শম্পালী মৌলিক: ‘মির্জা’-র পর অভিনেতা-প্রযোজক অঙ্কুশের দ্বিতীয় প্রয়াস ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’। প্রথম ঝলক থেকেই পরিষ্কার এ ছবি আদ্যন্ত বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক ঘরানার। পরিচালক জুটি সুমিত-সাহিলের সঙ্গেও দ্বিতীয় কাজ অঙ্কুশ-ঐন্দ্রিলার। কমেডি জঁর-এর, একইসঙ্গে পারিবারিক ছবিও বটে। মজার ব্যাপার হল, ছবিটা মেল গিবসন-হেলেন হান্ট অভিনীত ‘হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট’-এর ছায়ায়, তবে চিত্রনাট্যে বাঙালিয়ানা রয়েছে। তাই অতটাও অসুবিধা হয় না। শ্রীজীবের চিত্রনাট্য বাঙালি আবেগ-নির্ভর। ন্যান্সি মেয়ার্সের ইংরেজি ছবিটিতে নায়ক একটা দুর্ঘটনার পর মেয়েদের মনের কথা পড়ে ফেলতে পারত। সেই আশ্চর্য শক্তিকে সে কাজে লাগাত নিজের সুবিধের জন্য। পরে সে বুঝতে পারে মনের কথা জানতে পারা আর উপলব্ধি করতে পারার মধ্যে অনেকটা তফাত। তার জন্য মানুষের সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
এই ছবিটিতে কাহিনির কেন্দ্রে ঝন্টু (অঙ্কুশ হাজরা)। সে একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা চালায়। বেশ করিতকর্মা ছেলে। পুরনো বাড়িতে মা, বোন, ঠাকুমার সঙ্গে থাকে সে। আর এই বাড়িতেই ভাড়া থাকে ‘আঁখি’ (ঐন্দ্রিলা সেন) নামের একজন। মেয়েদের ঝন্টুর ভালো লাগে কিন্তু বয়স বাড়লেও এতগুলো বছরে নারীর মনের গতিবিধি ঝন্টু বুঝতেই পারেনি। মানুষটা সে মন্দ নয় তবে স্রেফ চালাকি দিয়ে কাজ হাসিল করতে শিখেছে। আঁখির প্রতি রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা, কিন্তু অনুভূতি বোঝার জায়গায় জিরো ঝন্টু। গল্পে কমেডির সঙ্গে মিশেছে ফ্যান্টাসি। এমন এক সময় ঝন্টুর গালে এসে পড়ে মা কালীর বড় থাপ্পড়! তারপর থেকে ছেলেটি নারীর অন্তরের কথা টের পেতে শুরু করে। ফলে মেয়েদের মুখের কথা, আর বাহ্যিক আচরণের দোদুল্যমান সাঁকোটা সে একটু একটু করে ধরতে পারে। নানান ক্যাওস পেরিয়ে গল্প এগোয়। প্রেম, রাগ, হতাশা, অভিমান সবটা অনুভব করতে শেখে ঝন্টু ধীরে ধীরে।
ছবির গল্প একদম সরল, চলনটাও তেমন। তবে বেশ কয়েকটা জায়গা অতিনাটকীয়। মাস এন্টারটেনারের ক্ষেত্রে যেমন হয়। অঙ্কুশের কমিক টাইমিং বরাবর ভালো, এই ছবিতেও তা প্রমাণিত। নাচের দৃশ্যেও তিনি দুরন্ত। তবে নায়ক অঙ্কুশের বাড়তি মেদ ঝরে গেলে তাঁকে আরও স্মার্ট দেখতে লাগত, যা এই চরিত্রের দাবি। আঁখি-র চরিত্রে ঐন্দ্রিলা চমৎকার। আঁখি আর ঝন্টুর প্রেম, চিত্রনাট্যে আরও গুরুত্বের দাবি রাখে যদিও। মাপা অভিনয়ে মন জয় করেছেন ঐন্দ্রিলা। ঝন্টুর বন্ধুর চরিত্রে দেবরাজ ভট্টাচার্য, ছবির জোরের জায়গা। স্বল্প পরিসরে নবনীতা এবং ঈপ্সিতা বেশ সাবলীল। বেশ কিছুদিন পরে সোহাগ সেনকে এমন বাণিজ্যিক ছবিতে পেলাম। তাঁর প্রতিটি সংলাপ, ছোট ছোট অভিব্যক্তি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য মনেই হয় না অভিনয় করছেন। সোহিনী সেনগুপ্ত আটপৌরে চরিত্রেও অসাধারণ হয়ে উঠতে হয় কীভাবে জানেন, এই ছবি তার প্রমাণ। রাজনীতিকের চরিত্রে কৌশিক চক্রবর্তী মানিয়ে গিয়েছেন। আর ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যিনি না থেকেও আছেন তিনি হলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কণ্ঠস্বর এই ছবির এক পৃথক চরিত্র হয়ে উঠেছে। কীভাবে, হল-এ গিয়ে দেখতে হয়।
কিছু খামতি নিশ্চয়ই আছে। ছবিটা প্রেডিক্টেবল। বেশ কিছু সংলাপ বড্ড চটুল। এই সিনেমার মূল বার্তা ইতিবাচক, নারীকে সম্মান করার কথাই বলে, কিন্তু সেইটা করতে গিয়ে কিছু বাক্যে গরমিল হয়ে গিয়েছে। সেইখানে নজর দিলে ভালো হত। গানের প্রসঙ্গে বলতেই হয়, শিলাজিতের ‘ডান্ডা ২.০’ দর্শক-শ্রোতার ভালো লাগছে। আর সোমলতা-দুর্নিবারের কণ্ঠে ‘শোনো গো দখিন হাওয়া’ ছবির সেরা প্রাপ্তি। দৃশ্যায়নও সুন্দর। দারুণ গেয়েছেন সোমলতা-দুর্নিবার। কিন্তু এন্ড ক্রেডিটের সময় গানটা আসে। ইশ গানটা, ছবির ভিতরে কোথাও থাকলে অঙ্কুশ-ঐন্দ্রিলার প্রেমের সমীকরণও দেখার সুযোগ পেত দর্শক। সব মিলিয়ে নারী চরিত্র মানেই জটিল, এমন সরলীকরণ ঠিক নয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে জটিল হতে পারে। সরলও হতে পারে। মূল কথা মানুষকে বোঝার মন আর ধৈর্য থাকতে হবে। ছবির শিরোনাম অবশ্য নারীমনের দিকেই আলো ফেলতে চেয়েছে।
