবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা বরাদর এবং তার জ্ঞাতি মোল্লা মহম্মদ ওমর- এদের ২০১০-এ আইএসআই প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে জেলে পুরে দিয়েছিল। আট বছর তারা আইএসআইয়ের জেলখানায় ছিল। তারা যে সেখান থেকে খুব সুখস্মৃতি নিয়ে বেরিয়েছে, তা-ও নয়। দোহা চুক্তির ফলে এখন মানুষের কাছে তারা পরিচিত মুখ।

কিন্তু এইরকম একটা পরিস্থিতিতে, অনেক মারদাঙ্গা করার পর ক্ষমতায় এসে তালিবানরা চেষ্টা করবে যাতে রাষ্ট্রসংঘ তাদের অনুমোদন দেয় এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশ তাদের সমর্থন জানায়, তারা বৈধতা পায়। সেই কারণে তালিবানি মুখপাত্র ইতিমধ্যেই বলেছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তালিবানরা ভাল সম্পর্ক রাখবে। ভারতের সঙ্গে তারা সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না। ভারত আফগানিস্তানে যে বিনিয়োগ করে, তা যেন বন্ধ না হয়।

আড়াই হাজার আফগান ছাত্রছাত্রী এই মুহূর্তে ভারতে পড়াশোনা করছে, ভারত তাদের ফেরত পাঠাচ্ছে না। যে খ্রিস্টান, শিখ এবং হিন্দুরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে আসতে চাইছে, তাদের ভারত আশ্রয় দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যে মুসলমান আফগানরা তালিবানের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ভারতে আসতে চাইছে, তাদের ভিসা দেওয়া হবে কি হবে না? বহু মানুষ ইতিমধ্যেই ভারতের কাছে ভিসার জন্য আবেদন জানিয়েছে। ভারত তাড়াহুড়ো করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বলে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। কাবুলে যে ভারতীয় দূতাবাস রয়েছে, সেখানকার প্রত্যেক কর্মীকে ভারতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে কাবুলে আর কোনও ভারতীয় দূতাবাস নেই। অথচ ভারতীয়রা অনেকে আটকে পড়ে আছে। ভারতীয় দূতাবাস না থাকায় আমেরিকার সাহায্য নিয়েই তাদের আনতে হচ্ছে। আমেরিকার ভিসা অফিস কারজাই বিমানবন্দরে প্রতিষ্ঠিত এবং মজার ব্যাপার, তালিবানরা সেই ভিসা অফিসের উপর কোনও আক্রমণ করছে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও নাগরিকের উপর আঘাত হানা হচ্ছে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও কিছুটা হলেও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতেরও কি উচিত নয়, যদি তালিবান সরকার বৈধতা পায়, তাহলে তাদের সঙ্গে একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা? কেননা, আজকে তালিবানদের সবকিছু ভাল না লাগলেও, তাদের সঙ্গে তড়িঘড়ি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললে, তারা কি আরও বেশি করে চিন, রাশিয়া, পাকিস্তানের অক্ষে শামিল হয়ে যাবে না? তাতে কি আমাদের বিপদ বাড়বে না কমবে? যে-ভারত কাবুলের সংসদ বানিয়ে দিয়েছে, যে-ভারত কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, সেই ভারত যদি তালিবানদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে- তাহলে সেটাই কি হবে উচিত কাজ? না কি বিদেশমন্ত্রী জয়শংকর যেভাবে রাষ্ট্রসংঘে গিয়ে পাকিস্তানের হাক্কানি গোষ্ঠীর সঙ্গে তালিবানদের যোগসাজশের কথা উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছেন- সেটাই সঠিক পথ?

আসলে এখন তালিবান সরকার কী চরিত্রের হবে, তা নিয়েও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। এক হতে পারে, প্রচণ্ড কট্টরবাদী তালিবান সরকার, যা শুধু পাকিস্তান নয়, চিন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণেও থাকবে। আবার অন্যদিকে, হামিদ কারজাই বা আবদুল্লা আবদুল্লার মতো ব্যক্তিত্ব যদি সেই সরকারের মধ্যে থাকেন এবং মিলিজুলি একটা সরকার হয়- তাহলে সেখানে ভারতের নিয়ন্ত্রণও কিন্তু অসম্ভব নয়। সুতরাং, খুব সাবধানে এখন পা ফেলতে হবে। কেননা, প্রশ্নটা হিন্দু-মুসলমানের নয়, কোনও নাগরিকত্ব আইনের ডোমেস্টিক ইস্যুও নয়, এটা এমন একটা ইস্যু, যা বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে। তালিবান এমন এক শক্তি, যারা একদা ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে লড়াই করেছে, তাদের বিতাড়িত করেছে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে পেরেছে ১৮৪২ সালে। ১৬,০০০ ব্রিটিশ সেনার মধ্যে ১৫,৯৯৯ জনকে তারা মেরে ফেলেছিল। সেই তালিবানরাই কিন্তু ৩০-৪০ বছর আগে রাশিয়ান সেনাদের সঙ্গেও লড়াই করেছে। এখন আমেরিকার যে সেনাবাহিনী, তারাও কার্যত পরাস্ত হয়ে ফিরে গিয়েছে। তাহলে এখন শুধু শুধু পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ফৌজের কাছে তালিবানরা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে- এমনটাও হবে না। সেই কারণে পাকিস্তানের সেনা এবং নেতারাও মনে করেন না যে, তালিবানরা একদম ‘কাঠপুতলি’-র মতো হয়ে থাকবে। অতীতেও তারা সেটা করেনি এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছে। তালিবান আন্দোলনকারী গোষ্ঠীর মধ্যে ‘তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তান’ তো পাকিস্তানের ভিতরে থেকে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করে। ১৯৮৩ সালে পেশোয়ারের জঙ্গলে মুজাহিদিনের যে নেতারা ঘাঁটি তৈরি করেছিল, তারা বলেছিল যে, তারা পেশোয়ারের পাঠান এবং তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী এদের কব্জা করে রেখেছে বলে তাদের অনেক ক্ষোভও রয়েছে।

১৮৯৩-এ ব্রিটিশরা যে ডুরান্ড সীমা তৈরি করেছিল, সেই সীমারেখা তারা মানেনি এবং আফগান সরকার এখনও পর্যন্ত তাকে মান্যতা দেয় না। পাক-আফগানিস্তান যুদ্ধ তিন-তিনবার হয়েছে এবং সেই ইতিহাসটাও ভারতের ভুলে গেলে চলবে না। সেজন্য, খুব ধীরে, সাবধানে পা ফেলাটা ভারতের প্রয়োজন। তালিবানের শত খারাপ দিক থাকলেও যদি নয়া প্রতিশ্রুতি, নয়া কর্মসূচি নিয়ে সরকার গঠিত হয়, তাহলে ভারতকে ভাবতে হবে যে, যেভাবে কারগিল যুদ্ধের পরেও পারভেজ মুশারফের সঙ্গে করমর্দন করার কূটনৈতিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল, জুনটা সরকার মায়ানমারের সেনা সরকার হওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হয়েছিল- একইভাবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কৌশলে কি তালিবানের সঙ্গেও ভাল সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন? আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে অনেক দূরে, কিন্তু ভারতের থেকে দূরে নয়। সুতরাং, আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে, তা আবেগ বা মতাদর্শের চেয়েও বেশি কূটনীতি দিয়ে সমাধান করতে হবে।

[আরও পড়ুন: হজরত মহম্মদের যুদ্ধজয়ের স্মৃতিতে তৈরি তালিবানের কমান্ডো বাহিনী, কাবুলের সুরক্ষায় ‘বদরি-৩১৩’]

Advertisement
Next