পরিচালক অনুভব সিনহা পরপর বিষয়-ভিত্তিক ছবি করে চলেছেন । 'আর্টিকল ফিফটিন' , ‘থাপ্পড়’, ‘ভিড়’, ‘অনেক’— তাঁর সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘আসসি’ (Assi Review)সেই তালিকার ব্যতিক্রম নয়। বিষয়ের অভিনবত্ব বা গুরুত্বের ভার যখন অগ্রাধিকার পায় তখন ক্রাফট অনেক সময়েই ব্যাকসিটে চলে যায়। অনুভব সিনহা পরিচালিত, তাপসী পান্নু অভিনীত ‘আসসি’র ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। একদিকে এক ধর্ষিতা নারী, অন্যদিকে দেশে বাড়তে থাকা ধর্ষণের হার এবং 'ধর্ষণ সংস্কৃতি'কে ঘিরে যে নানান দিক ,সেই সবটা একটা ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং এই অপরাধের কারণ, উপশম হিসেবে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন, অপরাধ দমনে স্বঘোষিত আইন রক্ষকের ঠিক-ভুল, ভিকটিম ব্লেমিং, সৎ-অসৎ পুলিশ অফিসার, ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো এবং সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রায় বিবেকের ভূমিকায় এক সৎ আইনজীবী (তাপসী পান্নু)- এই ছবিতে বাদ নেই কিছুই।
নারীর প্রতি হয়ে চলা হিংসা এবং ধর্ষণ এক সামাজিক ব্যাধি। যার বিস্তার এবং কার্যকারণের সবটা একটা সিনেমায় বুঝিয়ে দেব এবং সমাধান বের করে ফেলব, এই অ্যাপ্রোচ নিয়ে মাঠে নামলে মুশকিল! অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে যে, আপনি ফেলে দিতেও পারবেন না।
সিলেবাসের গোটাটাই কভার করার দায় যেন নিজেদের ওপরেই চাপিয়ে নিয়েছেন নির্মাতারা। স্কুল টিচার পরিমা (অভিনয়ে কানি কুসরুতি) ধর্ষিত হওয়ার পর সেই স্কুলে ফেরত না যেতে পারা এবং স্কুলের কিশোর ছাত্রদের ওপর এই খবরের প্রভাব— তাও আছে। এখানেই থামেননি পরিচালক। ছবির শেষ দৃশ্যকে নাটকীয় করে তোলার জন্য স্কুলের ছাত্রদের কোর্টরুমে পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার জুটি । আইনজীবী রাভির (তাপসী পান্নু) মুখে কালি ছুঁড়ে দেওয়া, কারণ তিনি জনমত এবং সোশাল মিডিয়া ট্রায়ালের বিপক্ষে এবং সেই কালীমাখা মুখ নিয়েই তাঁর কেস লড়ে যাওয়া, তাঁর মুখ দিয়ে জরুরি লাইনগুলো বলিয়ে নেওয়া, ধর্ষণের দৃশ্যকে নাটকীয় করে তোলারও প্রচেষ্টা রয়েছে কাউন্টিং-এর ইঙ্গিতে।
‘আসসি’ ছবিতে কানি কুসরুতি ও তাপসী পান্নু, ছবি- ইনস্টাগ্রাম
নাটকীয়তা এই ছবির পরম শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ষণ এমন এক অপরাধ, যেটাকে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক পরিকাঠামো আরও বৃহৎ করে তোলে এবং এর দায় ও প্রভাবে ভিকটিমের ক্ষতি হয় অনেক বেশি। সেই ক্ষত এমনিতেই এত গভীর যে এই অপরাধ নিয়ে তৈরি হওয়া ছবিকে বারেবারে নাটকীয় করে তোলার মধ্যেও কোথাও একটা 'মেল গেজ' থেকে যায়। এবং নারী হিসেবে দেখতে গিয়ে খটকা লাগে। নারীর প্রতি হয়ে চলা হিংসা এবং ধর্ষণ এক সামাজিক ব্যাধি। যার বিস্তার এবং কার্যকারণের সবটা একটা সিনেমায় বুঝিয়ে দেব এবং সমাধান বের করে ফেলব, এই অ্যাপ্রোচ নিয়ে মাঠে নামলে মুশকিল! অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে যে, আপনি ফেলে দিতেও পারবেন না। আমাদের ছবি ফেমিনিস্ট— সেটা গলা ফাটিয়ে, আন্ডারলাইন করে না বললেও কোনও ক্ষতি ছিল না। সব মিলিয়ে ‘আসসি’ তাই চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়। ছবির উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এই ন্যারেটিভের সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারি না। সেনসিটাইজেশনের নামে ধর্ষণের নানা দিক নিয়ে কথা বলা যদি কেবল মাত্র একটা প্রোজেক্ট বা একটা ডিসার্টেশন পেপার হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে এটাকে স্রেফ ব্যবহার করা হল। নারীর জীবনের দাম এত তুচ্ছ হতে পারে না! তাপসীর পান্নুর একটা সংলাপ আছে এই ছবিতে, সেটা মনে পড়ল- "তোমাদের অর্থাৎ পুরুষদের কেন মনে হয় যে, রাগ কেবল তোমাদেরই হয়। মেয়েদের রাগ হয় না। মেয়েদের খুব রাগ হয় এবং এই রাগ সব কিছু জ্বালিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বিষয়টা হল আমরা সব কিছু জ্বালিয়ে দিতে চাই না।" এই প্রচন্ড সত্যি লাইনটা লেখা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এই ভাবনার সঙ্গে কতটা আতস্থ হয়ে লেখা হয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
