যদিও বিশাল ভরদ্বাজ এর মধ্যে ‘ফুরসত’, ‘চার্লি চোপড়া’, ‘খুফিয়া’ তৈরি করেছেন তবুও আমার এই নামটা শুনলেই ‘মকবুল’ , ‘ওমকারা’, ‘হায়দার’-এর কথা মনে পরে। সেই খিদে নিয়েই খানিক ‘ও রোমিও’ দেখতে যাওয়া । ‘কামিনে’ , ‘হায়দার’, ‘রঙ্গুন’- এর পর আবার শাহিদ কাপুরের সঙ্গে তাঁর ছবি । এস হুসেন জাইদি ও জেন বর্জেস-এর বই ‘মাফিয়া কুইনস'- এর কুখ্যাত স্বপ্না দিদির গল্পকে কেন্দ্র করে তাঁর ছবির রোমিওকে তিনি তৈরি করেছেন, যে আসলে ছিল মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হুসেন উস্তারা।
‘আসফা’র চরিত্রে তৃপ্তি দিমরি একটু বেশি মোলায়েম কিন্তু শাহিদকে রোমিও করে তোলার জন্য এমন ‘নরম কোমল দিলরুবা’ই চেয়েছিলেন পরিচালক। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আসে প্রেম চুপিসারে। ভালোবাসার উচ্চারণ এবং স্ফুরণ এই ছবিতে মাপা।
স্বপ্না দিদি আর হুসেন উস্তারার প্রেম হয়েছিল? এই তথ্য জানা নেই , কিন্তু অনুমান করা যেতেই পারে যে স্বপ্না দিদি ওরফে আশরাফকে সাহায্য করতে গিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যেতে পারে প্রতিশোধ স্পৃহার থেকেও বৃহত্তর আবেগ কাজ করেছিল। মুম্বই ব্লাস্টের পর এই স্বপ্না দিদি , দাউদের বড় শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। কারণ দাউদের ইশারাতেই তার স্বামী মেহমুদ খানকে হত্যা করা হয়। স্বপ্না দিদি এক সময় মুম্বইয়ের ত্রাস হয়ে ওঠে। হুসেন উস্তারা তাঁকে ট্রেনিং দেয়। মুম্বইয়ে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান শারজাহ ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন দাউদকে শেষ করার ছক সাজিয়েছিল স্বপ্না। গোপনে খবর চলে যায় দাউদের কাছে। মুম্বইয়ে নিজের বাড়িতে স্বপ্নাদিদিকে খুন করা, ২২ বার কোপানোর আঘাত পাওয়া যায়। এই সবই খবরে পড়া। এটা বাস্তব। সিনেমার গল্প এটা নয়। বিশাল তাঁর ছবিতে স্বপ্না বা আশরাফের গল্প বলতে চাননি, তিনি হুসেনের প্রেমকে উদযাপন করতে চেয়েছেন। সেই সঙ্গেও নয়ের দশকের বলিউড এবং দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণেরও । যে সব গান শুনে আমরা বড় হয়েছি সেই সব গান একের পর এক যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন পরিচালক । বলিউডের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওতপ্রোত সম্পর্ক, ক্রিকেটের সঙ্গে বুকিদের আঁতাত, সেন ওয়ার্ন-এর ক্রিকেট বেটিং ঘটনা ,মায়াবতীর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়া — সেই সময়টাকে নানা ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
'ও রোমিও' ছবিতে শাহিদ-তৃপ্তির সমীকরণ, ছবি- ইনস্টাগ্রাম
এই মুহূর্তে বলিউডে আলফা মেল, টক্সিক প্রেম এবং হিংসা যে হারে উদযাপিত হচ্ছে বিশাল সেই ট্রোপে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি'— এই মর্মে ‘ও রোমিও’ তৈরি করেছেন। ফলে এই ছবিতে হিংসা , অ্যাকশন দৃশ্য এতটাই স্টাইলাইজড যে সেটা একটা উচ্চ শিল্পের পর্যায় পৌঁছেছে। ছবির গোড়াতেই সিনেমা হলের ভেতর মাধুরির ধক ধক করনে লাগার সঙ্গে যে অ্যাকশন দৃশ্য সেখানে রক্তপাতের চেয়েও মনে থেকে যায় কোরিওগ্রাফি। এ যেন নৃত্যনাট্য। বিপদ আরও ঘন হয়ে এলে গানের লয় আরও দ্রুত হয়ে যায়, ধক ধক গানের স্পিড বেড়ে যায়। অভাবনীয়! অ্যাকশন দৃশ্যকে এই নতুন শরীর দেওয়া বোধহয় বিশাল ভরদ্বাজই পারেন। কিংবা জালালকে (দাউদের চরিত্রের আধারে তৈরি) মারতে ক্রিকেট ম্যাচের বদলে স্পেনের বুল ফাইটার এরিনাতে যে নক আউট ফাইট , ‘গ্ল্যাডিয়েটর’-এর কথা মনে পরে যাবে । কিংবা তৃপ্তি-শাহিদ জুটি করে একসঙ্গে শত্রু নিধন ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’-এর কথা মনে করাবে । গোটা ছবিটাই অবিশ্বাস্য কোরিওগ্রাফ এবং স্টাইলাইজড, ড্রামাটিক অ্যাকশন দৃশের মন্তাজ মনে হয়।
শাহিদ কাপুরের শরীরী অভিনয় দারুণ। 'উস্তারা' অর্থাৎ রেজরের মতোই শানিত তিনি এই সুপারি কিলারের চরিত্রে। অবিনাশ তিওয়ারি অভিনীত ‘জালাল’কে যতটা সম্ভব দাউদের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং এই নতুন রূপে তিনি ভিলেন হিসেবে অনন্য। ‘আসফা’র চরিত্রে তৃপ্তি দিমরি একটু বেশি মোলায়েম কিন্তু শাহিদকে রোমিও করে তোলার জন্য এমন ‘নরম কোমল দিলরুবা’ই চেয়েছিলেন পরিচালক। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আসে প্রেম চুপিসারে। ভালোবাসার উচ্চারণ এবং স্ফুরণ এই ছবিতে মাপা। এই ছবির স্বপ্না দিদি ওরফে আশরাফ এখানে ‘আসফা খুরেশি’ (অভিনয়ে তৃপ্তি দিমরি) এবং উস্তারার (অভিনয়ে শাহিদ কাপুর ) গল্পে রোমিও যতটা প্রাধান্য পায়, জুলিয়েট পায় না। প্রেম টিকে যায়, ‘আসফা’ও বেঁচে যায় , কিন্তু ‘আসফা’র অদম্য সাহস আর প্রতিরোধের গল্প হেরে যায়। বিশাল ভরদ্বাজের চরিত্রদের যে ক্রাইসিস বা মনোজগৎ সেটাও খুঁজে পাই না আর। এই ছবি স্টাইলে, কেতায় ধুরন্ধর হলেও, আমার রক্তমাংসের স্বপ্নাদিদির প্রতিরোধের গল্প জানতে ইচ্ছে করে যা ব্যক্ত করতে বিশাল ভরদ্বাজের মতো পরিচালকও ব্যর্থ হন। আসলে এক নারীর গল্পে পুরুষকে নায়ক করলে সেটা অপূর্ণই থেকে যায়।
