কাকাবাবু সিরিজের চতুর্থ ছবি ‘বিজয়নগরের হীরে’ মুক্তি পেল আজ। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পর কাকাবাবু ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনায় এবার চন্দ্রাশিস রায়। ১৯৮৮ সালে এই গল্প প্রকাশিত হয়। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার লেখা এই গল্পের মূল আকর্ষণ হল, ঘটনাস্থল হাম্পি। কাকাবাবু সিরিজের যে সব গল্প নিয়ে ছবি হয়েছে সবেতেই ব্যাকড্রপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাকে বলা যায় অত্যন্ত সিনেম্যাটিক। এক কথায় মারকাটারি। তবে সেটিং হিসাবে হাম্পিও কম যায় না কোনও দিক থেকেই। বিজয়নগরের প্রাচীন ইতিহাস এবং ৬০০-৭০০ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপে বাঙালি দর্শককে টেনে নিয়ে যাওয়া, কম কথা নয়। ইতিহাস, ফিকশন এবং অ্যাডভেঞ্চারের সহজ মিশেল চন্দ্রশিস রায় পরিচালিত ‘বিজয়নগরের হীরে’।
কাকাবাবু ও সন্তুর চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, আরিয়ান ভৌমিক, ছবি- ইনস্টাগ্রাম
উপন্যাস থেকে স্বাভাবিকভাবেই অল্প-অল্প বদলে নিয়েছেন পরিচালক চন্দ্রাশিস রায় (চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন রোহিত ও সৌম্য)। তবে মূল গল্পে যাত্রা শুরুতে একটা খেলা ছিল– কাকাবাবু এবং তার দলবল কেউ ইংরেজিতে কথা বলবে না, বললেই মাইনাস পয়েন্ট। বাঙালি সব সময়ই খেলাধুলো-ঘেঁষা। আর পিকনিক বা বেড়াতে গেলে এই ধরনের খেলা একটা সময়ে বাঙালির খুব চেনা বিনোদন ছিল। তখন অবশ্য মোবাইল ছিল না, সেলফি তোলা ছিল না। তাই সিনেমায় জোজোর হাতে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ নিয়ে তুঙ্গভদ্রার তীরে এসে সেলফি তোলায়— বাঙালির পরিবর্তন বোঝানোও হল আবার এও বোঝা যায়, বাঙালির তরী, তীরে এসেও ডোবেনি পুরোপুরি। এখনও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটা ক্ষীণ যোগ আছে। পড়ুক বা না পড়ুক বইগুলোর নাম জানে, এবং বইয়ের সঙ্গে সেলফি তোলার দৃশ্য বুঝিয়ে দেয় পরিচালকের রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। ‘বিজয়নগরের হীরে’-ও বোধহয় সেইসব বাঙালির জন্যই যাদের এখনও বাংলা বইয়ের সঙ্গে একটা ক্ষীণ যোগ আছেই। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধের সঙ্গে যাদের আত্মীয়তা পুরোপুরি হারায়নি। কারণ কাকাবাবুর চরিত্রটাই তো একজন সাহসী, সৎ, নির্ভীক গাইডের মতো। একসময়ে বাবা-মায়ের শাসনের বাইরে এই ধরনের কাকা, জেঠু, মামা বা জেঠতুতো দাদা থাকত বা কোনও দিদিমণি, পিসি, বা বন্ধুর দিদি থাকত– যারা নরম কিশোর মনকে স্বপ্ন দেখাতে পারত। তখনও তাদের মরাল কম্পাসের দিক নির্ধারণ করতে সোশাল মিডিয়া, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ড বা রিল আসেনি। এই সময়ে দাঁড়িয়েও সিনেমায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘কাকাবাবু’ সেই গাইড হয়ে উঠতে পারেন। এবং তাঁর প্রধান রাইট হ্যান্ড ম্যান সন্তু (আরিয়ান ভৌমিক) এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড জোজো (পূষণ দাশগুপ্ত) এই যুগের নিরিখে যোগ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট। গল্পে রিঙ্কু (শ্রেয়া ভট্টাচার্য) এবং রঞ্জনের (সত্যম ভট্টাচার্য) অনেকটা ভূমিকা থাকলেও সেটা সিনেমায় নেই। তবে গল্পে যেভাবে ছিল সেটা যুগোপযোগী এবং রিয়েলিস্টিক নয়। অন্তত হাম্পির মতো হেরিটেজ সাইটে রিঙ্কুকে মাটির তলায় গুপ্ত ঘরে লুকিয়ে রাখা বা ঘোড়ায় চেপে রঞ্জনের বীরগাথা সিনেমাতে না রাখায় ক্ষতি হয়নি। কিন্তু অন্যভাবে এই দুই যোগ্য অভিনেতাকে ব্যবহার করা গেলে সিনেমায় আরও স্তর যোগ হত।
ছবি- ফেসবুক
ভিলেনের চরিত্রেও ইন্টারেস্টিং রদবদল হয়েছে। মোহন সিংকে (অনুজয় চট্টোপাধ্যায়) বাইরের লোক না করে সেখানকার আদিবাসী হিসাবে দেখানো হয়েছে। সিনেমায় এই সংযোজন ভালো লাগলেও তা যেন খানিকটা ওপর ওপরই থেকে যায়। কারণ ‘বিজয়নগরের হীরে’-কে ঘিরে স্থানীয় আদিবাসীদের যে আত্মিক যোগ তা যেন বড্ড সাদা-কালো। তাদের বেঁচে থাকা বা যাপনের সঙ্গে এই হীরের সম্পর্ক বা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাদের বোঝাপড়ার যে ডায়নামিক্স সেই স্তর চিত্রনাট্যে থাকলে আরেকটা মাত্রা যোগ হত। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রাজনন্দিনী পাল (রায়া) মানানসই। বিশেষ ভূমিকায় চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী (প্রফেসর শর্মা) ছবিতে বিশেষ চমক। ধরা যাক, অনেকেরই কাকাবাবুর গল্প নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই, তাদের জন্যও এই ছবি কিছু না কিছু দেবে। শীত থাকতে থাকতে হাম্পি বেড়াতে না গেলেও বড় পর্দায় দেখে নিন ‘বিজয়নগরের হীরে’। দক্ষ হাতে ক্যামেরা সামলেছেন ইন্দ্রনাথ মারিক। ভারতে এমন অবিস্মরণীয় সুন্দর, বিষণ্ণ-উদাসী ভূমিরূপ খুব কমই আছে।
