৯০০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম বাড়বে (Medicine Price Hike)। ০.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটবে, যা নেহাত কম নয়। যেসব ওষুধ বছরভর লাগে, তার দাম কেন বাড়ে এভাবে! বৃহত্তর স্বার্থের নিরিখে দেখলে, এই অবস্থানকে কোনওভাবে 'দেশবান্ধব' বলতে পারি না।
'লাগে রহো মুন্নাভাই' সিনেমার সেই অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধকে ভোলা মশকিল, যিনি পেনশন পাচ্ছেন না শুধু এ কারণে, দুর্নীতিগ্রস্ত যে সরকারি কর্মচারীটি ফাইলে সই করবে, সে মনের মতো 'ঘুষ' পাচ্ছে না। ফাইল এগয় না অতএব। এদিকে, বাইরের জগতে আগুনের দ্রুতিতে ছড়িয়ে পড়ছে মূল্যবৃদ্ধির শিখা। মুন্নাভাইয়ের 'গান্ধীগিরি' তখন উপায় হল। বৃদ্ধটি একদিন সরকারি অফিসে গিয়ে, সেই ঘুষ-পঙ্কে নিমজ্জিত অফিসারের সামনে একে-একে জমা দিতে থাকে পরনের জামা, কাপড়, চশমা, জুতো প্রভৃতি। সেই সঙ্গে প্রতিটির দাম কত তাও ঘোষণা করে দেয়। সর্বশেষে ডায়াবেটিসের ওষুধটিও গচ্ছিত রাখে। বার্তা সহজ: এর চেয়ে
বেশি টাকা আমার নেই। নির্লজ্জের মতো নির্বস্ত্র হওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই। বেগতিক দেখে অফিসার তড়িঘড়ি সই করে ছেড়ে দেয় ফাইলটি।
এই গল্পের মধ্যে প্রাণদায়ী ওষুধটিও বিকিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি আলাদা করে নজর কাড়ে। অসহায়ত্ব কত দূর গড়ালে মানুষ এমনও করতে পারে। এ-সমাজে ডায়াবেটিস 'নিঃশব্দ ঘাতক'। যেহেতু এটি জীবনধারার সঙ্গে সংযুক্ত অসুখ, ফলে দিন দিন মধুমেহ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বেড়ে চলেছে অন্যবিধ রোগবালাই, যা লাইফস্টাইল-সঞ্জাত। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভারতীয় সংসারে একটি বড় অংশের অর্থব্যয়ের সম্ভাবনা যে ওষুধ-খাতে প্রবাহিত, তা বলে দিতে হয় না।
মুন্নাভাইয়ের 'গান্ধীগিরি' তখন উপায় হল। বৃদ্ধটি একদিন সরকারি অফিসে গিয়ে, সেই ঘুষ-পঙ্কে নিমজ্জিত অফিসারের সামনে একে-একে জমা দিতে থাকে পরনের জামা, কাপড়, চশমা, জুতো প্রভৃতি। সেই সঙ্গে প্রতিটির দাম কত তাও ঘোষণা করে দেয়। সর্বশেষে ডায়াবেটিসের ওষুধটিও গচ্ছিত রাখে।
এরই মধ্যে জাগ্রত দুঃস্বপ্নের মতো হানা দিল এই খবর যে, কেন্দ্রীয় ওষুধ মূল্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা পাইকারি মূল্য সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রায় ৯০০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম বাড়াতে চলেছে। যে-তালিকায় মধুমেহ বা রক্তচাপের ওষুধও রয়েছে। গড় মধ্যবিত্ত ভারতীয়র উপার্জন এমন কিছু ঊর্ধ্বমুখী নয়। নতুন পেশাপ্রবেশের জগৎটি বেশ সংকীর্ণ। রোজই সব ধরনের দ্রব্যমূল্যের আশঙ্কা থাকছে, এবং দুর্ভাবনা সত্যি করে এটা-সেটার দাম বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধের দাম ফের বাড়ানো যে মৃতকল্প উপার্জনের কাঠামোর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অমানুষিক, বোঝা কি যায় না? ওষুধের দাম বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ত্রাসটি হল এই যে, জীবনের প্রয়োজনে, নীরোগ থাকার স্বার্থে ওষুধ লাগবেই, দাম সে যতই বাড়ুক। অন্যথা, ওষুধ না কিনে ও না খেয়ে থাকতে হয়, যা মৃত্যুর সমতুল্য।
নগরায়নের ছোঁয়াচ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এর ক্ষতিকর প্রকোপ থেকে এড়িয়ে থাকা অসম্ভব। দূষণ বা ক্ষতিকর কীটনাশক-সমৃদ্ধ খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করা ভিন্ন বিকল্প পথ খোলা নেই আমাদের। শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ব্যাহত করার পথটি আমরা স্বয়ং প্রশস্ত করছি। এমতাবস্থায় ওষুধের উপর নির্ভরশীল হব না, বা ওষুধের প্রয়োজনীয়তা নেও, বলা তো যায় না। নিত্যদিনের খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে যেমন সমস্যা, তেমনই ওষুধের দাম বাড়লেও ত্রাহি মধুসূদন দশা হতে বাধ্য। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তটি হয়তো রাজকোষকে পুষ্ট করবে, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের নিরিখে দেখলে, এই অবস্থানকে কোনওভাবে 'দেশবান্ধব' বলতে পারি না। ওই বৃদ্ধের দশা আমাদের প্রত্যেকের!
(মতামত ব্যক্তিগত)
